গঙ্গাসাগরে কপিল মুনির আশ্রম রক্ষায় স্থায়ী কংক্রিটের বাঁধ নির্মাণে মেগা পরিকল্পনা, উদ্যোগী রাজ্য প্রশাসন।

বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা : বঙ্গোপসাগরের ভয়াবহ ভাঙনের হাত থেকে ঐতিহাসিক কপিল মুনির আশ্রমকে স্থায়ীভাবে রক্ষা করতে এবার বড়সড় পদক্ষেপ করল রাজ্য প্রশাসন। আইআইটি চেন্নাই এবং নেদারল্যান্ডসের বিশেষজ্ঞদের তৈরি বিশেষ বিশেষজ্ঞ রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে বিশেষ ‘বিচ নারিশমেন্ট’ স্কিম। ইতিমধ্যেই এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের অনুমোদন মিলেছে বলে জানিয়েছেন সাগর বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক সুমন্ত মণ্ডল। গঙ্গাসাগর মেলার ঠিক পরেই এই প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ ও স্থায়ী কাজ শুরু হবে বলে আশ্বাস দিয়েছে প্রশাসন। দীর্ঘদিন ধরেই গঙ্গাসাগরের উপকূলবর্তী এলাকায় সমুদ্রের আগ্রাসী রূপ ও বাঁধ ভাঙার সমস্যায় চরম উদ্বেগে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা ও পুণ্যার্থীরা। এই সমস্যার বৈজ্ঞানিক ও স্থায়ী সমাধানের জন্য আইআইটি চেন্নাই এবং নেদারল্যান্ডসের একটি বিশেষজ্ঞ দল এলাকার ভূ-প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করে একটি বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দেয়। সেই রিপোর্টের সুপারিশ মেনেই সমুদ্র সৈকত পুনর্গঠন ও বাঁধ নির্মাণের রূপরেখা প্রস্তুত করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে সাগর বিধানসভার বিধায়ক সুমন্ত মণ্ডল জানান, বর্তমানে এই প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় এস্টিমেট বা প্রাক্কলন তৈরির কাজ চলছে। এরপর সংশ্লিষ্ট সেচ দপ্তর এবং শিক্ষা বা অন্যান্য অনুমোদনকারী দপ্তরের ছাড়পত্র পাওয়ার পর দ্রুত টেন্ডার ও কাজের প্রক্রিয়া শুরু হবে। বর্তমান সরকারের ১০০ দিনের কার্যকালের মধ্যে বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের প্রস্তাব যাচাই, টেন্ডার এবং তা বাস্তবায়িত করার কাজ সুচারুভাবে এগোচ্ছে। একটু সময় লাগলেও গঙ্গাসাগরবাসীকে এই স্থায়ী স্বস্তি দিতে প্রশাসন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। সূত্রের খবর, কপিল মুনির আশ্রমের সামনে শুধুমাত্র কংক্রিটের বাঁধ দেওয়াই নয়, বরং সমুদ্রের তলদেশে পলি জমিয়ে বাঁধটিকে প্রাকৃতিকভাবে আরও শক্তিশালী করার জন্য বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় সমুদ্র সৈকতের বালিতে নিয়মিত পলি না জমার কারণে ভাঙন রোখা কঠিন হয়ে পড়ছে। এই সমস্যা দূর করতে কলকাতার কাছাকাছি এলাকা থেকে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে বিশেষ উন্নত মানের বালি নিয়ে আসার পরিকল্পনা করেছে কলকাতা পোর্ট ট্রাস্ট বা কেওপিটি কর্তৃপক্ষ। এই বিশেষ বালি আশ্রমের সামনের সমুদ্র বাঁধের নিচে ও নির্দিষ্ট সৈকত অংশে ফেলা হবে, যা প্রাকৃতিকভাবে পলি ধরে রাখতে সাহায্য করবে এবং বাঁধের আয়ু ও স্থায়িত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। গত কয়েক বছরের বিধ্বংসী সামুদ্রিক ভাঙনে কপিল মুনির আশ্রমের মূল চত্বর বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সমুদ্রের গর্ভে তলিয়ে গেছে একে একে তিনটি পুরোনো মন্দির। বর্তমানে যে মন্দিরটি দাঁড়িয়ে রয়েছে, তা এই ঐতিহাসিক স্থলের চতুর্থ সংস্করণ। বারবার যাতে এই পবিত্র তীর্থস্থানকে স্থানান্তরিত করতে না হয়, সেই কারণেই এবার আর কোনো অস্থায়ী জোড়াতালির কাজ না রেখে সরাসরি পার্মানেন্ট কংক্রিটের বাঁধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানের মেলা ও মুড়িগঙ্গা সেতু প্রকল্প রাজ্য সরকার গঙ্গাসাগর মেলাকে একটি আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন ক্ষেত্র ও মেলা হিসেবে গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ দেশি-বিদেশি পুণ্যার্থীর সমাগম ঘটে এই পুণ্যভূমিতে। কিন্তু প্রতিবার মেলার আগে সমুদ্রের বাঁধ ভেঙে যাওয়ার মতো বিপর্যয় ঘটলে প্রশাসনিক প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। তাই মেলাকে নির্বিঘ্ন করতে এই স্থায়ী সমাধান জরুরি ছিল।
এর পাশাপাশি, মুড়িগঙ্গা নদীর ওপর প্রস্তাবিত গঙ্গাসাগর সেতুর নির্মাণ কাজও দ্রুত এগিয়ে চলেছে। এই সেতু চালু হলে আগামী দিনে যাতায়াত ব্যবস্থার প্রভূত উন্নতি ঘটবে এবং পুণ্যার্থীদের যাতায়াত আরও সুগম হবে। প্রশাসনের এই যুগপৎ পদক্ষেপে একদিকে যেমন কপিল মুনির আশ্রমের ঐতিহ্য রক্ষা পাবে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পর্যটনের মানচিত্রে গঙ্গাসাগরের গৌরব আরও সুদৃঢ় হবে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক ও সচেতন মহল।