Date : 2019-07-23

পলিথিনের শহরে অনাদরে ‘সহজ পাঠ’-র ‘বংশী বদন’রা

কলকাতা: ‘কুমোর পাড়ার গোরুর গাড়ি/বোঝাই করা কলসি হাঁড়ি’, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সহজ পাঠ’ কবিতায় গ্রামের কুমোর বংশী বদন তার ভাগ্নে মদন-কে নিয়ে রোজ গাড়ি বোঝাই মাটির হাঁড়ি কলসি আরও কত রকমের বাসন নিয়ে হাটে যেতেন বিক্রি করতে। মাটির বাসনের চাহিদাও ছিল তুঙ্গে। রেফ্রিজারেটারের যুগে শহরে মাটির কলসির ঠান্ডা জল খাওয়ার রেওয়াজ প্রায় কারোর বাড়িতেই নেই। অফিস টেবিলে চা এসে পৌঁছায় কাগজ অথবা প্লাস্টিক বা থার্মোকলের কাপে।

হাতে গোনা কয়েকটা চায়ের দোকান ছাড়া কোথাও মাটির ভাঁড়ের সোঁদা গন্ধ মিশে থাকা চায়ের স্বাদ মেলে না। কলকাতা পুরসভার তরফে পরিবেশ সচেতনতার বার্তা দেওয়া সত্ত্বেও প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধ করে ফিরে যেতে পারি না মাটির ভাঁড়ের যুগে। শহরের আনাচে কানাচে থাকা ‘বংশী বদন’ বা ‘মদন’-দের রুটি রুজি নির্ভর করে মাটির বাসন, প্রদীপ ও ভাঁড় তৈরি করেই।

পলিথিনের যুগে পরিবেশ রক্ষায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা তাদেরই। মাটির বাসনের চাহিদা কমে যাওয়ায় সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। বহু হাত, কালোহাত ঘুরে মাটি এসে পৌঁছায় কুমোরদের হাতে। তাল তাল মাটি হাতের কায়দায় রূপ দিয়ে তৈরি করে ফেলেন অসাধারণ কারুকার্য করা প্রদীপ, ধুনচি, ভাঁড়, কলসি আরও কত রকমের বাসন পত্র। দিনে ১৮ঘন্টা হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেও সংসারের মুখে হাসি ফোটাতে হিমশিম খেতে হয় কুমোরদের।

কায়িক পরিশ্রমের টাকা তো দূরের কথা কাঁচামালের পুঁজি ফেরৎ আসে না তাদের। উল্টোডাঙার খালপাড় দিয়ে গেলেই বাঁশ, টালি,প্লাস্টিকের ছাউনিতে ঘুপচি ঘরগুলি চোখে পড়বে। এই ঘরেই সপরিবারে আধপেটা খেয়ে দিন কাটাতে মৃৎকার পরিবারগুলিকে। জিএসটির প্রভাব তাদের উপর না পড়লেও বিমুদ্রাকরণের আঁচে পুড়েছিল ক্ষুদ্র মৃৎশিল্পীরা। ভোট আসে ভোট যায়, নেতা মন্ত্রীরা পরিবেশ রক্ষা, প্লাস্টিক বর্জনের কথা শোনান, কিন্তু অভাব মিটে একটু স্বচ্ছল দিন দেখতে পান না এই পরিবেশ বান্ধব মৃৎশিল্পের কারিগররা। বুকে তাদের একরাশ আশা, ভোট দিতে হবে, একদিন প্লাস্টিক বর্জিত শহর তাদের দিকে ফিরে চাইবে।