Date : 2020-10-29

গুজরাটে উদ্ধার ৯ হাজার বছরেরও বেশি পুরনো নগরী কি দ্বারকা !

ওয়েব ডেস্ক: এখনও ঐতিহাসিকদের মধ্যে দ্বিমত আছে ভারতের দুটি প্রাচীন মহাকাব্যের সমস্থ ঘটনা ও পুরাণের সত্যতা নিয়ে। অনেক ঐতিহাসিকরা মনে করেন এর সবটুকু সত্যি নয়। তাহলে শ্রী কৃষ্ণ কি সত্যি ভগবান ছিলেন নাকি সবটাই কাহিনী নির্ভর? এই বিষয় নিয়ে অনেক সমালোচক অনেক সন্দেহ প্রকাশ করেন। বাস্তব আর মিথ যখন একাকার হয়ে যায় তখন মেনে নেওয়া অনেকটাই অসম্ভব হয়ে যায়। তিনি নাকি পৃথিবীতে এসেছিলেন এবং শুধুমাত্র ভারতেই এসেছিলেন ধর্মের স্থাপনা করতে। তাঁর বাসস্থান ছিল দ্বারকা। এই দ্বারকার অস্তিত্ব অনেক ঐতিহাসিকরা মেনে নিতে পারেননি। কিন্তু পাঁচ হাজার বা দশ হাজার বছর আগের নয় একেবারে ১০ থেকে ২০ হাজার বছর আগের ঘটনা এটি। সমুদ্রের নিচে ভারতীয় নগর সভ্যতার খোঁজ পাওয়া গেছে। ৯ হাজার বছর আগে এই পৃথিবীতে নগর সভ্যতা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল এটা ভাবা প্রায় অসম্ভব! কিন্তু এটাই সত্য। এই সভ্যতার অনুসন্ধান দিয়েছে ভারত সরকারের মেরিন আর্কিওলজি ডিপার্টমেন্ট। ভারতের গুজরাট রাজ্যের সমুদ্রে গল্ফ অফ খামবাট থেকে সাত মাইল দূরে সন্ধান পাওয়া গেল পাশাপাশি দুটো শহর যার আয়তন ৫ বর্গমাইল।

ঠিক ১৫ বছর আগে ২০০১ সালে ভারত সরকারের মেরিন আর্কিওলজি ডিপার্টমেন্ট সমুদ্রের তলদেশে নিমজ্জিত এ দুটো শহর থেকে পাথরের বিভিন্ন আসবাবপত্র তুলে নিয়ে আসে। তারপর সেই সব নমুনাকে কার্বন ডেটিং পদ্ধতিতে পরীক্ষা করে সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, ১০ হাজার আগে এখানে ভারতীয় নগর সভ্যতার নিদর্শন ছিলো। এই প্রত্নতাত্ত্বিক শহরকে অনেকেই বলছেন শ্রী কৃষ্ণের দ্বারকা নগর। এই নগরের প্রান্তে একাধিক দরজা ছিল তাই দ্বারকা নাম দেওয়া হয়েছিল। বর্তমান ভারতের গুজরাট প্রদেশে জামনগর জেলার গোমতী নদীর তীরে দ্বারকা নগরী অবস্থিত এবং এখানে প্রায় ৮০০ বছরের অধিক সময় পূর্বে নির্মিত ৫৭ মিটার উঁচু ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মন্দির রয়েছে। বর্তমানে এই স্থানটি সন্নাসীদের কাছে দ্বারকা নামে পরিচিত। তবে মহাকাব্য কিন্তু অন্য কথা বলছে। যাদবকুল শিরোমণি শ্রী কৃষ্ণের দ্বারকা নগর গুজরাটের খাম্বাত সাগরে নিমজ্জিত হয়েছিল মহাভারতের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের প্রায় ৩৬ বছর আগে। কারণ হিসাবে পুরাণে লেখা আছে শ্রী কৃষ্ণের পুত্র সাম্ভ ঋষি বিশ্বামিত্র ও দুর্বাশার কাছে অভিশাপ পায় উশৃঙ্খলতার জন্য। সেই অভিশাপে নাকি আস্ত একটা নগর সমুদ্রে নিমজ্জিত হয়ে গেছিল। এখন গুজরাটে যে অংশটিকে দ্বারকা বলা হয় সেই অংশ কোন ভাবেই ৫-৬ হাজার বছরের পুরনো ভারতের প্রাচীন নগর সভ্যতা নয়। গোয়াস্থ ন্যাশানাল ইন্সটিটিউট অব অ্যাসেনোগ্রাফি এর মেরিন আরকিওলজি সেন্টারের প্রজেক্ট ডাইরেক্ট্রর ডঃ এস আর রাও এর লিখিত ও শ্রী নান্টু রায়ের অনুবাদকৃত “সমুদ্র প্রত্নতত্ত্বের বিস্ময় জলধি নিমগ্ন মন্দিরময় শহর দ্বারকাকে খুঁজে পাওয়া গেছে” র্শীষক এক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় এই আবিষ্কারের কথা। এ প্রবন্ধে উক্ত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বহু চেষ্টা করে জলমগ্ন ও ডুবে যাওয়া জাহাজ উদ্ধারের মাধ্যমে পুরানো সময়ের সমুদ্র তীরবর্তী জাহাজ নির্মাণ ও তাত্কালীন শিল্প সংস্কৃতির ওপর ব্যাপক অনুসন্ধান চালিয়ে দ্বারকা নগরীর সন্ধান লাভের এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উপস্থাপন করতে সমর্থ হয়েছে । প্রবন্ধে বলা হয়েছে এই নগরীর ধার দিয়ে একটি নদী বয়ে যাওয়ার চিহ্ন পেয়েছেন সমুদ্র বিজ্ঞানীরা। সেই নদীর নাম গোমতী বলে মহাভারতে উল্লেখ আছে। ডুবন্ত জাহাজ ও জলমগ্ন শহর সমুদ্রতলে টাইম স্কেল হিসেবে কাজ করেছে ।

