Date : 2019-09-18

মুভি রিভিউ: গোত্র

ওয়েব ডেস্ক: অনেকেই বলেন, সোশ্যাল মিডিয়ার চেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম এখন আর কিছু নেই। অথচ নিউজ ফিড ঘোরালে বেশির ভাগ সময় আপনার চোখের সামনে ভেসে উঠবে নোংরা মিম আর ট্রোলিং। দেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে স্বর্গের দেবতা, মিম আর ট্রোলের খপ্পোর থেকে মুক্তি নেই কারোর। এই সব কিছুর জবাব এবার যেন এক উত্তরে দিলেন পরিচালক শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায় তাঁদের “গোত্র” ছবিতে। ধর্মে বিশ্বাস করেন ? ধর্ম মানে কি জানেন?

হোটেলে খেতে গিয়ে ফেসবুকে পোস্ট করেন নিশ্চয়ই, “জীবনে সত্যিকারের ভালোবাসা বিরিয়ানি”, বলছি আপনার ধম্মগুরু এটা জানেন? এসব বললে আবার মনুষ্যত্ব নিয়ে বড় বড় কথা শুনিয়ে দেন অনেকে। ফেসবুকে পোস্ট করেন নিশ্চয়ই, ‘ধম্ম আবার কি? মানবিকতার চেয়ে বড় ধম্ম নেই।’ এদের মধ্যে অধিকাংশ মানুষকে মানবিকতা কি? এই প্রশ্ন করলে উত্তর দিতে গিয়ে হয়তো বুঝবেনই না ওটা খায় না মাথায় দেয়! মুসলিম হওয়ার জন্য এখনও এই শহরে কাজ মেলে না, জোটে না থাকার জায়গা।

হিন্দুর মেয়ে মুসলিম ছেলেকে ভালোবাসলে এখনও তাদের বাঁকা দৃষ্টি সহ্য করতে হয় সমাজের।সোশ্যাল মিডিয়ায় অশ্লীল পোস্ট করে আত্মতৃপ্তি পান বহু মানুষ। সোজা ভাষায় বললে, এদেরকে সায়েস্তা করার জন্য মুক্তিদেবীর মতো একজন মানুষ এখন খুব জরুরি। না, শুধু নামেই নয় সমাজের কলুষতা থেকে মুক্তি পেতে এনার মতো প্রবীন মানুষকেই এগিয়ে আসতে হবে।

অভিনয়- নাইজেল আকারা, মানালি দে, অনুসূয়া মজুমদার, খরাজ মুখোপাধ্যায়, অম্বরীশ ভট্টাচার্য

পরিচালনা- নন্দিতা রায়, শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়

সময়- 2h 19min

ভাবুন তো, যে ঘরে মাছ মাংস আসে না, রাধাগোবিন্দের নিত্য সেবা হয়, সেই ঘরে, সেই মন্দিরে পা রাখছেন একজন মুসলিম ছেলে! হৈ হৈ পড়ে যাওয়ার মতো বিষয় তাই না? ছবির শুরুতে এভাবেই মুক্তি দেবীর বাড়িতে পা রাখে তারেখ আলি। ৯ বছর জেল খেটে রুজির টানে জেল থেকে তাকে গোবিন্দ ধামের মালকিন মুক্তিদেবীর কেয়ারটেকার হিসাবে নিযুক্ত করে দিয়ে যান মুক্তিদেবীর ছেলে অনির্বান। বাড়ির অন্যান্য পরিচারকদের সঙ্গে দিব্যি শুরু হয় তারেখ আলির কাজের জীবন।মুক্তিদেবীর কাছে তার কন্যাসম আশ্রিত ঝুমার সঙ্গে আলাপ হয় তারেখ আলির। দুষ্টু, ছটফটে স্বভাবের মেয়েটি কখন আপন করে নেয় তারেখ আলিকে। সম্পর্ক পরিনতি পেতেও সময় লাগেনি। এই সব কিছু ছাপিয়ে এই ছবিতে রয়েছে মা ও ছেলের নির্ভেজাল স্নেহের সম্পর্ক।

