Date : 2019-11-19

থেমে গেল ‘ভালো-বাসা’র কলম ….

ওয়েব ডেস্ক: শব্দের মিছিল যেখানে মিলিত হয় সেই ভাবসমুদ্রে একাকিত্বের অনুভুতি নেই। সৃষ্টি তখনই শ্রেষ্ঠ যখন স্রষ্টা স্বয়ংসম্পূর্ণ। দক্ষিণ কলকাতার ইঁট, কাঠ আর কংক্রিটের মিছিলের জঙ্গলকে চ্যালেঞ্জ করে যেন একটুকরো সবুজ দ্বীপে দাঁড়িয়ে আছে ‘ভালো-বাসা’। সমস্ত ব্যস্ত সময়ের ঘড়িগুলি যেন হরিয়ে গেছে শব্দের ছন্দে, তরঙ্গে। দিনরাত চলছে শব্দের বুনট। নরম রোদ্দুরে ক্রুশ কাঁটা বোনার মতো অক্ষরমালার বুনন হঠাৎ-ই যেন থেমে গিয়েছে সেখানে। অক্ষরমালার উষ্ণ আবেশের মধ্যেই শায়িত হয়েছেন প্রবাদপ্রতিম সাহিত্যিক নবনীতা দেবসেন। বৃহস্পতিবার সন্ধে সাড়ে সাতটা নাগাদ নিজের বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন লেখিকা। দুরারোগ্য ক্যান্সারে দীর্ঘদিন ধরেই আক্রান্ত ছিলেন, শরীর ক্ষয়েছে, ক্ষয় হয়নি কলমের। ডায়রির পাতায়, ল্যাপটপে ছোটগল্প, ভ্রমণ বিষয়ক রচনা, হাস্যকৌতুক, প্রবন্ধ সব মিলে তাঁর সাহিত্যের হেঁসেল প্রস্তুত হতো পঞ্চব্যঞ্জন।

একেকটি সৃষ্টি তাঁর শেলফে তুলে দিয়েছে “হারমণি সম্মান”, “সাহিত্য আকাদেমি সম্মান”, “কমলকুমারী জাতীয় পুরস্কার” এবং অবশ্যই ২০০০ সালে “পদ্মশ্রী” ছাড়াও অগণিত ছোট বড় পুরষ্কার। নিয়মিত সাদা পৃষ্ঠায় ছেপে গেছেন শব্দমালা। সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় একটি সংবাদপত্রে সাক্ষাৎকার দিয়ে বলেছেন, শরীরে দুরারোগ্য ব্যাধী বাসা বেঁধেছে তা জেনেও যখন যেখানে মন চাইত চলে যেতেন। অকুত ভয় মানুষটি আসলে মৃত্যুর মুখোমুখি হতেও ভয় পাননি কখনও। প্রবল প্রাণশক্তি সঞ্চয় করে রাখতেন নিজের মধ্যে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপনার কাজ করার পাশাপাশি একের পর এক ছন্দ বেঁধে গেছেন, কখনও বা ছুঁয়েছেন উপন্যাশের ব্যাপ্তি। উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের গণ্ডি পেরিয়ে পৌঁছে গেছিলেন হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ে। মাতৃভাষার টানেই ফিরে এসেছেন দেশে। বাবা-মা দুজনেই ছিলেন কবি, তাই শব্দের কোলে পিঠেই বড় হয়েছেন নবনীতা দেবসেন। বিবাহ করেছিলেন নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ্ অমর্ত্য সেনকে। অন্তরা আর নন্দনা দুই কন্যা সন্তানের মাতৃসুখও পেয়েছিলেন তিনি। ১৯৭৬ সালে তাঁর বিবাহ বিচ্ছেদ হয় অমর্ত্য সেনের সঙ্গে। কথায় আছে কবির কখনও বয়স হয় না, তবে জৈব শরীরে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাসা বেঁধেছিল অসুখ। বার্ধক্য ছুঁয়েছিল তাঁকেও। তাই থামিয়ে দিতে হয়েছে কলম ও শ্বাস-প্রশ্বাস।তাঁর মৃত্যুতে অমর্ত্য সেনের প্রতিক্রিয়া, “প্রতিক্রিয়া আর কী হতে পারে? সবাই যেমন মর্মাহত, আমিও। সেটা কেন হচ্ছে, তা তো বোঝা কঠিন নয়। আমি নিজে যেহেতু ওর কাছাকাছি বহুদিন ছিলাম, তাই আমার পক্ষে বড় কঠিন জিনিস…এ বিষয়ে আর বেশি কিছু আলোচনা করতে চাই না।” শুক্রবার বিকেলে লেখিকার শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে কেওড়াতলা মহাশ্মশানে। বৃহস্পতিবার নবনীতা দেবসেনের বাসভবনে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি কোন সংবাদ মাধ্যমকে। তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সহ বামফ্রন্ট নেতা বিমান বসু ও কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরী সহ রাজনৈতিক ব্যক্তিরা।