Date : 2020-10-27

পুলিশের খাতায় কলকাতা নিরাপদ, কিন্তু শিশুরা?

ওয়েব ডেস্ক : ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরো-র (এনসিআরবি) পরিসংখ্যান বলছে, কলকাতা এখন সারা ভারতের মধ্যে সব থেকে নিরাপদ শহর। ২০১৮-র হিসাবে ভারতের ১৯টি বড় শহর মিলিয়ে ভারতীয় দণ্ডবিধি বা ইন্ডিয়ান পেনাল কোড (আইপিসি) অনুসারে নথিবদ্ধ পুলিশ কেসের সংখ্যা মোট ৫ লক্ষ ৪৫ হাজার ৫০২টি। এর মধ্যে রয়েছে চারটি মেট্রোপলিস। কলকাতা, দিল্লি, মুম্বই, বেঙ্গালুরু। কলকাতায় আইপিসি কেস হয়েছে ১৯ হাজার ৮৮২টি। যেখানে দিল্লিতে নথিভুক্ত হয়েছে ২ লক্ষ ২৫ হাজার ৯৭৭টি কেস। মুম্বইতে ৪০ হাজার ৭৫৭টি এবং বেঙ্গালুরুতে ৩০ হাজার ৭৯২টি কেস। ২০১৭ সালের পর ২০১৮ সালেও কলকাতাকে তাই নিরাপদ শহর হিসাবে গণ্য করা হয়েছে। যদিও ১ লক্ষ নাগরিক পিছু ক্রাইম রেটের হিসাবে কলকাতার স্থান তামিলনাড়ুর কোয়েম্বাটোরের পরে। সব থেকে কম আইপিসি কেস কোয়েম্বাটোরে। তার পরে কলকাতা।

২০১৮-র হিসাবে সব থেকে বেশি খুনের কেস দিল্লিতে। ৪১৬টি। কলকাতায় সেখানে ৫৫টি। খুনের চেষ্টার কেস সব থেকে বেশি আইটি হাব বেঙ্গালুরুতে। ৬২৫টি। কলকাতায় এই কেসের সংখ্যা ১৪৩টি। মহিলাদের দুর্ব্যবহার সব চাইতে বেশি মুম্বইতে। সেখানে এই অভিযোগে পুলিশ কেস ১ হাজার ৬৯টি। কলকাতার রমণীরা তুলনায় রমণীয়। তাই এখানে ওই অপরাধের সংখ্যা ১৫১টি। অপহরণ ও লোপাটের কেসও সব থেকে বেশি বলিউড-নির্ভর মুম্বইতে। ২ হাজার ১৫৯টি। সেখানে কলকাতায় এই অপরাধের সংখ্যা ৩৭৪টি। এই ধরনের অপরাধ সব চাইতে কম হওয়ায় কলকাতা মহানগর মেডেল পেলেও একটা অপরাধের সংখ্যা কলকাতায় সর্বাধিক। সেটা হল কারও উপর চড়াও হয়ে জখম করার অপরাধ। কলকাতায় এই অপরাধের সংখ্যা সর্বাধিক, ৬ হাজার ৪৩৯টি।

কিন্তু একটা শহর তো আর গোটা দেশ কিংবা দেশের একটি রাজ্য নয়। প্রতিবেশি রাষ্ট্র বাংলাদেশকে দেখে বোধহয় পশ্চিমবঙ্গের বীরপুঙ্গবরা শিখেছে মেয়েদের উপর অ্যাসিড হামলা করতে হয়। ২০১৩ সালে সুপ্রিম কোর্ট খুচরো অ্যাসিড বিক্রি নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু জাতীয় নারী কমিশন উদ্বিগ্ন, সেই রায় ভারত জুড়ে কার্যকর হয়নি। কমিশন এই রায় কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে আরজি জানিয়েছে। ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ভারতে অ্যাসিড হামলার কেসের নথিভুক্তির সংখ্যা যথাক্রমে ২২৩, ২৪৪ এবং ২২৮টি। ২০১৮ সালে পশ্চিমবঙ্গে নথিভুক্ত অ্যাসিড হামলার কেস ৩৬টি, আর এক বীরপুঙ্গবদের রাজ্য উত্তর প্রদেশে অ্যাসিড হামলার কেস ৩২টি, তেলেঙ্গানায় ১০টি, গুজরাতে সাতটি এবং মধ্যপ্রদেশে পাঁচটি। গা-জোয়ারি প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হলেই অ্যাসিড বাল্ব হাতে এই বীরপুঙ্গবেরা জেগে ওঠে। এরা পিশাচ বিবাহে বিশ্বাসী। এহেন বীরপুঙ্গবদের মধ্যে স্কুল-কলেজ ড্রপ আউটের সংখ্যা কত, সেটাও হিসাব করলে ভালো হত।

