Date : 2020-10-23

অজানা ইতিহাসের মাস্তুল বুকে প্রতীক্ষায় সুরিনাম ঘাট

কলকাতা: কলকাতার উপকন্ঠে মেটিয়াব্রুজের নাম সকলেরই জানা। কলকাতা এমনই এক জায়গা যেখানে বাতাসের প্রতিটি ধুলিকণায়ও লুকিয়ে আছে ২০০ বছরের ইংরেজ শাসনের ইতিহাস। ব্রিটিশ নির্মিত শতাব্দী প্রাচীন এই জনপদের এমনই এক গঙ্গার ঘাটের কথা উল্লেখ করা যায় যার জলে এখনো মিশে আছে ব্রিটিশ অত্যাচারীত ভারতবাসীর ক্রীতদাস হয়ে নির্বাসিত হওয়ার অশ্রু, মেটিয়াব্রুজের এই ঘাট ইতিহাস প্রসিদ্ধ একটি স্থান, সময়ের পরিবর্তনে অনাদরে পরে আছে তার স্মৃতি পথ। সময়টা এখন থেকে ১৪৫ বছর আগে। কলকাতা তখন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের জাঁতাকলে পিষে চলেছে।

জাহাজঘাটা থেকে কিছুটা দূরে মেটিয়াব্রুজের কাছে গঙ্গার ঘাটে কালো ধোঁয়া উগড়ে দাঁড়িয়ে আছে ‘লাল্লা রুখ’ নামের জাহাজটি। জাহাজে ঠাসাঠাসি করে চলেছে একদল মানুষ, চোখে মুখে একরাশ আসা নিয়ে চলেছে তারা, পাঁচবছর পর আবার ফিরে আসবে নিজের দেশে নিজের ঘরের লোকের কাছে। সেই দিন আসলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নির্দেশে ওই মানুষদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল দক্ষিণ আমেরিকার ওলন্দাজ উপনিবেশে সুরিনামে আখ চাষ করার জন্য। সেই শেষবারের জন্য দেশ ছেড়ে ছিলেন তারা, ইংরেজের ক্রীতদাস হয়ে হস্তান্তরিত হয়েছিলেন ওলন্দাজদের হাতে।

শুধু বাংলার মানুষ নয়, জাহাজে করে পাঠানো হয়েছিল বিহার, ওড়িশার বেশ কিছু মানুষকে। একটি জাহাজ নয়, ‘লাল্লা রুখ’-এর পিছু পিছু পাড়ি দিয়েছিল আরো ৬৩ টি মানুষ বোঝাই জাহাজ। প্রায় সাড়ে তিনমাস পরে সুরিনামের পারামারিবো বন্দরে জাহাজ থেকে নেমেছিল ৫০জন ভবিষ্য ক্রীতদাস, মানে শিশুসহ ২৭৯জন ক্রীতদাস, ৭০জন ক্রীতদাসী।

পৌঁছানোর আগেই জাহাজে মারা গেছিলেন ১১ জন মানুষ। কথা ছিল কাজ শেষে দেশে ফিরে আসবেন তারা। যদিও ব্রিটিশ সরকার তাদের আর ফিরিয়ে আনেননি দেশে। দক্ষিণ আমেরিকা সুরিনাম নামক জায়গাটিতে চিরদিনের মতো নির্বাসিত হয়েছিলেন তারা।

প্রতীক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে বন্ধ হয়েছিল আপনজনদের চোখ। ফিরে আসেনি ব্রিটিশ ভারতের সেই সব হস্তান্তরিত হওয়া ক্রীতদাসেরা। সুরিনামের স্থায়ী অধিবাসী হয়ে গেছেন তারা। আর ফেলে আসা দেশের এই গঙ্গার ঘাটটি তাদের কাছে পূর্বপুরুষদের স্মৃতির ধুলিকণা দিয়ে নির্মিত সৌধ।

দক্ষিণ আমেরিকা সুরিনাম থেকে আগত সেই সব বাঙালি ভারতীয় পরিবার আজও মেটিয়াব্রুজের এই ঘাটকে তীর্থস্থানের মতো ভক্তি করে। তাদের কাছে এই ঘাট পূর্ব পুরুষদের চরণধুলির সমতুল্য। এই ঘাটের কাছেই রয়েছে বাংলার নবাব ওয়াজিদ আলির প্রাসাদ ও ইমামবরা। ইমামবরাটি সংরক্ষিত থাকলেও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে প্রাসাদ ভঙ্গুর দশা প্রাপ্ত হয়েছে।

ইতিহাসের কাহিনী অনুসারে নবাব ওয়াজিদ আলি ছিলেন শিল্প, সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক। ইতিহাসের টুকরো ঘটনা নিয়ে এই গঙ্গার ঘাট নিঃশব্দে বয়ে চলেছে বছরের পর বছর। তবে এখানে জাহাজ আনাগোনা বন্ধ বহুকাল। সুরিনাম ঘাট এখন পরিত্যক্ত।