জলের তলায় দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিস্তীর্ণ এলাকা।

বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা : বঙ্গোপসাগরের উপর তৈরি হওয়া গভীর নিম্নচাপের জেরে গত দু’দিন ধরে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জুড়ে কার্যত দুর্যোগ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একটানা বৃষ্টিতে জেলার একাধিক নিচু এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। বারুইপুর, সোনারপুর, ক্যানিং, ডায়মন্ড হারবার, কাকদ্বীপ, সাগর, পাথরপ্রতিমা, গোসাবা-সহ বিস্তীর্ণ এলাকায় রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে বসতবাড়ি পর্যন্ত জলের তলায় চলে গিয়েছে। কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও আবার কোমরসমান জল। ফলে জলবন্দি হয়ে পড়েছেন বহু মানুষ। ব্যাহত হয়েছে যান চলাচল থেকে শুরু করে স্বাভাবিক জনজীবন।
বিশেষ করে বারুইপুর পুরসভার একাধিক ওয়ার্ডে পরিস্থিতি যথেষ্ট উদ্বেগজনক। টানা বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন রাস্তা, গলি, বাজার এলাকা এবং বসতবাড়ির সামনে জল জমে রয়েছে। কোথাও কোথাও সেই জল বাড়ির ভিতরেও ঢুকে পড়েছে। দীর্ঘক্ষণ জল জমে থাকায় তৈরি হয়েছে দুর্গন্ধ। নোংরা জল জমে থাকায় বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকিও। প্রয়োজনীয় কাজে বাড়ির বাইরে বেরোতে গিয়ে সমস্যায় পড়ছেন সাধারণ মানুষ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বর্ষা শুরুর আগে নিয়ম মেনে নিকাশি নালা পরিষ্কার করা হয়নি। ফলে নালাগুলি বুজে যাওয়ায় বৃষ্টির জল দ্রুত বেরোতে পারছে না। সামান্য বৃষ্টিতেই যে সমস্যা তৈরি হয়, গভীর নিম্নচাপের জেরে প্রবল বৃষ্টিতে সেই সমস্যা আরও ভয়াবহ আকার নিয়েছে। বাসিন্দাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে জল জমে থাকলেও জল নিষ্কাশনের জন্য পর্যাপ্ত পাম্পের ব্যবস্থা করা হয়নি। ফলে একই জায়গায় চার-পাঁচ দিন পর্যন্ত জল দাঁড়িয়ে থাকছে।
এলাকার বাসিন্দা সমীর মণ্ডল বলেন, “সারা বছরই আমাদের এই জলযন্ত্রণার মধ্যে থাকতে হয়। প্রতিবছর বর্ষার সময় এলাকা ডুবে যায়। তিন-চার দিন ধরে জল জমে থাকে। এটাই যেন আমাদের জীবনের অংশ হয়ে গিয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্থায়ী সমাধানের কোনও উদ্যোগ দেখা যায় না।”
অন্য এক বাসিন্দা রাইতা হালদার বলেন, “কাউন্সিলরের দেখা নেই, কোনও আধিকারিকেরও দেখা নেই। কল রয়েছে, কিন্তু জল নেই। বৃষ্টির কারণে পানীয় জলের কলও ডুবে গিয়েছে। ফলে পানীয় জল নিয়েও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।”
দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিভিন্ন এলাকায় গত দু’দিনে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত হয়েছে। সাগরদ্বীপে প্রায় ৩০ মিলিমিটার বৃষ্টির খবর পাওয়া গিয়েছে। ক্যানিং ও কাকদ্বীপে এক সেন্টিমিটার বা তার বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। জেলার অন্যান্য অংশেও বিক্ষিপ্তভাবে হালকা থেকে মাঝারি এবং কোথাও কোথাও ভারী বৃষ্টি হয়েছে। নিম্নচাপের প্রভাবে আরও বৃষ্টির আশঙ্কায় চিন্তায় রয়েছেন জেলার মানুষ।
তবে শুধু শহরাঞ্চল বা জনবসতিই নয়, গভীর নিম্নচাপের প্রভাব পড়েছে সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকাতেও। একটানা বৃষ্টির জেরে সুন্দরবনের একাধিক মাটির নদীবাঁধ থেকে মাটি ধুয়ে যেতে শুরু করেছে। কোথাও কোথাও বাঁধের গায়ে ক্ষয় দেখা দিয়েছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অমাবস্যার কোটাল। ফলে নদীর জলস্তর বেড়ে গেলে দুর্বল বাঁধের উপর চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।
