Date : 2024-02-28

পুলিশই কেন বার বার কাঠগড়ায়, প্রশ্ন প্রাক্তন অফিসারদের

ওয়েব ডেস্ক : সত্তরের দশক মুক্তির দশক। চিনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান। বাংলা সাহিত্য-সিনেমার আবেগ, রোম্যান্টিকতা এখনও অনেককে বিচলিত করে। আর সেই আবেগে মুছে গিয়েছে এমন কিছু নাম, যাঁরা বাংলা তথা শহর কলকাতাকে নকশালি আতঙ্কের হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন। কলকাতা পুলিশের ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের অফিসার দেবী রায় ছিলেন তেমনই একটি নাম। নকশাল আন্দোলন। এই দুটি শব্দ এমন একটা ওম, যার অগ্রপশ্চাৎ না-দেখে মধ্যবিত্ত ঘরের অনেক তরুণ-তরুণীই সাহিত্য-নাটক-সিনেমার সূত্রে এখনও একটা আবেগ অনুভব করে। অথচ, স্রেফ পুলিশের চর সন্দেহে কত গরিব ফেরিওয়ালা কিংবা অচেনা পথিককে যে সেই সময় বীভৎসভাবে হত্যা করা হয়েছিল, সে ব্যাপারে তাদের জানতে দেওয়া হয় না।

আরও পড়ুন: বিক্ষোভের জেরে উত্তপ্ত অসম, আক্রান্ত একাধিক নেতা-মন্ত্রী, বাতিল ট্রেন, বিমান

এই হত্যাকারীদের অনেকে ফেরার হয়েছে, অন্য দেশে পালিয়েছে, কেউ কেউ আবার সমাজে এতখানি প্রতিষ্ঠা পেয়েছে যে, ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গিয়েছে। তাদেরই মান্যগণ্য হিসাবে মেনে চলা হয়। পুলিশের কর্মী-অফিসাররা ভিলেন হিসাবে বিবেচিত হন। দেবী রায় ছিলেন তেমনই এক পুলিশ অফিসার। যাঁকে ভিলেন হিসাবে ধরা হয়। অথচ, তাঁর মতো অফিসাররাই কলকাতা তথা বাংলাকে এক ভয়াবহ আতঙ্কের হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন। এ রাজ্যে খুন-জখমের রাজনীতির সূচনা করেছিল সিপিএম। যুক্তফ্রন্ট আমল থেকে। তারই পালটা প্রতিক্রিয়ায় দেখা দেয় নকশালপন্থীদের আরও ভয়াবহ খুন-জখমের রাজনীতি। সিপিএমের ছিল ট্রেনিংপ্রাপ্ত ঘাতক ক্যাডার বাহিনী। গেরিলা যুদ্ধের কলাকৌশল শেখানোর নামে পকেট বই ছাপিয়ে তাদের গলা কাটা, পুলিশের গাড়িতে আগুন ধরানো শেখানো হত। যুক্তফ্রন্ট আমলে মালদহে এক খেতমজুর রমণীকে সিপিএমের কৃষক সভার ঝাণ্ডাধারীরা টাঙ্গি হাতে গণধর্ষণ করেছিল।

আরও পড়ুন :দূষণের জেরে কমেছে আয়ু, এরপরেও ফাঁসি! অদ্ভুত আবেদন নির্ভয়াকাণ্ডে দোষীর

পুলিশমন্ত্রী হিসাবে জ্যোতি বসু সেই ঘটনা চেপে দিতে বলেছিলেন। মালদহের পুলিশ সুপার তখন উপানন্দ মুখার্জি। তিনি চাপতে চাননি। এ রাজ্যে পুলিশের সঙ্গে ক্ষমতাসীন রাজনীতিকদের বিরোধ-সংঘাতের সেই শুরু। পরে নকশাল হামলায় নিহত পুলিশ কনস্টেবলের দেহ নিয়ে বিধানসভায় ঢুকে জ্যোতি বসুর ঘরে তাণ্ডবের নাটক করে সিপিএমের সমর্থক পুলিশ কর্মী নেতারা। পুলিশের মধ্যে ভাঙন দেখা দেয় ও পরস্পর পরস্পরকে সন্দেহ করতে থাকে। নকশালদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল লুম্পেনরা আর সাইকোপ্যাথ কিলাররা। মার্কসবাদে তাত্ত্বিকভাবে লুম্পেনরা পরিত্যাজ্য, মাওবাদে ঘোষিতভাবে তারা অন্তর্ভুক্ত। মাও সে-তুংয়ের নাম করে কলকাতা শহরে খুন-জখম মাত্রাছাড়া আকার নেয়। পালটা আঘাত হানে সিপিএম। রাজ্য জুড়ে মারণ-উচাটনের সে এক তাথৈ নৃত্য। নকশালদের হাতে নিহত হন বুদ্ধদেব বসু-সুধীন্দ্রনাথ দত্তের স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। উত্তর কলকাতায় সাধারণ মানুষের চোখের সামনে কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের (এখন বিধান সরণি) উপর হত্যা করা হয় সর্বজনশ্রদ্ধেয় ফরওয়ার্ড ব্লক নেতা হেমন্ত বসুকে। রাতে ব্ল্যাক আউটের সময় নকশালদের ছোঁড়া বোমার স্প্লিন্টারের আঘাতে মৃত্যু হয় নাট্যাচার্য শিশির ভাদুড়ি-র। এই হত্যাকারীদের ফ্যান ক্লাব আছে। কিন্তু দেবী রায়ের মতো সাধারণ নাগরিকের ভরসা জাগানোর মতো পুলিশ অফিসারের কোনও ফ্যান ক্লাব নেই।

