Date : 2019-12-16

গর্ভগৃহের আঁধারে আজও ঘুঙুর বেজে ওঠে! পুরীর শেষ ৫ দেবদাসীর রোমাঞ্চকর জীবনী….

ওয়েব ডেস্ক:- দক্ষিণ থেকে উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রাচীন ইতিহাস ফিরে দেখলে এমন অনেক ঘটনা সামনে আসে যার সঙ্গে ধর্ম তথা ধর্মীয় কুসংস্কারের অন্ধকার অধ্যায় উঠে আসে। এইসব নিয়ম, আচার-বিচার, কুসংস্কার সবই চাপিয়ে দেওয়া হতো ব্রাহ্মণ ব্যাতিত অন্যান্য জাতির উপর। মন্দিরের দেবতাকে সন্তুষ্ট করার জন্য তথাকথিত শূদ্র শ্রেনীভুক্তদের ঋতুমতী কন্যাসন্তানকে উৎসর্গ করা হতো। মন্দিরে অবস্থিত দেবতার বিগ্রহের মনোরঞ্জনের বদলে এই কুমারী কন্যারা হয়ে উঠত মন্দিরের পুরোহিত ও পারিষদ বর্গের বিকৃত যৌন লালসার শিকার। সাধারণ মানুষের কাছে তাদের পরিচয় থাকত নর্তকী হিসাবে, কিন্তু ধর্মীয় পর্দার আড়ালে এই প্রথা ছিল নারকীয় পৈশাচিক প্রথা।

আইন করে যেমন বন্ধ করা হয়েছিল সতীদাহ প্রথা ঠিক তেমনই মন্দিরে মন্দিরে নিষিদ্ধ হয়েছে দেবদাসী প্রথা। খাতায় কলমে আজ বিলুপ্ত হয়েছে দেবদাসী প্রথা, তবে আজও পুরীর মন্দিরে জীবিত আছেন এই কুপ্রথার শিকার হওয়া পাঁচজন দেবদাসী। কেমন তাঁদের জীবন? কোথায় বা থাকেন তাঁরা? দেবদাসী হিসাবে আজও কি কি নিয়ম মেনে চলেন তাঁরা? যদিও পুরীর মন্দিরে এই ৫ দেবদাসীর জীবনযাত্রা ও কর্মকাণ্ড আধুনিক সভ্যতা থেকে সম্পূর্ণ আঁধারেই রয়ে গেছে। মনে করা হয় মন্দিরের মূল চাতাল থেকে ৩০ ফুট নীচে দেবদাসীদের জন্য সংরক্ষিত নির্দিষ্ট কামরায় আজও বসবাস করেন ওই ৫ জন দেবদাসী।

প্রভু জগন্নাথ দেবের মূর্তির নিচে ভূগর্ভস্থ কক্ষ আজও বাস করেন তাঁরা। চাতালের সামনে রয়েছে একটি থাম, সেই থাম থেকে নিচে নেমে গিয়েছে সিঁড়ি,চারটে করে ধাপ নামলেই দেখবেন একটি পিতলের মশাল জ্বলছে। আধুনিক সভ্যতার বৈদ্যুতিন আলো আজও পৌঁছায়নি সেখানে। জগৎ সংসার থেকে আলাদা এ যেন এক মায়ালোক। এইখানে পৌঁছালে চোখে পড়বে একটি কক্ষ। সাদা মখমলের তাকিয়ার দু ধারে জ্বলছে ঘিয়ের বড় বড় দুটি প্রদীপ। প্রদীপের আলোতেই আলোকিত হয় এই কক্ষ। বলা হয় প্রভু জগন্নাথের কৃপায় যিনি প্রধান দেবদাসী হয়েছেন এই মন্দিরের তিনিই প্রভু জগন্নাথের সমস্ত সম্পত্তির মালিক। দেবদাসীদের কোন পরিবার থাকেনা।

বিশাল মন্দিরের সম্পত্তির মালিক হয়েও মৃত্যুর পর নিজের বস্ত্র ছাড়া আর কোন কিছুরই অধিকার থাকে না তাঁর। কথিত আছে জীবিত ৫ দেবদাসী প্রভু জগন্নাথের স্বপ্নাদেশে মন্দিরে আসেন মাত্র ১২ বছর বয়সে। এরপর উক্ত বালিকারা বিভিন্ন প্রথার মাধ্যমে প্রভু জগন্নাথকে নিজের স্বামী হিসাবে মেনে নেন। দীর্ঘদিন নৃত্যগীত চর্চা করে শিক্ষা শেষে তাঁরা নিজেদের প্রভু জগন্নাথের পায়ে নিবেদন করে দেন।দেবদাসীদের জন্য প্রচলিত একটি প্রথা ছিল, স্বামীরূপে জগন্নাথকে লাভ করার পর তাঁর সন্তানের জননী যাতে না হতে পারেন তার জন্য ছিন্ন করে দেওয়া হত দেবদাসীদের নাড়ি। প্রধান দেবদাসী অথবা মাহিরী শ্বেত শুভ্র বেশ পরিধান করেন। তাদের বাসস্থানের সর্বত্র সাদা কাপড় দিয়ে ঢাকা।

পৃথিবীতেই রয়েছে এলিয়ানদের স্পেস স্টেশন!

অদ্ভুত ভাবেই এদের মৃত্যু হয় বার্ধক্য জনিত কারণে। চিকিৎসকের সাহায্যের প্রয়োজন হয়না তাঁদের। এমনকি কখনও কলের জলও ব্যবহার করেন না তাঁরা। রাত্রী তৃতীয় প্রহরে বস্ত্রে মুখ ঢেকে সমুদ্রের অজানা তটে স্নান সেরে নেন তাঁরা। মৃত্যুর পর দেবদাসীদের দেহ কখনও দাহ করা হয় না। প্রভু জগন্নাথের স্বপ্নাদেশেই তাঁদের দেহ ভাসিয়ে দেওয়া হয় সমুদ্রে।

অন্ধ্রের উমা মহেশ্বর মন্দিরে বেড়ে উঠছে নন্দীর মূর্তি, উত্তর খুঁজে ব্যর্থ বিজ্ঞান

বহু কথার পর সব শেষে একটা কথাই মনের মধ্যে বারবার ঘুরেফিরে আসে, যে দেবদাসীদের নিয়ে যতই জল্পনা বা লোককাহিনি মন্দিরের আনাচে কানাচে ফিসফিস করে ঘুরে বেড়ায় তার কি অধিকাংশই সত্য? প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে মহাপ্রভু শ্রী চৈতন্যদেবের অবলুপ্তি নিয়ে যে কাহিনী প্রচলিত যে তাঁর নশ্বর দেহ তিনি সমুদ্রে বিসর্জনে দিয়েছেন তা নাকি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। মন্দিরেরই কোথাও নাকি আজও রয়েছে শ্রী চৈতন্যদেবের সমাধি।

দেবদাসী তথা মাহেরীদের যতই সমাজ ও লোকচক্ষুর আড়ালে রাখা হোক না কেন, যতই তাঁরা অসূর্যমস্পশ্যা হয়ে থাকুক না কেন, আজও তাঁরা আমাদের কাছে দেবীর আসনেই অলঙ্কৃত। সব তর্ক-বিতর্কের শেষে একথা অনস্বীকার্য নারীশক্তি মাতৃমূর্তির ভিন্ন ভিন্ন রূপ। তাই সে মাটির নিচেই থাকুক আর ওপরেই থাকুক তার স্থান মৃন্ময়ী মূর্তির পাশেই স্বমহিমায় স্বমুজ্জ্বল ।’