চাকরি খোয়ানোর হুমকি, সাগরে গ্রেফতার নির্বাহী সহকারী।

বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা : পঞ্চায়েত অফিসের ভিতরে এক মহিলা সাফাই কর্মীকে শ্লীলতাহানি, যৌন হেনস্থা এবং চাকরি থেকে বরখাস্ত করে দেওয়ার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে গ্রাম পঞ্চায়েতের এক নির্বাহী সহকারীর বিরুদ্ধে। লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে ইতিমধ্যেই অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে সাগর থানার পুলিশ। ধৃতের নাম রতন পুরকাইত (৫৭)। তিনি সংশ্লিষ্ট গ্রাম পঞ্চায়েতের এগজিকিউটিভ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাগর থানা এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, বুধবার দক্ষিণ ২৪ পরগনার সাগর থানায় স্থানীয় এক মহিলা লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে তিনি জানান, গত ২৭ জুলাই সকাল আনুমানিক সাড়ে ৮টা নাগাদ তিনি প্রতিদিনের মতো পঞ্চায়েত অফিসে সাফাইয়ের কাজ করছিলেন। সেই সময় অফিসের ভিতরে তাঁকে একা পেয়ে যান পঞ্চায়েতের নির্বাহী সহকারী রতন পুরকাইত। অভিযোগ, সুযোগ বুঝে ওই মহিলা কর্মীর সঙ্গে অশালীন আচরণ শুরু করেন অভিযুক্ত এবং পরে তাঁর শ্লীলতাহানি ও যৌন হেনস্থা করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
ওই মহিলা কর্মীর অভিযোগ, ঘটনার সময় তিনি তীব্র প্রতিবাদ করেন। কিন্তু তাঁর প্রতিবাদের পরেও পরিস্থিতি থামেনি বলে দাবি। বরং অভিযুক্ত তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে দেওয়ার হুমকি দেন বলে অভিযোগ। চাকরি হারানোর আশঙ্কায় এবং ঘটনার জেরে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন তিনি। পরবর্তী সময়ে সাহস সঞ্চয় করে বিষয়টি নিয়ে থানার দ্বারস্থ হন ওই মহিলা।
অভিযোগ পাওয়ার পরই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করে সাগর থানার পুলিশ। লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযুক্ত রতন পুরকাইতের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা বা BNS-এর ১২৬(২), ৬৪(২)(বি) এবং ৫০৬ ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। অভিযোগের প্রাথমিক তদন্তের পরই অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়।
সুন্দরবন পুলিশ জেলার পুলিশ সুপার বিশ্বচাঁদ ঠাকুর জানিয়েছেন, লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে সাগর থানায় মামলা রুজু করা হয়েছে এবং অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অভিযোগের সমস্ত দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত তথ্য, অভিযোগকারিণীর বক্তব্য এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে আরও জানা গিয়েছে, গ্রেফতার হওয়া রতন পুরকাইতকে বৃহস্পতিবার কাকদ্বীপ মহকুমা আদালতে পেশ করা হবে। ঘটনার তদন্তের স্বার্থে তাঁকে নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানাতে পারে পুলিশ। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী পরবর্তী তদন্ত প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে।
পঞ্চায়েত অফিসের মতো একটি সরকারি কর্মস্থলে মহিলা কর্মীর সঙ্গে এমন গুরুতর আচরণের অভিযোগ সামনে আসায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে কর্মস্থলে নিরাপত্তা নিয়ে। বিশেষ করে চুক্তিভিত্তিক বা নিচুতলার কর্মীদের উপর কোনও উচ্চপদস্থ বা দায়িত্বশীল ব্যক্তির প্রভাব খাটিয়ে তাঁদের ভয় দেখানো হচ্ছে কি না, সেই বিষয়টিও তদন্তে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
অভিযোগকারিণীর বক্তব্য অনুযায়ী, চাকরি থেকে বরখাস্ত করার হুমকি তাঁকে আরও চাপে ফেলে দেয়। কর্মসংস্থান হারানোর আশঙ্কায় অনেক সময় মহিলারা কর্মস্থলে হয়রানি বা নির্যাতনের অভিযোগ প্রকাশ্যে আনতে সাহস পান না। সেক্ষেত্রে এই ঘটনায় ওই মহিলা থানায় গিয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করায় তদন্তের পথ খুলেছে।
তবে পুলিশি তদন্ত এবং আদালতের বিচার প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্ত রতন পুরকাইতের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অভিযোগের সত্যতা, ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি এবং উভয় পক্ষের বক্তব্য তদন্তের পরই পরিষ্কার হবে। পুলিশও সেই লক্ষ্যেই তদন্ত চালাচ্ছে।
এই ঘটনায় পঞ্চায়েত প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। কর্মস্থলে মহিলাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কোনও ধরনের যৌন হয়রানি বা শ্লীলতাহানির অভিযোগ উঠলে দ্রুত ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি বলেই মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ।
ঘটনার পর সাগর এলাকায় ইতিমধ্যেই ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে সরকারি দফতরে কর্মরত মহিলা কর্মীদের নিরাপত্তা, তাঁদের সঙ্গে আচরণ এবং অভিযোগ জানানোর পরিবেশ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এখন আদালতে ধৃতের পেশ ও পুলিশি তদন্তের অগ্রগতির দিকেই নজর রয়েছে।