ঠাকুরান নদীর চর থেকে উদ্ধার সেই বাঘ ঠাকুরানি’র দেহ। ঝড়খালি পুনর্বাসন কেন্দ্রে পরপর দুই বাঘের মৃত্যু ঘিরে উদ্বেগ।

বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা : সুন্দরবনের জঙ্গল থেকে উদ্ধার করা আরও এক রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের মৃত্যু হল। দীর্ঘদিন চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের পর ঝড়খালি পুনর্বাসন কেন্দ্রে মৃত্যু হয়েছে ঠাকুরান নদীর চর থেকে উদ্ধার হওয়া স্ত্রী বাঘটির। বনকর্মীদের কাছে পরিচিত এই বাঘটির নাম ছিল ‘ঠাকুরানি’। তার মৃত্যুতে সুন্দরবন ও বন্যপ্রাণীপ্রেমীদের মধ্যে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।ঠাকুরান নদীর চড়ে অবস্থিত বনদপ্তরের চুলকাটি ক্যাম্প। ক্যাম্প সংলগ্ন এলাকায় রয়েছে মিষ্টি জলের একটি পুকুর। ক্যাম্পের টাওয়ার থেকে বনকর্মীরা নিয়মিত নজরদারি চালান জঙ্গল সংলগ্ন এলাকায়। বিশেষ করে জঙ্গলে যাতায়াতকারী মৎস্যজীবী ও মৌলেদের গতিবিধির উপরও রাখা হয় সতর্ক নজর।বনদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসের ২৪ তারিখের বেশ কয়েক দিন আগে ওই এলাকার জঙ্গলে একটি স্ত্রী বাঘকে বারবার এদিক-ওদিক ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। বাঘটির আচরণে কিছুটা অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করেন বনকর্মীরা। সন্দেহ হওয়ায় বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা শুরু হয়। দক্ষিণ ২৪ পরগনা বন বিভাগের আধিকারিকের নির্দেশে বাঘটিকে পর্যবেক্ষণের জন্য বনকর্মীদের একটি দল মোতায়েন করা হয়।এরপর শুরু হয় বাঘটিকে নিরাপদে উদ্ধারের পরিকল্পনা। অবশেষে ২৪ ডিসেম্বর ২০২৪ খাসির মাংসের টোপ ব্যবহার করে নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাঘটিকে খাঁচাবন্দি করতে সক্ষম হন রামগঙ্গা রেঞ্জের বনকর্মীরা।উদ্ধারের পর বাঘটিকে নিয়ে যাওয়া হয় আলিপুর চিড়িয়াখানায়। সেখানে পশু চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে বেশ কয়েক মাস ধরে তার চিকিৎসা চলে। দীর্ঘ চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের পর বাঘটিকে নিয়ে যাওয়া হয় ঝড়খালি পুনর্বাসন কেন্দ্রে। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে তার পরিচর্যা চলছিল।সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রায় দুই বছর হতে চলেছিল ঝড়খালি পুনর্বাসন কেন্দ্রে তার অবস্থানের। বনকর্মীদের নজরদারি ও পরিচর্যার মধ্যেই দিন কাটছিল ‘ঠাকুরানি’র। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই বাঘটিকেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে দেখলেন বনকর্মীরা।ঠাকুরানি’র মৃত্যু ফের একাধিক প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে। সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণ, উদ্ধার হওয়া বাঘের চিকিৎসা এবং পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলিতে তাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা—সবকিছু নিয়েই নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।স্থানীয় সূত্রে ও বনকর্মীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবন এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে মোট তিনটি বাঘের মৃত্যুর ঘটনা সামনে এসেছে। এর মধ্যে দুটি বাঘের মৃত্যু হয়েছে ঝড়খালি পুনর্বাসন কেন্দ্রে। ফলে একের পর এক বাঘের মৃত্যু ঘিরে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বন্যপ্রাণীপ্রেমীদের মধ্যে।তবে বাঘের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী, তা জানতে পশু চিকিৎসকদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বনদপ্তরের আনুষ্ঠানিক রিপোর্টই গুরুত্বপূর্ণ। ময়নাতদন্ত ও চিকিৎসা সংক্রান্ত পরীক্ষার রিপোর্ট সামনে এলেই মৃত্যুর সঠিক কারণ স্পষ্ট হতে পারে।সুন্দরবনের বাঘ শুধু এই অরণ্যের গর্ব নয়, গোটা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্রের প্রতীক। তাই একটি বাঘের মৃত্যু মানেই শুধু একটি প্রাণের চলে যাওয়া নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সুন্দরবনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার বড় প্রশ্ন। ‘ঠাকুরানি’র মৃত্যু সেই প্রশ্নই আরও একবার সামনে এনে দিল।