Date : 2019-10-17

অন্তর্জালে আটকে রঙিন শৈশব, ‘পাবজি’ বাবাজীর দাপটে “ভো-কাট্টা” বিশ্বকর্মার ঘুড়ি….

ওয়েব ডেস্ক: রূপোলী পর্দার ওপারে ঘুড়ি হাতে বলিউডের হার্টথ্রাব সুপারস্টার সলমন খান আর ইন্ডিয়ান ব্লু আইড ওম্যান ঐশ্বর্য রাই। ব্যাকগ্রাউন্ডে কোটি টাকা বাজেটের সুপারহিট হিন্দি ছবির গান “ঢিল দে ঢিল দে দে রে ভাইয়া…”, রাজস্থানের পাথরের সুদৃশ্য প্রাসাদের ছাদে ঘুড়ি-লাটাই হাতে নেমে পড়েছে ‘হাম দিল দে চুকে সনম’ ছবির গোটা ইউনিট। অনেকেই ভাবছেন এতদিন পড়ে হঠাৎ তবে কি সলমন-ঐশ্বর্য ক্যামিস্ট্রির মিস্ট্রি নিয়ে পড়লাম! কিছু ছবি, কিছু জুটি, ঘটনা আজীবন চর্চিত থাকে, জড়িয়ে থাকে কিছু স্মৃতি আর নস্টালজিয়া। আচ্ছা, এটাতো সিনেমার দৃশ্যের কথা বললাম, আজ বিশ্বকর্মা পুজোর দুপুরে যারা তাদের সন্তানের পুজোর জামার কথা ভেবে কম্পিউটার মেশিনের সামনে কাজ করে চলেছেন, হ্যাঁ, তাদেরকেই ঘন্টা কয়েকের জন্য যদি স্কুল জীবনে ফিরিয়ে দেওয়া যেত….

টিক্কু, মামনি, রনিদের সঙ্গে কাদামাখা পায়ে ছুটে বেড়ানোর জন্য যদি একফালি সবুজ ঘাস আর শরতের আকাশ অপেক্ষা করত? কি? যেতেন তো, মাঞ্জা পাকাতে পাকাতে? দুহাতে ঘুড়ির কোণা ধরে উড়িয়ে দিতেন তো? সন্ধ্যে নামার আগে পাশের বাড়ির বাগানে কেটে পড়া ঘুড়ির খোঁজে দুদ্দাড় পায়ে যেতেন তো? ঠান্ডা অফিসের চার দেওয়ালের ওপারে কখন সন্ধ্যে নেমে আসে জানতেই পারেন না আমার আপনার মতো অনেকেই। কংক্রিটের ইমারতে চাপা পড়েছে শহরের আকাশ। শৈশব বন্দি মুঠোফোনে, দিনের শেষে নিওনবাতির আলোয় হিসেব মিলিয়ে নেওয়া। ফ্ল্যাট বাড়ির বন্ধ দরজার ওপারে আমি, তুমি আর ছোট্টো সোনার দু’পাতার গল্প।

পিছনে ফিরলে বুঝবেন খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, আমাদের মা-কাকিমাদের ভাতঘুম জড়ানো চোখে একটু পিঠ রাখার শান্তি ছিল না। ছাদ, কার্নিশ, পাঁচিলে পড়ে থাকতো তাদের মন। গোটা আকাশটা যেন রঙিন যুদ্ধক্ষেত্র। ছাদের এই প্রান্ত থেকেই ওই প্রান্ত মাঞ্জা সুতোর দখলে। গাড়ির মাথায় কলাপাতা, ফুলের মালা, পাড়ার মোড়ে মোড়ে ‘নাগিন ড্যান্স’, সবকিছুর মাঝে ধু ধু করছে আকাশটা। শান্ত হয়ে পড়ে আছে রঙিন ঘুড়ির ঝাঁক। বিশ্বকর্মা পুজোর আসল বৈশিষ্ট্য ‘ঘুড়ি’ যেন ক্রমশ বিলুপ্ত হচ্ছে। প্রতিবারের মতোই রঙ-বেরঙের ঘুড়ি সাজিয়ে বসেছেন শহর ও শহরতলির ব্যবসায়ীরা।

কিন্তু এবারের বিশ্বকর্মা পূজা যেন কিছুটা কম রঙিন। ঘুড়ি বিক্রেতাদের আক্ষেপ, পাবজির যুগে হারিয়ে যাচ্ছে ঘুড়ি-লাটাই। ‘ভোকাট্টা’র থেকে ভিডিয়ো গেমের ‘চিকেন ডিনারে’ই বেশি খুশি জেন-ওয়াই। গত কয়েক বছরে অনেকটাই কমেছে বিক্রি। আগের মতো আর বিশ্বকর্মা পুজোর দিন ঘুড়িতে ভরে ওঠে না আকাশ। তবে এখনও স্মার্টফোন গ্রাস করতে পারেনি সমাজের একাংশের শৈশবকে। পেটকাঠি, চাঁদিয়াল নিয়ে তাদের আগ্রহ কমেনি কিছুই। তবে পছন্দ বদলেছে খানিক। ট্রাডিশনাল ঘুড়িতে লেগেছে নতুনত্বের ছোঁয়া। সুতোর ক্ষেত্রে ক্রেতাদের প্রথম পছন্দ চিনা রেডিমেড নাইলন সুতো।

প্রায় প্রতিটি দোকানেই বিক্রি হচ্ছে রংবেরঙের ছোট ছোট রিল। নাইলনের এসব সুতো নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যে আগ্রহ বেশি। দামটাও অনেক কম। সরকারি বিধি-নিষেধের থুড়ি তোয়াক্কা। ঘুড়ির ক্ষেত্রেও তেমন, পেটকাঠি, চাঁদিয়ালের বদলে প্লাস্টিকের ঘুড়ির চাহিদা বেশি। সেই ঘুড়িতে নতুন ডিজাইন বেশ পছন্দ করছেন ক্রেতারা। ওয়াটার প্রুফ ফলে ঝির-ঝিরে বৃষ্টিতে নামিয়ে ফেলতে হবে না। কিন্তু ব্যবসায়ীদের ঠোঁটের কোণে তখনও হতাশার হাসি, সবই তো আছে, বিকেল কই? ছাদ কই? শহরের ৩০ তলার ইমারতে ছোট্টো সোনার আকাশ কই ? কে বা জানে? আর কদিন পর মোবাইল ফোনেই শিখে নেবে সে ঘুড়ি ওড়ানো!