Date : 2020-01-18

নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলে কী আছে?

ওয়েব ডেস্ক : নাগরিকত্ব (সংশোধনী) বিল কী?

লোকসভায় নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল পাশ হয়েছে। ভারতীয় নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে ধর্মীয় বৈষম্যকে আইনি বৈধতা দেওয়ার প্রশ্নে ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইনে কিছু সংশোধনী আনা হয়েছে। পাকিস্তান, আফগানিস্তান এবং বাংলাদেশ থেকে যেসব হিন্দু, শিখ, পারসি, বৌদ্ধ এবং খ্রিস্টান এদেশে এসেছেন, বসবাস করছেন এবং যাদের কোনও বৈধ কাগজপত্র নেই, অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসাবে তাদের বিবেচনা করা হবে কি না, তার জন্যই এই নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল। বিলে বলা হয়েছে, ছয় বছরের মধ্যেই তাদের ফাস্ট ট্র্যাক সিটিজেনশিপ দেওয়া হবে। এত দিন, স্বতঃস্ফূর্ত নাগরিকত্ব লাভের জন্য ১২ বছর অপেক্ষা করতে হত। এই বিল আইনে পরিণত হলে আর অত বছর সময় লাগবে না। ছয় বছরের মধ্যেই পাকিস্তান, আফগানিস্তান এবং বাংলাদেশ থেকে আগত হিন্দু, শিখ, পারসি, বৌদ্ধ এবং খ্রিস্টানরা ভারতের নাগরিকত্ব পেয়ে যাবেন।

সরকারের যুক্তি কী?

সরকারের যুক্তি হল, দমন-পীড়ন এড়াতে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ থেকে এইসব সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ ভারতে পালিয়ে এসেছেন। তবে সেই যুক্তিতে ফাঁক রয়েছে। এই বিলে সব সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জায়গা হয়নি। শুধু তাই নয়, উপরোক্ত তিনটি দেশ ছাড়া অন্যান্য প্রতিবেশী দেশ থেকেও অনেক সংখ্যালঘু ভারতে পালিয়ে এসেছেন। তাঁরাও এই বিলে ঠাঁই পাননি। আহমেদিয়া মুসলমান সম্প্রদায়, এমনকী শিয়াপন্থী মুসলমানরাও পাকিস্তানে বৈষম্যের শিকার হন। প্রতিবেশী বর্মা অর্থাৎ মায়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমান ও হিন্দুরা নির্যাতনের শিকার। দক্ষিণের প্রতিবেশী দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কায় হিন্দু এবং তামিল খ্রিস্টানরা নির্যাতিত হন। তাঁরা এই বিলে জায়গা পাননি। এর উত্তরে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মুসলমানরা অন্য মুসলিম দেশে আশ্রয় নিতে পারেন। কিন্তু এর বাইরে আর কোনও প্রশ্নের জবাব তাদের কাছ থেকে মেলেনি।

এই বিল কি সংবিধানকেই চ্যালেঞ্জ করছে না?

বাস্তবে, নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল মুসলমান পরিচিতিকেই একটা বেড়াজালে ঘিরে দিয়েছে। বলেছে, এই সম্প্রদায় ছাড়া আর সব ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষই ভারতে আশ্রয় নিতে এলে আতিথেয়তা পাবেন। শরণার্থী হিসাবে অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতি অনুগ্রহ দেখিয়ে মুসলমানদের কার্যত এই বিল দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসাবে গণ্য করছে। সেদিক থেকে এই বিলে সংবিধানের ১৪ নং ধারা লঙ্ঘিত হয়েছে। ভারতীয় সংবিধানের ১৪ নং ধারায় সমস্ত মানুষের সমানাধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে। কোনও সংসদই সংবিধানের এই মূল কাঠামোয় বদল আনতে পারে না। তা সত্ত্বেও সরকার এই মতে অবিচল রয়েছে যে, তারা সমানাধিকারকে খর্ব করেনি, এই মৌলিক অধিকার ভঙ্গও করেনি।

ধর্মের ভিত্তিতেই তো দেশ ভাগ হয়েছিল?

সংসদে দাঁড়িয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন যে, কংগ্রেস যদি ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগ মেনে না নিত, তাহলে এই নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল আনার দরকারই হত না। যদিও ভারত ধর্মের ভিত্তিতে সৃষ্টি হয়নি। পাকিস্তান হয়েছিল। শুধুমাত্র মুসলিম লিগ এবং হিন্দু রাইট দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পৃথক হিন্দু ও মুসলমান রাষ্ট্র গঠনের জন্য ওকালতি করেছিল। ভারতের সব প্রতিষ্ঠাতাই একযোগে সেকুলার রাষ্ট্র গড়ার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন। যেখানে ধর্মনির্বিশেষে সমস্ত নাগরিক সমানাধিকার ভোগ করতে পারেন। যে কোনও দিক থেকেই নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের সমর্থনে পেশ করা যুক্তি পলকা হয়ে যাচ্ছে। কারণ দেশভাগের আগে আফগানিস্তান ভারতের অঙ্গ ছিল না।

উত্তর-পূর্ব ভারতের ক্ষেত্রে এই বিলের অবস্থান কি?

উত্তর-পূর্ব ভারতে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল নিয়ে প্রতিবাদ হওয়ায় এই অঞ্চলের একটা বড় অংশকে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের অন্তর্গত রাজ্য এবং ইনার লাইন পারমিট বন্দোবস্ত আওতাভুক্ত রাজ্যগুলিকে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের আওতায় রাখা হয়নি। এইসব অঞ্চলে কোনও ‘ঘোষিত ভিনদেশি’ ব্যক্তি ভারতীয় নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারবে না। সেই পুরুষ কিংবা মহিলা যদি বিলে উল্লেখিত ছয়টি ধর্মের প্রতিনিধিও হন তাও তাঁরা নাগরিকত্ব পাবেন না।