Date : 2020-10-23

অনাদরে মলিন হয়ে যাচ্ছে বিপ্লবীদের স্কুল…

উত্তর ২৪ পরগণা: ব্রিটিশ অধ্যুষিত কলকাতায় রাইটার্স বিল্ডিং অভিযানের সঙ্গে যুক্ত বিপ্লবী রসময় সুর ও নিকুঞ্জ সেন স্বাধীনতার সাত বছর পর এলাকায় শিক্ষার আলো প্রজ্বলিত করতে রাজারহাট এলায় স্কুল তৈরীর পরিকল্পনা করেন। সেই অনুসারে এলাকার বিত্তশালী জমিদার সর্বেশয় মন্ডলের কাছে আর্জি জানাতেই দ্বিমত না করে জমিদার ৯ বিঘা জমি দিয়ে দেন বিপ্লবীদের। জমির সঙ্গে বিপ্লবীরা পেয়েছিলেন বেশ কয়েক গোলা ধান। ধান বেচা অর্থে তৈরী হয়েছিল স্কুলের কাঠামো। পরে ধিরে ধিরে অর্থ সঞ্চয় করে গড়ে ওঠে স্কুলের আসবাব পত্র। ১৯৫৪ সালে পূর্ণরূপে আত্মপ্রকাশ করে এই স্কুল।

আর সেই স্কুল এখন উত্তর ২৪ পরগণার রাজারহাট শেখরপুকুরের বাগু অঞ্চলে গাছপালার জঙ্গলে ভগ্ন দশায় দাঁড়িয়ে আছে। ভেঙে পড়েছে স্কুলের দরজা, অযত্নে দাঁড়িয়ে আছে বিপ্লবী মোহিত রায় সহ বহু স্বনাম ধন্য স্বাধীনতা সংগ্রামীর স্মৃতি ফলক। দূর থেকে দেখলে মনে হবে বহুদিন এই স্কুল পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। এই ধারণা অবশ্য সম্পূর্ণ সত্যি নয়, কোন মতে প্রাণবায়ু সঞ্চয় করে আজও নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে রাজারহাটের পল্লী নিকেতন সপ্তগ্রাম স্কুল। শোনা যায় সেই সময় স্কুলের শিক্ষার দায়িত্ব ছিল নেতাজি ঘনিষ্ঠ মেজর সত্য ভূষণ গুপ্তের হাতে। স্কুলের শিক্ষক পদে ছিলেন বেঙ্গল ভলেন্টিয়ার্সের সক্রিয় সদস্য ভুপেন্দ্র কিশোর রক্ষিৎ রায়, হেমচন্দ্র ঘোষ, ভক্ত কুমার ঘোষ এবং নিরব দত্তগুপ্ত। পঠন পাঠনের পাশাপাশি এই স্কুলে স্বদেশ চেতনার মন্ত্রে দীক্ষা দেওয়া হত। কিন্তু স্কুলের রূপকার একের পর এক স্বাধীনতা সংগ্রামীর মৃত্যুতে স্কুলের অস্তিত্ব সংকটে পড়ে যায়। ১৯৮৬ সালে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় স্কুলের পঠন-পাঠন। এরপর স্কুলের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয় তপন কুমার বৈদ্যের হাতে। চলমান ইতিহাস হয়ে আজও তিনি স্কুলের অস্তিত্ব রক্ষা করে চলেছেন। তিনি সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, এই স্কুলেই একসময় রাইটার্স অপরেশনের ব্লু-প্রিন্ট তৈরী করেছিলেন বিপ্লবরা।

বিনয়, বাদল ও দিনেশকে রাইটার্স অভিযানের জন্য সাহেবি পোশাকে পৌঁছে দেন রসময় সুর ও নিকুঞ্জ সেন। আর এখন এই স্কুলের বেহাল দশা। মাস এডুকেশন থেকে কিছু অর্থ সাহায্য দেওয়া হলেও স্কুলে বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্র, মহিলাদের হাতের কাজ শেখানো, ছেলেদের নানা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও এখন তা উঠে গেছে প্রায়। ২০২০ সালে অবসর পেয়ে যাবেন বর্তমান স্কুলের একমাত্র দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি তপন বাবু। স্কুল বাড়িতে অনাদরে নষ্ট হচ্ছে বিপ্লবীদের বইপত্র,পুরু ধুলোর স্তুপে ঢাকা পরেছে আসবাব পত্র, হারিয়ে যেতে বসেছে নেতাজি সম্পর্কিত মূল্যবান নথি।

চাঁদপুর অঞ্চলের সভাপতি তরণী নষ্কর মুখ্যমন্ত্রীর আবেদন করেছেন স্কুলের সরকারী অধিগ্রহণ করার জন্য। এই জাতীয় সম্পত্তি সরকারের কাছে ঐতিহ্য হয়ে রক্ষনাবেক্ষন হোক এমনটাই আবেদন করেছেন এলাকার পঞ্চায়েত সদস্য তরণী বাবু। একদিকে ইতিহাস, অন্যদিকে ক্রমশ থাবা বসাচ্ছে আধুনিকতা। স্কুলের অনেকটা অংশ জুরে এখন পিকনিক স্পট। আর রাত নামলেই এলাকা চলে যায় সমাজ বিরোধীদের হাতে। সরকারি সাহায্য না পৌঁছানো পর্যন্ত চোখের সামনে জাতীয় সম্পত্তি হারিয়ে যেতে দেখা ছাড়া উপায় নেই স্কুলের দায়িত্বে থাকা তপন বাবুর।