তারেখ আলি মুক্তিদেবীর মাতৃস্নেহে কিভাবে তারক হয়ে উঠল এ ছবি সেই গল্পই বলেছে। শহরে অসহায় দম্পতি খুনের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। বাড়ছে সিন্ডিকেট রাজ। এই আবহে দাঁড়িয়ে তারেখের চরিত্র বল ভরসা এনে দেবে শহরের প্রবীন নাগরিকদের যে বিশ্বাস আর আস্থা আজও পাওয়া যায়। এবার একটু ধম্মের কথা স্মরণ করাই? সেই গোবিন্দ ঠাকুরের জীবনী পড়েছেন? দেবকীর গর্ভজাত যখন যশোদার কোলে এসেছিলেন? মা যশোদা কি জানতেন তাঁর জাত, ধর্ম পিতৃ পরিচয়?

মহাভারতে কর্ণ সূর্যপুত্র থেকে কেন সারথি পুত্র হয়ে গিয়েছিলেন? সারথির কাছে পালিত হয়েছিলেন তাই তো? ধর্ম, জাতপাত কি তাহলে জন্মের পরিচয়পত্র হল? আপনি কি জানেন আজ সকালে যে ফুলে পুজো করেছেন সেই ফুলবাগানের মালি কে? যে ফল, মিষ্টি দেবতার থালায় সাজিয়ে দিয়েছেন সেগুলো যে তারেক আলির মতো ছেলেরা তৈরি করেনি কি করে জানলেন? কি করবেন এবার , ধম্ম-কম্ম সব গেল এবার তাই না? “গোত্র” ছবির প্রতিটি সংলাপ এভাবেই খোঁচা দিয়ে প্রশ্নের উত্তরগুলো জানতে চাইবে।

তাহলে ধর্ম নিয়ে এসব ছুঁত মার্গের কাদের প্রয়োজন বলুন তো? ঠিক ধরেছেন, অন্ধ মনুষ্যত্বের স্তোক বাক্য শুনিয়ে দেশকে দেউলিয়া করে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে যারা। সময় উপযোগে ধর্মকে ঢাল করে এরাই নখ দাঁত বের করে।

সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে “গোত্র” ছবিটি অত্যন্ত প্রসঙ্গিক একটি বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছে গোটা সমাজকে। মুখ্য চরিত্রে নাইজেল আকারা, মানালি দে-এর পাশাপাশি নিজেদেরকে প্রমান করতে মরিয়া চেষ্টা করে সফল হয়েছেন বাপির চরিত্র খরাজ মুখোপাধ্যায় এবং পুরোহিতের চরিত্রে অম্বরীশ ভট্টাচার্য। ছবির প্রথমার্ধ একটু দীর্ঘ মনে হলেও দ্বিতীয়ার্ধে খুব তাড়াতাড়ি যেন সময়টা কেটে যাবে।

অদিতি মুন্সির কন্ঠে শ্রী কৃষ্ণের অষ্টোত্তরো শতনাম, ওড়িশার লোকসঙ্গীত ‘রঙ্গবতী’ এবং ‘বৈষ্ণবজন সে’ ভজন ছবির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অভিনব সঙ্গীত। খুব ছিমছাম আয়োজনে পুরনো কলকাতার একটি দু মহলা বাড়ি গোবিন্দ ধামের মা ও ছেলের কাহিনীর কাছে একে একে ধ্বংস হয়ে যাবে সব ছুঁত মার্গ। ফুটে উঠবে বিদেশে থাকা ছেলে-মেয়ের অভিভাবকদের নিঃসঙ্গ জীবন কিভাবে বিপদ ওত পেতে বসে থাকছে। পাশাপাশি সংলাপের প্যাঁচে পড়ে কট্টরপন্থীদের পরিত্রাহী অবস্থা দেখতে হলে পৌঁছে যান সিনেমা হলে। দেখে আসুন, ধর্মের নামে ভাগাভাগি আর হানাহানির বিনাশকরে একই চালচ্চিত্রে কেমন মনুষ্যত্বের আরাধনা সম্ভব।