আরও পড়ুন : হায়দরাবাদ এনকাউন্টারের ঘটনায় পুলিশের ভূমিকায় তদন্তের নির্দেশ সুপ্রিম কোর্টের

অবসরের পর বহু পুলিশ অফিসার তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা লিপিবদ্ধ করেন। যেমনটা করেছেন জুলিও রেবেইরো, কেপিএস গিল, প্রকাশ সিং, তরুণকুমার ভাদুড়ি। অন্ধ্রপ্রদেশে মাওবাদী দমনের অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন পুলিশ অফিসার বেণুগোপাল। কলকাতা পুলিশেরও একাধিক বাঙালি অফিসারের প্রকাশিত বই আছে। যেমন, ধীরাজ ভট্টাচার্য-পঞ্চানন ঘোষাল। কেউ লিখেছেন পুলিশ অফিসার হিসাবে অভিজ্ঞতার কথা, কেউ লিখেছেন অপরাধ মনস্ত্বত্ত্ব। ধীরাজ ভট্টাচার্য এক সময় পুলিশে ছিলেন, পরে আবার সিনেমাতেও নেমেছিলেন। নায়ক-খলনায়ক উভয় চরিত্রে। পুলিশ ও সিনেমা, দুই ক্ষেত্রেই তিনি তাঁর অভিজ্ঞতার কথা লিখে গিয়েছেন। গ্যাসবাতি-ফিটন আর ছ্যাকরা গাড়ির কলকাতার পুলিশ অফিসার প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায় তাঁর পুলিশ জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতায় লিখেছেন দারোগার দপ্তর। বই বেরিয়েছে দেবী রায়ের অধস্তন নকশাল দমনকারী পুলিশ অফিসার রুনু গুহ নিয়োগীরও। কিন্তু দেবী রায় তাঁর পুলিশী অভিজ্ঞতার কথা কোথাও লিখে যাননি। নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন অপরিচিতির অবগুণ্ঠনে। দেবী রায়ের মতো দেশপ্রেমী পুলিশ অফিসারদের উদাহরণ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার কথা কেন ভাবেন না ক্ষমতাধররা। এটাই এক মস্তবড় গবেষণার বিষয়।

আরও পড়ুন :ক্রীড়া দুনিয়ায় রাশিয়ার কলঙ্কিত অধ্যায়, ৪ বছরের জন্য নির্বাসিত সব খেলা থেকে

সাধারণত বড় পুলিশ অফিসারদের স্মৃতিচারণায় সহকর্মীদের প্রসঙ্গ উঠে আসে। কিন্তু সেক্ষেত্রেও দেবী রায় সম্পর্কে অনেকেই নীরব। অথচ, সিদ্ধার্থশংকর রায়ের আমলে কলকাতায় লুকিয়ে থাকার সময় এক বড় নকশাল নেতা বস্তিতে ধরা পড়ে যান দেবী রায়েরই ক্ষুরধার বুদ্ধিতে। ওই নকশাল নেতার ছোট্ট সন্তান বস্তির গলিতে চিনা খেলনা নিয়ে খেলা করছিল। তখন কলকাতায় চিনা খেলনার কথা কেউ ভাবতে পারত না। ওই সূত্র ধরেই দেবী রায় ছদ্মবেশী নকশাল নেতাকে পাকড়াও করেন। কারা এর পর দেবী রায়দের মেথডে চলবে? মানবমস্তিষ্ক এখন কম্পিউটারের দাস। পরদার আড়ালে থেকে কিস্তিমাত করার মতো মানুষ পুলিশ বাহিনীতে দ্রুত কমে আসছে বলে একাধিক অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসারই আক্ষেপ করেন। তাঁদের মতে, খুনের রক্ত কখনও হাত থেকে মোছা যায় না। হোমিসাইড কেসও তাই তামাদি হয় না। এই হত্যাকারীরা কেউই অগ্নিযুগের বিপ্লবী নয়। এরা খুনে-ঘাতক, সন্ত্রাসবাদী। অথচ, এরাই বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সাধারণ মানুষের মনে ভয় ধরাচ্ছে। ‘সত্যমেব জয়তে’, এই মটোর কথা মনে রেখে এদের কেস ফাইল আবারও খোলা উচিত বলে মনে করেন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসাররা।