Date : 2019-09-19

“উমা এলো ঘরে”: শৈব,শাক্ত ও বৈষ্ণব, মিলে গিয়েছে তিন মত…

ওয়েব ডেস্ক: তব অচিন্ত্য রূপ-চরিত-মহিমা,

নব শোভা, নব ধ্যান রূপায়িত প্রতিমা,

বিকশিল জ্যোতি প্রীতি মঙ্গল বরণে।

তুমি সাধন ধন ব্রহ্ম বোধন সাধনে।।

২ .বনেদি বাড়ি- সাবর্ণ রায়চৌধুরী

সুরের ধ্বনিতে ছুঁয়ে যায় আগমনী। ধোঁয়াটে মেঘ জড়িয়ে রাখা আকাশে উঁকি দিচ্ছে সোনা রোদ। ঝকঝকে নিকোনো উঠোনে সাদা আলপনার কলকা এঁকে রেখেছে গৃহীনি। এলাকার মধ্যে সবচেয়ে বর্ধিষ্ণু গ্রাম বাড়িশা। গ্রামে দুর্গাপুজো শুরু করেছেন রায়চৌধুরী দম্পতি। লক্ষ্মীকান্ত রায়চৌধুরী এবং তাঁর স্ত্রী ভগবতী দেবী গ্রামের হিন্দু মুসলিম সব পরিবারকে সঙ্গে নিয়েই আনন্দ উৎসবে মেতে ওঠেন। বারো ভুঁইয়ার সময় যখন বাংলার রাজনীতির আকাশে নানা পটপরিবর্তন হচ্ছে, লক্ষ্মীকান্তের উত্থান সেই সময়। তখন কলকাতা এবং সংলগ্ন অঞ্চল ছিল যশোহরের মধ্যে। আর এই যশোর এস্টেটের দায়িত্বে ছিলেন বারো ভুঁইয়ার বসন্তরায় এবং বিক্রমাদিত্য।

বিক্রমাদিত্যর পুত্র প্রতাপাদিত্য এবং লক্ষীকান্ত, দু’জনেই ছিলেন অমায়িক, সদাহাস্যমুখ বসন্তরায়ের অত্যন্ত কাছের মানুষ। লক্ষ্মীকান্ত ছিলেন যশোর এস্টেটের মহামন্ত্রী। বিক্রমাদিত্য মারা যাওয়ার সময় পূর্ববঙ্গ, অর্থাৎ যশোহরের দিক পেলেন প্রতাপ, পশ্চিম দিক পেলেন বসন্তরায়। পিতার মৃত্যুর পর চরিত্রের আমূল পরিবর্তন ঘটল প্রতাপের। অত্যন্ত স্বৈরাচারী হয়ে উঠলেন তিনি। হত্যা করলেন পিতা সমান বসন্তরায়কে।এর কিছু দিনের মধ্যেই প্রতাপকে দমন করতে মানসিংহকে পাঠান আকবর। প্রতাপ পরাজিত হলে ১৬০৮-এ লক্ষ্মীকান্তকে হালিশহর থেকে আটটি পরগনার নিষ্কর জমিদারি স্বত্ত প্রদান করেন মানসিংহ। সেই সঙ্গে পান রায়চৌধুরী উপাধি।

এরপরেই রায়চৌধুরী উপাধি পান জমিদার লক্ষ্মীকান্ত। বাংলার ইতিহাস বলে বাঙালির দুর্গাপুজোর পত্তন হয় লক্ষ্মীকান্ত রায়চৌধুরীর হাত ধরেই। তবে গবেষকদের মধ্যে একাংশের মত, এর আগে তাহেরপুরে রাজা কংসনারায়ণের যে পুজোর বর্ণনা পাওয়া যায় তা নেহাতই অন্যরকম। দেবীকে শ্রী শ্রী চণ্ডী রূপে পূজা করা হত। পণ্ডিতরা বিধান দিলেন, দেবীর গায়ের রং হতে হবে স্বর্ণাভ বা শিউলি ফুলের বোঁটার মতো। শুধু তাই নয়, ১৬১০ সালে যাক বলে দেবীর সপরিবার, সবাহন স্বরূপ সেভাবেই রায়চৌধুরী পরিবারে পুজো শুরু হয়।কাঠের থামের উপর হোগলাপাতার ছাউনি দেওয়া আটচালা মণ্ডপে দেবী আরাধনা শুরু হয়।

পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয় ষোলোটি থামবিশিষ্ট একটি নাটমন্দির। সেই সব সোনালী দিনের বিশেষ কিছুই আর অবশিষ্ট নেই এখন। কিন্তু আজও দেবী শরতের সোনা রং গায়ে মেখে সাবর্ণ পরিবারে আসেন। তাঁর গাত্রবর্ণ হয় শিউলি ফুলের বোঁটার মতো। লাল বেনারসী আর নানা অলঙ্কার অঙ্গে ধারণ করেন তিনি। গণেশের গায়ের রং হয় লাল। অসুরের সবুজ। দেবীর এক দিকে থাকেন রঘুপতি, অন্য দিকে শিব। লক্ষ্মীকান্ত রায়চৌধুরীর আমল থেকেই এই পুজো তিনমতে হয়ে আসছে। শৈব, শাক্ত, বৈষ্ণব এই তিন মতেই আরাধনা করা হয়।

মূর্তির চালচিত্রে রাধাকৃষ্ণের সঙ্গে বিরাজ করে দশ মহাবিদ্যা। আটটি বাড়ির মধ্যে তিনটি বাড়িতে সিংহের মুখ থাকে ঘোড়ার মতো। বাকি বাড়িতে তন্ত্র মতে পুজো হয়। বড় বাড়ি এবং বিরাটি বাড়িতে নবমীর দিন হয় কুমারী পুজো। এ-ও হয় বৈষ্ণব মতে। আটচালা বাড়িতে ষষ্ঠীর তেরো দিন আগে থেকে দেবীকে আবাহন করা হয়। পাশেই রাধাগোবিন্দ মন্দিরে আছে বোধন ঘর। সেখানে দেবীর বোধন শুরু হয়। তিন বেলা ভোগ দেওয়া হয় এই সময় দেবীকে।

সকালে ফলমূল, দুপুরে অন্নভোগ আর রাতে লুচি। মহালয়ার পরের দিন বেদী করে সেখানে পঞ্চঘট বসানো হয়। পঞ্চমীর দিন ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বরে গণেশ ও শান্তির আরাধনা করা হয়। সপ্তমীর দিন যখন পুজো শুরু হয় তখন এই ঘট থেকে মাটি নিয়ে গিয়ে প্রতিমার সামনে মূল ঘটে নিয়ে গিয়ে বসানো হয়। আটচালাতে কৃষ্ণনবমী তিথিতে শুরু হয় কল্পারম্ভ। এরপর নানা আচার বিধি পালন করে চলতে থাকে প্রাচীন পুজো। অষ্টমী ও নবমী তিথিতে হয় বিশেষ পুজো।

১৮০টা খুড়িতে মাসকলাই এবং দই দিয়ে এই পুজো করা হয় অপদেবতা আর উপদেবতাদের সন্তুষ্ট করতে যাতে তারা পুজোয় কোনও বিঘ্ন ঘটাতে না পারে। আগে ছাগ ও মোষবলির প্রথা থাকলেও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সেই নিয়ম। আটটি বাড়ির মধ্যে শুধুমাত্র শাক্ত মতে পুজো হয় যে বাড়িগুলিতে সেখানেই হয় আমিষ ভোগ। অষ্টমীর দিন সন্ধিপুজো চলাকালীন, খিচুরি, ল্যাটামাছ আর কাঁচাকলা পোড়া দেওয়া হয়। নবমীর দিন রাতে রান্না করে রাখতে হয় খেসাড়ির ডাল, চালতার অম্বল, কচুশাক আর কইমাছ। দশমীর দিন সকালে ঠাকুরকে উৎসর্গ করা হয় এগুলি। রাতে লুচি করা হয়। এর সঙ্গে থাকে বেগুনভাজা, পটলভাজা, ছানার ডালনা।