Date : 2024-06-21

শতবর্ষের পাদপ্রদীপে মাইকেল মধুসূদন লাইব্রেরি ।

শাহিনা ইয়াসমিন, সাংবাদিক :- আজকের দিনে ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনা ডিজিটাল হয়ে যাচ্ছে। বাড়ির মা-মাসিরা মগ্ন টেলিভিশনে। সবাই সব পড়েন মোবাইলে বা ল্যাপটপে। এসবের মাঝেও খিদিরপুরের মনসতলা লেনে মাইকেল মধুসূদন লাইব্রেরি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে শতবর্ষ পার করে এগিয়ে চলেছে। এ যেন এক বিরল ঘটনা। এইভাবেই মাইকেল মধুসূদনের কাজ কর্মের স্মৃতিও বেঁচে থাকছে।

সাহিত্যের অঙ্গনে মাইকেল মধুসূদন দত্ত যেন এক ঝড়ের মতো আসা আগন্তুক। পূর্ববর্তী কবিদের অনুসরণের পথে না হেঁটে, সাহিত্য জগতে এসে ঘটালেন এক বিপ্লব। সৃষ্টি করলেন ‘মেঘনাদবধ কাব্য’। অমিত্রাক্ষর ছন্দে রামায়ণ মহাকাব্যের নবরূপায়ণ করলেন। ‘ব্রজাঙ্গনা’ কাব্য, ‘কৃষ্ণকুমারী’ নাটক, ‘বীরাঙ্গনা’ কাব্য– তাঁর একের পর এক কালজয়ী সৃষ্টি। , চতুর্দশপদী কবিতা লিখে তৈরি করলেন নতুন ধারা।

মাইকেল মধুসূদন দত্তর বাল্যকাল থেকে প্রথম যৌবনের দিনগুলি কেটেছিল কলকাতার খিদিরপুর অঞ্চলে। মাইকেলকে স্মরণ করেই তাঁরই নামে গড়া হয়েছে একটি পাঠাগার। খিদিরপুর এলাকার কিছু বাসিন্দা আছেন যারা ষাট ঊর্ধ্ব তারাই মূলত ১০৮ বছর পুরোনো মাইকেল মধুসূদন লাইব্রেরিকে আজও বাঁচিয়ে রেখেছেন।

কলকাতা শহরে গড়ে উঠেছিল একের পর এক পাঠাগার। বাঙালির কাছে তখন কদর ছিল বইয়ের। বাড়ির মেয়ে-বৌদের বিনোদনের বড় মাধ্যমও তখন ছিল বই। দুপুরের রাঁধাবাড়া সেরে গা এলিয়ে বই পড়তেন মা-দিদিরা। পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীদের কাছে পাঠাগার ছিল এক স্বর্ণখনি। কিন্তু নয়ের দশকের পর থেকেই চিত্রটা আস্তে আস্তে বদলে যেতে থাকে। উঠে যেতে থাকে একের পর এক লাইব্রেরি। টেলিভিশন মানুষকে অনেকটাই গৃহবন্দি করে ফেলে। আর মোবাইল আসার পরে তো লাইব্রেরি সাম্রাজ্যের কবরে শেষ পেরেকটাও যেন পোঁতা হয়ে গেছে। নতুন প্রজন্মের মুঠোয় এখন গোটা বিশ্ব। লাইব্রেরির প্রয়োজন ফুরিয়েছে তাদের কাছে। ১৯১৫ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি মাইকেল মধুসূদন লাইব্রেরির গোড়াপত্তন হয়।তবে সেইসময় বিট্রিশ যুগে লাইব্রেরির পথ চলা সোজা ছিল না। স্বদেশী আন্দোলনের বিপ্লবী সংগঠন ‘অনুশীলন সমিতি’র ঠেক ছিল খিদিরপুর মনসাতলার গলিতে।

তাই ব্রিটিশ শাসকদের রোষানলে পড়ল এই লাইব্রেরিও। এই লাইব্রেরির সাধারণ সম্পাদক অমিয় সেনগুপ্ত জানান, এই লাইব্রেরিতে এসেছেন প্রমথ চৌধুরী, মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দী, বাসন্তী দেবী, বনফুল বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় ও আরও অনেকে। ১৯৪০ সালে মাইকেল মধুসূদন লাইব্রেরি সরানো হয় এখন বর্তমান ঠিকানা ১৭/১/২ মনসাতলা লেন, খিদিরপুরে। ১৯৪০ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি কলকাতার প্রাক্তন মেয়র সন্তোষ কুমার বসুর নেতৃত্বে এই নতুন ভবনে লাইব্রেরির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। সন্তোষ কুমার বসু তখন এই লাইব্রেরির সভাপতিও ছিলেন। বহু দুর্লভ গ্রন্থের ধারক ও বাহক এই গ্রন্থাগার। প্রায় ৩০ হাজারের ওপর দুষ্প্রাপ্য বই এই লাইব্রেরিতে রয়েছে। তিনটি ভাষা অর্থাৎ হিন্দি, বাংলা, ইরাজী ভাষার বই আছে। কারণ খিদিরপুর এলাকায় হিন্দি ও বাংলা ভাষাভাষীদের বাস। মাইকেল মধুসূদন লাইব্রেরিতে মাইকেল মধুসূদন দত্তের নিজের লেখা বইয়ের সম্ভার রয়েছে আলাদা ভাবে। একটি আলমারিতে সযন্তে তোলা আছে। খিদিরপুরের কৃতী সন্তান প্রাক্তন বিচারপতি শ্রী অশোক গঙ্গোপাধ্যায় এই লাইব্রেরির বর্তমান সভাপতি।
কলকাতার বহু পুরনো, ঐতিহাসিক লাইব্রেরি আছে যেগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার মুখে। চালানোর মত অর্থের অভাব, নিয়োগের অভাব। বয়স্ক লাইব্রেরিয়ান দের কাধে লাইব্রেরি চালানোর দায়িত্ব, যা চিন্তার বিষয়। নতুন প্রজন্ম কি দায়ভার তুলে নেবে? সেটায় প্রশ্নের। বইয়ে ফিরুক বই প্রেমীরা।