Date : 2019-11-19

টোল থেকে ফেরার পথে শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু আসতেন এই কালী মন্দিরে….

নদীয়া: “ব্রহ্মাণ্ড ছিল না যখন/ মুণ্ডমালা কোথা পেলি/ সদানন্দময়ী কালী।” সাধক কমলাকান্ত ভাবে বিভোর হয়ে মাতৃবন্দনা করতে করতে এই লাইনটি রচনা করেন। এমন কৃষ্ণকায়, রুদ্র রূপেও মোহিত হয়েছেন বাংলার অসংখ্য সাধক। রচনা হয়েছে অসংখ্য শ্যামা সঙ্গীত। ভাবরস, প্রেমরস শব্দগুলির সঙ্গে কোথাও যেন লুকিয়ে আছে বৈষ্ণব সাধনার আস্বাদন। কিন্তু এও যে শক্তি সাধনার অঙ্গ হয়ে উঠতে পারে তা বাংলার মাতৃসাধকরা দেখিয়ে গেছেন সেই পথ। নদীয়া জেলার নবদ্বীপের নাম শুনলেই শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর নাম আসে।

বাংলার বৈষ্ণব আন্দোলন তথা ভক্তি আন্দোলনের পীঠস্থান নবদ্বীপ। সেখানেই আবার বাংলার প্রথম কালী পূজার সূচনা করেন মাতৃসাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ। ঠাকুর শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ দেব বলতেন, “যিনি শ্যাম তিনিই শ্যামা”। এই স্থান যেন তারই হাতে কলমে প্রমান। প্রায় সাড়ে ৬০০ বছর আগে গৌড়বঙ্গে ইসলামি মসনদে যখন বিরাজ করছিলেন হুসেন শাহ মহাপ্রভুর হাত ধরে একদিকে যেমন বৈষ্ণব ধর্মের ভক্তিযোগে ভেসে গিয়েছিলেন মানুষ।

অন্যদিকে শাক্ত উপাসকদের সাধনাও গুরুত্ব লাভ করেছিল। শৈব, শাক্ত ও বৈষ্ণব এই তিন মতের দ্বন্দ্ব রয়েছে বহুদিন ধরেই। অথচ সবই যেন মিলে মিশে এক হয়ে গিয়েছে আগমবাগীশের মাতৃ আরাধনার পদ্ধতির কাছে। নবদ্বীপের আগমেশ্বরী মন্দিরে গেলে দেখবেন মা কালীর আরাধনা হচ্ছে সম্পূর্ণ বৈষ্ণব মতে। মন্দিরে রয়েছে পঞ্চমুণ্ডুর আসন। তার উপরেই অধিষ্ঠিত হন মা আগমেশ্বরী। এখানে কোন ঘটস্থাপনা হয় না, হয়না পশু বলি, এমনকি পূজায় ব্যবহার হয় না সোমরস। কথিত আছে কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ প্রথম বাংলায় দক্ষিণাকালীর পূজোর প্রচলন করেন।

আরও পড়ুন : স্বপ্নে এখনও আসেন মা, কথা বলেন, স্বীকার করলেন পুরোহিত

পুজোর বৈশিষ্ট হল, আগে একদিনে মূর্তি তৈরি করে একদিনেই পুজো করে বিসর্জন দেওয়া হত। এখন এই কাজ করা প্রায় অসম্ভব। তাই কার্তিক মাসের কৃষ্ণা অমাবস্যা তিথিতে মায়ের ১৪ ফুট লম্বা মূর্তি তৈরি শুরু হয়, মূর্তিতে মুণ্ডু বসানো হয় চতুর্দশী তিথিতে, মায়ের চক্ষুদান হয় অমাবস্যা তিথিতে। পুজো শেষ হলেই হয় বিসর্জন। বৈষ্ণব মতে একাদশী শুদ্ধ ও পবিত্র তিথি মহাপ্রভু যখন টোল থেকে ফিরতেন তখন এখানেই প্রানাম করে যেতেন।

কিন্তু কেন এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করলেন সাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ? এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক অলৌকিক গাঁথা।

স্নান সেরে ফেরার পথে কৃষ্ণানন্দ একজন যুবতীকে দেখতে পান। তিনি নানা ছলে-বলে-কৌশলে কৃষ্ণানন্দকে মাতৃ আরাধনায় উদ্বুদ্ধ করতে থাকেন। শেষে কৃষ্ণানন্দকে স্বমূর্তি ধারণ করে আদেশ করেন মা কালী। এরপরেই এখানে প্রচলিত হয় এই পুজোর।