নদীবাঁধ ভেঙে গেলে সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই বাঁধের পরিস্থিতির উপর বিশেষ নজরদারি শুরু করেছে প্রশাসন। ব্লক প্রশাসনের আধিকারিকদের প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। কোথাও বাঁধে ক্ষয় বা ধসের খবর পাওয়া গেলে দ্রুত মেরামতির ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, গভীর নিম্নচাপ এবং অমাবস্যার কোটালের প্রভাবে বঙ্গোপসাগর ও বিভিন্ন নদীতে জল উত্তাল হয়ে উঠেছে। সমুদ্রের পরিস্থিতি প্রতিকূল হওয়ায় মৎস্যজীবীদের জন্য সতর্কতা জারি করা হয়েছে। গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়ার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে মৎস্য দফতর। উপকূলবর্তী থানাগুলির পক্ষ থেকেও মাইকিং করে মৎস্যজীবীদের সতর্ক করা হচ্ছে।
শুধু স্থলপথে নয়, জলপথেও প্রচার চালানো হচ্ছে। নদী ও সমুদ্রের কাছাকাছি থাকা মৎস্যজীবী এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের আবহাওয়া পরিস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক করা হচ্ছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে যাতে কোনও মৎস্যজীবী গভীর সমুদ্রে না যান, সেই বিষয়ে বারবার সতর্কবার্তা দেওয়া হচ্ছে।
প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, জলমগ্ন এলাকাগুলিতে দ্রুত জল নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। বিভিন্ন জায়গায় জমা জল সরানোর কাজ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি নদীবাঁধগুলির উপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে সুন্দরবনের মাটির বাঁধগুলির পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছেন স্থানীয় প্রশাসনের আধিকারিকরা।
প্রবল বৃষ্টির কারণে যেসব মাটির বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেসব পরিবারের কাছেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রিপল পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির পাশে প্রশাসন দাঁড়াবে বলেও জানানো হয়েছে।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলাশাসক অভিষেক তিওয়ারি জানান, গভীর নিম্নচাপের প্রভাবে জেলাজুড়ে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে। টানা বৃষ্টির কারণে যেসব এলাকা জলমগ্ন হয়েছে, সেখান থেকে দ্রুত জল সরানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। নদীবাঁধগুলির উপর বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে। ব্লকের আধিকারিকদের প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রবল বৃষ্টিতে যেসব মাটির বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেইসব পরিবারের কাছে ত্রিপল পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতির উপর প্রশাসনের সর্বক্ষণ নজর রয়েছে।
সব মিলিয়ে গভীর নিম্নচাপ, টানা বৃষ্টি এবং অমাবস্যার কোটালের জেরে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিস্তীর্ণ এলাকায় তৈরি হয়েছে দুর্যোগের আশঙ্কা। একদিকে জলমগ্ন শহর ও গ্রাম, অন্যদিকে উত্তাল নদী-সমুদ্র এবং দুর্বল মাটির নদীবাঁধ—সব মিলিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। বিশেষ করে সুন্দরবন ও উপকূলবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের রাত কাটছে আতঙ্কের মধ্যে। আগামী কয়েক ঘণ্টায় বৃষ্টি ও নদীর জলস্তরের পরিস্থিতির উপরই এখন নজর প্রশাসন থেকে সাধারণ মানুষের।