Date : 2019-10-17

১৫০ বছরে ভারত কি ভুলেছে বাপু’র অহিংসা সত্যাগ্রহের পথ!….

ওয়েব ডেস্ক: গুজরাটি শব্দে ‘গান্ধী’ কথার অর্থ মুদি। তিনি নিজেই বলেছিলেন, ‘আমার পূর্বপুরুষরা মুদির দোকান চালাতেন।’ ইঙ্গ-মারাঠা দ্বন্দ্ব ক্রমশ বাড়তে থাকায় ইংরেজরা গুজরাতের একটি বৃহৎ অংশ মারাঠাদের থেকে কেড়ে নেয়। সেখানে ছোট ছোট করদ রাজ্য তৈরি হয়। পোরবন্দরের বেনিয়া বা ব্যবসায়ী পরিবারে গান্ধীজির জন্ম হয়। তাঁর তিনপুরুষ গুজরাতের করদ রাজ্যের কর্মকাণ্ডের দায়িত্বে নিযুক্ত ছিলেন। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী এই নামটি আসলেই অহিংসা, সত্যাগ্রহ শব্দগুলি উঠে আসে। দুঁদে রাজনীতিবিদ হিসাবে গান্ধীর অহিংসা ও সত্যাগ্রহ আন্দোলনের ভিত্তি কি আদৌ ঔপনিবেশিক শক্তিমুক্ত ভারত গড়তে সহায়ক ছিল নাকি, রক্তের বদলে রক্তের বদলাই সংগ্রামের প্রকৃত অর্থ বা পরাধীনতা থেকে মুক্তি লাভের উপায়? এত বছর পর সেই প্রশ্নে উত্তর খুঁজতে একবার ঘুরে আসা। সাম্প্রদায়িক অসহিষ্ণুতার বীজ বপন যখন ক্রমশ ফুটে উঠছে দেশের কোণায় কোণায় তখন পরম বৈষ্ণব হিসাবে পরিচয় দিয়ে আসা মহত্মা গান্ধীর দর্শন কি আদৌ প্রসঙ্গিক?

আজীবন ‘গীতা’ সারংশকে যিনি বাস্তব জীবনে পাথেয় করে চলতে চেয়েছেন, রাজনীতির অঙ্গনে সেই তত্ত্বের গুরুত্ব কি? যে গীতায় বিশ্বাস করে তিনি আজীবন বৈষ্ণবাচারে বিশ্বাসী ছিলেন ইতিহাস বলে সেই গীতার জন্মই যুদ্ধ ক্ষেত্রে। কথায় আছে সহিংস যুদ্ধই ক্ষত্রিয়ের স্বধর্ম, ঠিক একই ভাবে অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের ভিত্তি যখন স্বাধীনতা সংগরেমের মূল মন্ত্র হয়ে উঠেছিল তখন ভারত ছাড়ো আন্দোলনে কি আদৌ পালন হয়েছিল গান্ধীজির অহিংস, সত্যাগ্রহের নীতি। তবে গান্ধীজি কেন অহিংসায় বিশ্বাসী হয়ে উঠলেন?

গান্ধীজি আজীবন বিশ্বাস করতেন, প্রবল পরাক্রমশালী শত্রুকে পরাজিত করতে গেলে কখনও কখনও মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়। আর এই মিথ্যাচারের স্বভাব তাদের মজ্জাগত হয়ে যাবে। তাই অত্যাচারী শাসক পরাজিত করে যারা জয়লাভ করেন সেই স্বাধীনতা প্রাপ্ত দেশের নায়করাও মিথ্যাচারের পরম্পরা অবলম্বন করেন। সত্য নিয়ে অনুসন্ধান করতে গান্ধীজির এই মতের মধ্যেই যেন নিহিত ছিল আগামীদিনে ভারতের বৃহত্তর গণতান্ত্রিক রাজনীতির ভবিষ্যৎ। কোথাও কি সেই প্রশ্নই আসে না যে রাষ্ট্রযন্ত্রের শীর্ষে থাকা শাসকরা কখনও প্রয়োজন বা অপ্রয়োজনেই বোকা বানিয়ে থাকেন?

এবার আসা যাক অহিংসার কথায়। সত্যের পথ অনুসরণ করতে গেলে অহিংস হওয়ার প্রয়োজন। এই দুই শব্দ যেন পরস্পরের সঙ্গে আক্ষরিক অর্থে সম্পৃক্ত। অহিংসার প্রসঙ্গে ডঃ বি আর আম্বেদকর একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন, “গান্ধীজি রাজনীতিকে সাত্ত্বিক বানাতে চাইছেন।” আম্বেদকরের এই কথার মধ্যেই যেন নিহিত ছিল রাজনীতি কখনও কলুষ মুক্ত হতে পারে না। আম্বেদকর আরও বলেছিলেন, যদি অহিংসার প্রয়োগ তিনি রাজনীতিতেই করতে চেয়েছেন, তবে হিন্দু ধর্মের বর্ণাশ্রমের বিরুদ্ধেই বা কেন করেননি? ধর্ম সরাসরি সমাজ জীবনকে প্রভাবিত করে। আর সমাজ কখনও রাজনীতির থেকে আলাদা নয়। আম্বেদকরের সাফ প্রশ্ন ছিল রাজনীতিবিদ গান্ধীজির থেকে সাত্ত্বিক গান্ধীজি কেন কখনও ধর্মীয় জাতিপ্রথার বিরুদ্ধে লড়াই করেননি! সুতরাং গান্ধীজির অহিংসা নীতি সমালোচকদের চোখে এখনও স্ববিরোধী।

“মাই এক্সপেরিমেন্ট উইথ ট্রুথ” বইতে সত্যাগ্রহ ও অহিংস নীতির নিজের দৃষ্টিকোনের বিশ্লেষণ করেছেন মহত্মা।

মেধাবী ছাত্র হিসাবে শিক্ষকদের কাছে অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন তিনি। তবে বন্ধুর সংখ্যা কম ছিল তাঁর। স্বভাবেও বেশ লাজুক ছিলেন। মাত্র ১৩ বছর বয়সে বিয়ে হয়ে যায় তাঁর। বিবাহিত জীবনে কিশোর করমচাঁদ ছিলেন কড়া স্বভাবের। তবে পরবর্তীকালে আত্মজীবনীতে তিনি বারবার নিজের জীবনের দুর্বলতা ও স্ববিরোধীতার কথাগুলি তুলে ধরেন।

এই বইতে ধর্ম নিয়ে গান্ধীজির মত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেছেন, জীবনে চলার পথে কখনও যদি মনে হয় ঈশ্বর নেই, তবে জোর করে ধর্মকে আঁকড়ে থাকবেন না। বর্তমান সমাজে এই তত্ত্ব গান্ধীর জীবনে চরম উদারতার নীতির প্রকাশ করেছে।