কিন্তু কয়েকটা শহরের নিয়নের আলো দেখে খুশি হলেই তো আর চলে না। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরো-র বেশ কিছু হিসাব মোটেই স্বস্তিদায়ক নয়। প্রোটেকশন অফ চিলড্রেন ফ্রম সেক্সুয়াল অফেন্সেস অ্যাক্ট (পকসো) অনুযায়ী ২০১৮ সালে শিশুদের উপর যৌন নির্যাতনের অপরাধ বেড়েছে। ২০১৮ সালে পকসো অনুযায়ী নথিভুক্ত কেসে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ৪০ হাজার ৮১০। ২০১৭ সালে সংখ্যাটি ছিল ৩৩ হাজার ২১০। ২০১৬ সালে ৩৬ হাজার ৩২১। এগুলি নথিভুক্ত কেস। ভারতের মতো পশ্চাদপদ দেশের বহু স্থান এবং সম্প্রদায়েই শিশুদের উপর যৌন উৎপীড়ন কিন্তু একটা রিচুয়ালের অংশ। পরিবারতন্ত্রেও তা সমানে চলে। তাই এ নিয়ে কথা বলাও অনেক সম্প্রদায়ের মধ্যে নিষিদ্ধ। এটা নাকি কচিকাঁচাদের ‘সেয়ানা’ করে তোলার জন্য বাধ্যতামূলক। না হলে তারা চটপটে, স্মার্ট হয়ে উঠবে না। সে কারণেই পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের মধ্যে শিশুদের উপর শত শত যৌন উৎপীড়নের কেস এদেশে নথিভুক্ত হয় না। ঊনবিংশ শতাব্দীতে কুমারী পুজো চালু করেও স্বামী বিবেকানন্দ সমাজে এই বিকার কমাতে পারেননি। তাঁরই সময়কালে বাল্যবধূদের বলাৎকার বা গুরুপ্রসাদী-র প্রচলন বন্ধ করতে ডাফ সাহেবের ছাত্রকুল এবং ডিরোজিও অনুগামী ইয়াং বেঙ্গলিরা হোল ফ্যামিলি-র গুরুদেব বিরিঞ্চি বাবাদের ঠেঙিয়ে মারত। হুতোম অর্থাৎ কালীপ্রসন্ন সিংহ সে সম্পর্কে লিখেও গিয়েছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও এখনও পর্যন্ত এই যৌন বিকারের প্রবণতা কমানো গেল না।

পকসো কেসে সব থেকে খারাপ অবস্থা সুলতানি ও মোগলশাহির ঐতিহ্যবাহী দিল্লি-র। ২০১৮ সালে সেখানে এই অপরাধের হার ৩২.৮। আক্রান্তের সংখ্যা ১ হাজার ৮৫১। তার পরেই রয়েছে গোবলয়ের গর্ব দুধ-পনির-মাখনের হরিয়ানা। সেখানে এই অপরাধের হার ২০.৭। ২০১৮ সালে ওই রাজ্যে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ১ হাজার ৯৩৪। তার পর রয়েছে গা-ছমছমে বেহড়-চম্বলের ছত্তিশগড়। সেখানে এই অপরাধের হার ১৮। আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ১ হাজার ৮২৭। তার পর আছে পেশোয়া তাজের মহারাষ্ট্র। সেখানে এই অপরাধের হার ১৬.৫। আক্রান্তের সংখ্যা ভারতের অন্যান্য রাজ্যের থেকে অনেক বেশি। ৬ হাজার ৩৮৬। এর পর রয়েছে তেলেঙ্গানা। ক্রাইম রেট ১৪.৫। আক্রান্তের সংখ্যা ১ হাজার ৬৮৩। তার পরেই রয়েছে অসমীয়া বুরুঞ্জির রাজ্য অসম। তন্ত্রমন্ত্রের সিদ্ধপীঠ। সেখানে এই অপরাধের হার ১৪.৫। আক্রান্তের সংখ্যা ১ হাজার ৭৩৩। তার পর মন্দিরগাত্রে চালচিত্রের মহিমামণ্ডিত ওডিশা। সেখানে এই অপরাধের হার ১৩.৪। আক্রান্তের সংখ্যা ১ হাজার ৮৯৫। অতঃপর মালয়ালি এ-মার্কা সিনেমার রাজ্য কেরল। অপরাধের হার ১২.৩। ২০১৮ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ১ হাজার ১৯৬। তার পর রয়েছে মহাত্মা গান্ধী, বল্লভভাই প্যাটেল ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্রভাই দামোদরদাস মোদির আপন রাজ্য গুজরাত (পাকিস্তানের জনক মহম্মদ আলি জিন্নাও ছিলেন গুজরাতি)। ক্রাইম রেট ১০.৪। আক্রান্তের সংখ্যায় মহারাষ্ট্রের পরেই। ২ হাজার ২০৫। ব্ল্যাক ম্যাজিক অর্থাৎ জাদুটোনার বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইন থাকা সত্ত্বেও কর্ণাটকে পকসো আইন অনুসারে অপরাধের হার গুজরাতের সমান। ১০.৪। আক্রান্তের সংখ্যায় তৃতীয় স্থানে। সেখানে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ২ হাজার ৬৭। পকসো কেসে সব থেকে খারাপ অবস্থায় থাকা দশটা রাজ্যের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ নেই বলে আত্মশ্লাঘার জায়গা নেই। কারণ, সোডম ও গোমরা-র মতো এই নারকীয় অপরাধের পাপ থেকে বাপ-মা কারওরই নিস্তার নেই।

উপরেই আছে, পুলিশের খাতায় যা নথিভুক্ত হয়েছে সেই হিসাব ধরে ২০১৮ সালে ভারতে পকসো কেসে আক্রান্তের সংখ্যা মোট ৪০ হাজার ৮১০। ক্রাইম রেট ৮.৯। ২০১৭ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৩৩ হাজার ২১০। ক্রাইমের রেট ছিল ৭.৩। ২০১৬ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৩৬ হাজার ৩২১। ক্রাইম রেট ৮.১।

এই হিসাবের পাশাপাশি এনসিআরবি-র হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে গোটা দেশে রাষ্ট্রদ্রোহিতার কেসের সংখ্যাও অনেক বেশি। ২০১৭ সালে সিডিশন কেসের সংখ্যা ছিল ৫১টি। ২০১৮ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭০-এ। আগের বছরের তুলনায় ১৯টি সিডিশন কেস বেড়েছে।