Date : 2022-12-09

“কদর তো সবাই করে, ভালোবাসার সাহস কতজনের আছে বলো?”

সোমদত্তা বসু, নিউজ ডেস্ক ঃ একটি বহুল প্রচলিত বাংলা সংবাদপত্রের সাপ্তাহিক ম্যাগাজিনের পাতায় চোখ রেখে বাঙালি সাবালক হয়ে উঠছিল। পাশাপাশি নির্মাণের মুন্সিয়ানায় বাংলা ছবিতে উঠে আসতে শুরু করেছিল এমন সব বিষয় যা বাংলা ভাষায় এর আগে কেউ কখনও ব্যাখ্যা বা উপস্থাপনা করেননি। নিষিদ্ধ ? নাকি রুচিহীন , অসামাজিক? এই নিয়ে তখন দ্বি-বিভক্ত বাঙলি। ‘হিরের আংটি’ ছবির কাজ শেষ করার পর মাত্র দুটো বছর। ‘উনিশে এপ্রিল’ মুক্তির পরেই জাতীয় সম্মান অর্জন করলেন পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষ। এরপর ১৯৯৭ সাল, শহরের আনাচে কানাচে দেখা গেল ‘দহন’ ছবির পোস্টার। রোজকার মধ্যবিত্ত জীবনে বাঙালি মেয়েদের লড়াই।চুপ করে মেনে নিতে শেখানো বাঙালি বাড়ির মেয়ে, বউদের সহজ পাঠ থেকে বের করে আনলেন পরিচালক। নায়ক-নায়িকার হিট জুটি নয়, লেখিকা সুচিত্রা ভট্টাচার্যের গল্পকেই ফোকাস করলেন ঋতুপর্ণ। ফের ঝুলিতে এলো জাতীয় পুরস্কার। এরপর ‘বাড়িওয়ালা’, ‘অসুখ’, ‘উৎসব’, ‘তিতলি’, একের পর এক ছবিতে প্রচলিত নিয়মে নাচ-গান আর গল্পের এক ঘেয়েমি থেকে বেরিয়ে এসেছেন ঋতুপর্ণ। তারপরেও থামেনি সমালোচনা। সমালোচকদের মতে, ‘উনিশে এপ্রিল’ ছবিটি ছিল বিদেশি ছবি ‘ওটাম সোনাটা’-র নকল। ইন্ডাস্ট্রির একাংশের কাছে ঋতুপর্ণ তখন ‘মেয়েলি’ স্বভাবের পুরুষ। উগ্র নারীবাদী আর জেন্ডার পিলিটিক্সের বাইরে আসতে পারছেন না পরিচালক, এই ছিল সমালোচকদের বক্তব্য।

না, এসব সমালোচনা থেকেও সরেছেন তিনি, নেমে আসেননি, বরং আরও একধাপ উপরে উঠেছেন। ফের তার ছবিতে চিন্তাধারার বদল। সাল ২০১২, রবীন্দ্রনাথের ‘চিত্রাঙ্গদা’ নৃত্যনাট্যের পটভূমিকার ‘সমকামীতা’ নিয়ে আরও দুঃসাহস। সমালোচনা সামলে অকপটে জবাব দিয়েছিলেন, ‘শিল্পের কোনও লিঙ্গ হয় না’।
‘কদর তো সবাই করে, ভালোবাসার সাহস কতজনের আছে বল?’ সিনেমার প্রতিটি সংলাপে তিনি শিখিয়েছেন, লিঙ্গ পরিচয় ছুঁড়ে ফেলতে গেলে কীভাবে সমাজের সঙ্গে লড়াই করতে হয়। সেই সময় সত্যিই হয়তো তাকে ভালোবাসার সাহস দেখিয়ে ওঠা সম্ভব ছিল না বাঙালির। কিন্তু জাতীয় বা আন্তর্জাতিক সম্মানের তালিকা থেকে তাকে বাদ রাখা সম্ভব হয়নি। তার মৃত্যু পর ৯টা বছর কেটে গেছে। তিনি যে ভাষায় বংলা ছবিতে কথা বলা শুরু করেছিলেন সেই ভাষা নিয়ে হয়তো বাঙালি আর চিন্তিত নয়, অথবা আইন পাশ হওয়ার পরেও ‘নিষিদ্ধ’ তকমা দিয়ে নীল ছবির দুনিয়ায় রেখে দিতে চায় সমকামীতাকেও। খোলামেলা যৌনতার উপরে এখনও সেন্সারের কাঁচি পড়ে। সে যতই হোক, তবুও ৯ টা বছর পর বাঙালি কিন্তু ঋতুপর্ণ ঘোষকে স্মরণ করে বলে, ‘বনমালি তুমি পর জনমে হইয়ো রাধা’।