Date : 2021-05-06

মুভি রিভিউ- আর্টিক্যাল ১৫

ওয়েব ডেস্ক: “বাতে বহুত হুই কাম শুরু কারে কেয়্যা…”। কথা বলার সময় নেই আর।এবার সত্যিই করে দেখানোর সময় এসেছে বোধ হয়। হ্যাঁ, ধমক চমকের সামনে দাঁড়িয়েও করে দেখিয়েছেন পরিচালক অনুভব সিনহা। হলের দর্শকাসনে নির্বাক হয়ে থাকবেন আপনি। পর্দার ওপার থেকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন ছুঁড়ে দেবে “আর্টিক্যাল ১৫”। কেন? স্বাধীনতার ৭০ বছর পর এমন কি প্রশ্ন সবার সামনে এসে দাঁড়াল? দেশ, জাতি হঠাৎ কোন প্রশ্নের মুখে পড়ল? সেই উত্তর খুঁজতেই এই দেশ, এই সমাজের ভয়াবহ অন্ধকার কোণকে তুলে এনেছে অনুভব সিনহা পরিচালিত “আর্টিক্যাল ১৫” ছবি। ছবিটি নির্মিত হয়েছে সত্য কাহিনীর উপর নির্ভর করেই।

অভিনেতা- আয়ুষ্মান খুরানা, দিশা তলওয়ার,মনোজ পাহওয়া,সায়নী গুপ্তা,কুমুদ মিশ্র,মহম্মদ জিশান আয়ুব

পরিচালক- অনুভব সিনহা

ছবির ধরন- Drama, Thriller

ছবির সময় সীমা- 2 h. 10 min

অ্যাকশন থ্রিলার ছবি, তাই প্রথম থেকেই চোখের পলক ফেলতে পারবেন না দর্শকরা এমনটাই আশা ছিল। হল ফেরৎ দর্শককে বলতে শোনা গেল “এক্সপেক্টেশনের থেকে একটু হলেও বেশি” পেয়েছেন তারা। অভিনয় জগতে প্রবেশের সময় থেকেই আয়ুষ্মান খুরানা ব্যতিক্রমী চরিত্রেই নিজেকে মেলে ধরেছেন। পুলিশ অফিসারের চরিত্রে তিনি আরও একবার সাফল্য রেখেছেন দর্শকের কাছে তা আর নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। তবে আর্টিক্যাল ১৫ ছবির গল্প আর চিত্রনাট্যই আসল নায়ক।

মধ্যপ্রদেশের প্রত্যন্ত গ্রাম লালগাঁও-তে একজন যুবা আইপিএস অফিসার পোস্টিং পান। কিন্তু সেখানে পা রাখতেই তিনি সমাজের জাতি বিদ্বেষের অন্ধকার এক কুপের মধ্যে প্রবেশ করেন। গ্রাম থেকে তিনজন কিশোরী আচমকাই হারিয়ে যায়। এদের মধ্যে দুজনর মৃতদেহ গাছে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। আর তৃতীয় জনকে খুঁজতে শুরু হয় একজন পুলিশ অফিসারের হার না মানা যুদ্ধ। প্রাথমিক তদন্তে তুলে আনা হয় মিথ্যা প্রমাণ।

সমকামীতার কারণে নিজের মেয়েদেরকে হত্যা করা হয়েছে। এই দোষে দুই কিশোরীর বাবাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। কিন্তু তদন্ত ভার নিজের হাতে নিয়ে অন্য ঘটনার আঁচ পান পুলিশ অফিসার অয়ন রঞ্জন(আয়ুষ্মান খুরানা)। প্রেমিকা অদিতি (ঈশা তলওয়ার)-কে সমস্ত ঘটনার কথা বলেন। ক্রমশ উঠে আসতে থাকে জাতপাতের ভিত্তিতে ‘দলিত’-এর নাম করে SC, ST, OBC-এর ভিত্তিতে মানুষের উপর চরম অত্যাচারের কথা। ছবির ইন্টারভেলের সময় বড় বড় করে পর্দায় ভেসে ওঠে সংবিধানের ১৫ নম্বার ধারা।