প্রায় ২১০ টি জাহাজের ভগ্নাবশেষ এ পর্যন্ত পাওয়া গেছে এবং এর মধ্যে ৩২টি ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে । লাক্ষাদ্বীপের কাছে নিমজ্জিত রত্নবাহী একটি জাহাজের উপর ওপর প্রাথমিক পরীক্ষা নিরীক্ষা চালানো হয়েছে । ভূ-পদার্থের জরিপ করে দেখা গেছে যে জাহাজের ভগ্নাবশেষ রয়েছে সেখানে। প্রত্নতাত্ত্বিক আবিস্কারের মধ্যে ডুবে যাওয়া প্রাচীন বন্দর আবিস্কার হচ্ছে সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা । ভারতীয় সমুদ্র উপকূলে অনেক প্রাচীন বন্দর ডুবে গেছে,আর এর মধ্যে দ্বারকা হচ্ছে একটি। যদিও পুরানো দ্বারকার ওপরেই নতুন দ্বারকা অবস্থিত তবুও এর প্রকৃত পরিচয় ১৯৭৯-৮০ সালের আগে জানতে পারা যায়নি । এখনকার দ্বারকাধীশ মন্দিরের সন্মুখে ভূমি খুঁড়ে খ্রিষ্টপূর্ব ১৪-১৫ শতকের ৩টি মন্দিরের ধ্বংসাবশেষে ডুবন্ত নগরীটির বাস্তুধ্বংস আবিষ্কার করা হয়। এর মধ্যে খ্রীষ্টপূর্ব নবম শতকে নির্মিত বিষ্ণু মন্দির সবচেয়ে কম পুরোনো। এখানে বিষ্ণু, শিব ও অন্যান্য দেবদেবীর চমৎকার সব ছবি উৎকীর্ণ রয়েছে। প্রথম দিকের মৃত্তিকাস্তরে একটি উজ্জ্বল লাল বর্ণের মৃৎ পণ্য পাওয়া গেছে। আরব সাগরে থেকে সমুদ্র নারায়ণের যে মন্দির দেখা যায় সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ল্যান্ডমার্ক । কারন এখানেই ভারতের সবচেয়ে প্রাচীন সমুদ্র দেবতা মন্দির নির্মিত হয়েছিল। ৫৭৪ খ্রীস্টাব্দে রাজা গরুলকের নানা উত্কর্ণ লিপি থেকে পূর্বোল্লেখিত দ্বারকার কথা জানা যায়। এই প্রভাস ক্ষেত্রের কার্বন-১৪ প্রণালীতে বয়স খ্রীষ্টপূর্ব ১৫ শতক। খাম্বাত সাগর থেকে আরো পশ্চিমে বেট দ্বারকার আশেপাশে এখনো ভয়ঙ্কর সব অক্টোপাসের বাস করছে যা ডুবরিদের জন্য বেশ বিপদজনক। এসব অসুবিধে ও বাধা অতিক্রম করে সমুদ্র প্রত্নতত্ত্ব অভিযানের বিজ্ঞানী ও ডুবরিরা দুর্গপ্রাচীর ও অন্যান্য ভবন, পাথরের তৈরি বিভিন্ন স্থাপত্য নিদর্শন ,লোহার নোঙ্গর, বিভিন্ন মুদ্রা,পট,পুঁতির মালা আবিস্কার করতে পেরেছেন।