যেখানে ধর্ম,জাতি,বর্ণ, লিঙ্গ, জন্মস্থানের ভিত্তিতে পক্ষপাতিত্ব না করে সকলের সমান অধিকারের লাভের কথা রয়েছে। অর্থাৎ “Right to Equality” অভাবে ভুগছে দেশ! আর ছবি সেই সত্যকেই তুলে ধরেছে। ছবির মাধ্যমে উঠে এসেছে শিশু শ্রম, নাবালিকা ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য অপরাধের নারকীয় চিত্র। আর সেই অত্যাচারীদের মাথায় রয়েছে প্রশাসনের হাত! মাত্র ৩ টাকা অতিরিক্ত চাওয়ায় তিন কিশোরীকে নারকীয় ভাবে ধর্ষণ করে পুরো জাতকে শিক্ষা দেওয়ার হয়েছে। আর ছবিতে পুরো দেশকে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে জাতি বিদ্বেষের কোন পর্যায় পৌঁছে গেছে ভারতবর্ষে।

তদন্তের শিকড় যতই গভীরে পৌঁছাতে শুরু করে সাসপেনশনের নোটিশ এসে পৌঁছায় পুলিশ অফিসার অয়নের হাতে। অদম্য চেষ্টা আর ইচ্ছা শক্তির জেরে তদন্ত এগিয়ে নিয়ে অবশেষে নিখোঁজ হওয়া তৃতীয় মেয়েটিকে খুঁজে পান পুলিশ অফিসার অয়ন। আর এই নিখোঁজ ‘দলিত’ মেয়ে পুজাকে নিয়েই অভিযান ঘিরেই পুরো গল্পের মোচড় শুরু।রুদ্ধশ্বাস প্রতিটি দৃশ্যে অসাধারণ আলো আঁধারের খেলা বদলে ফেলবে আপনার মুড।গাছ থেকে ঝুলন্ত দুই কিশোরীর দেহ দেখে কাঁটা দেবে আপনার শরীর। ছবির প্রতিটি রুদ্ধশ্বাস দৃশ্যের সঙ্গে একেবারেই সামঞ্জস্যপূর্ণ মিউজিক। টানটান চিত্রনাট্যের মধ্যে দিয়েও আয়ুষ্মান আর ঈশার কেমিস্ট্রিকে বোঝাতে গান গুলিই যথেষ্ট।

টানটান ছবি হলেও বেশ কয়েকটি জায়গা দর্শকের সামনে নেতিবাচক প্রশ্নও রাখবে। প্রথমত, একজন সাসপেন্ডেড পুলিশ অফিসার কিভাবে তদন্তের কাজ চালিয়ে যান? আর উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যদি তাকে সাসপেনশনের নোটিশ দিয়েই দেয় তবে ফোনের মাধ্যমে কিভাবে তদন্ত চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেন তাঁকে? তাছাড়া ছবির পটভূমিকা মধ্যপ্রদেশের একটি কাল্পনিক গ্রাম হলেও প্রশাসকের ভূমিকায় যিনি ছিলেন তিনি একটি নির্দিষ্ট ধর্মগুরু। বাস্তবে কি তবে উত্তরপ্রদেশের প্রশাসনিক প্রধানকে পরিচালক অনুভব সিনহা তাঁর ছবিতে “মোহন্ত” চরিত্রের মধ্যে দিয়ে সরাসরি আক্রমণ করেছেন? ছবিতে রাজনৈতিক সমালোচনাও খুব স্পষ্ট। আর সিবিআই-এর মতো কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাকে ছবিতে জাতিবিদ্বেষের প্রচ্ছন্ন সমর্থকের ভূমিকায় দেখালেন পরিচালক! এতে প্রশাসনের উপর থেকে অনেকটাই কি বিশ্বাস হারাবে না মানুষের?

জাতিবিদ্বেষের জ্বলন্ত সমস্যা নিয়ে এই ছবিতে দর্শককে ভাবিয়ে তোলার মতো রসদ অবশ্যই রয়েছে। হল ফেরৎ দর্শককে সমাজ ও রাজনীতির মূলে ক্রমশ ছড়িয়ে পড়া ব্যাধীর যন্ত্রণার অনুভব করাতে কতটা সফল হলেন অনুভব সিনহা পরিচালিত “আর্টিক্যাল ১৫” তা জানতে অবশ্যই হলে পৌঁছে যেতে হবে দর্শককে।