ডুবন্ত দ্বারকা ও বেট দ্বারকায় ১৯৮২ থেকে ১৯৮৬ এই চার বছরে সর্বমোট ৫ ধরনের অভিযান চালানো হয়েছে। সমুদ্রের ধার ধরে খননকার্য প্রায় ৯০ কিলো মিটার নিচে অনেক মন্দিরের চুড়া ও তার ধার দিয়ে বড় বড় পাথরের তৈরী বিস্তির্ণ উঁচু প্রাচীর পাওয়া গেছে। পাথরের বয়স প্রায় ৯ হাজারের ও বেশি পুরনো। বেট দ্বারকাতেই পাওয়া গেছে হরপ্পা যুগের পুঁতির মালা, হাঁড়ি-পাতিল এবং বিরাট দালানের খন্ডাংশ, যা অনেকটা মন্দিরের মতো কারুকার্য করা। এগুলো অনেক প্রাচীন বলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন। এছাড়া শামুক ঝিনুক এর তৈরি দেয়াল, সিন্ধু সভ্যতার শঙ্খের সিল মোহর সহ আরো অনেক আরটিফেক্ট এ ভর্তি এই স্থান। জলের ৬.৪১ মিটার নিচে একটি দুর্গ পাওয়া গেছে,যেটা চুনাপাথরের অর্ধ বৃত্তাকার ব্লক দিয়ে তৈরী। এটি সমুদ্র নারায়ন মন্দির থেকে ৬০০ মিটারসমুদ্র গভীরে অবস্থিত। এখানে তিনছিদ্র বিশিষ্ট ত্রিফলা নোঙর উদ্ধারকরা হয়েছে যা ক্ষয় রোধক দেয়াল হিসেবে ব্যাবহৃত হত সঙ্গে সঙ্গে শত্রুর আক্রমন থেকে ও বাঁচাত ।

মহাভারতে বর্ণিত আছে শ্রী কৃষ্ণের বয়স যখন ১২৫ বছর তখনও সে চির যৌবনের অধিকারী ছিলেন। শ্রী কৃষ্ণের মৃত্যুর অনেক বছর অাগে ধ্বংশ হয়ে গেছিল দ্বারকা নগরী। তবে শ্রী কৃষ্ণের মৃত্যুর কারণ পাওয়া গেলেও আনুমানিক কত বছর বয়সে তিনি মারা গেছিলেন তা নিয়ে কোন সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। বিজ্ঞান আর বিশ্বাসের দ্বন্দ্ব এখনও চলছে। ধর্ম মতে বিশ্বাস শ্রী কৃষ্ণ অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ভগবান ছিলেন। তবে ডঃ দীপক চন্দ্রের “কৃষ্ণস্থ ভগবান” পুস্তকে প্রমান করার চেষ্টা হয় তাঁর ঈশ্বরীকত্বকে বৈজ্ঞানিক ভাবে। খাম্বাত উপসাগরের এই ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণই প্রমান করতে পারবে যে শ্রী কৃষ্ণের অস্তিত্ব কাল্পনিক নাকি বাস্তবে তিনি ছিলেন।