বিশিষ্ট শিক্ষক মৃত্যুঞ্জয় মণ্ডলের গাড়ি আটকানোর অভিযোগ উঠেছে বিজেপি নেত্রী অন্তরা সাহা চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে।

শ্যাম বিশ্বাস, নিজস্ব সংবাদদাতা : শিক্ষককে মাঝরাস্তায় গাড়ি থামিয়ে হেনস্থা করার অভিযোগ। অভিযোগ উঠল এক বিজেপি নেত্রীর বিরুদ্ধে। ব্যক্তিগত কাজ সেরে বাড়ি ফেরার পথে উত্তর ২৪ পরগনা জেলা পরিষদের পরিষদীয় দলনেতা তথা বিশিষ্ট শিক্ষক মৃত্যুঞ্জয় মণ্ডলের গাড়ি আটকানোর অভিযোগ উঠেছে বিজেপি নেত্রী অন্তরা সাহা চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে। শুধু গাড়ি আটকানোই নয়, তাঁকে মারতে উদ্যত হওয়া, গাড়ির কাচে ধাক্কা দেওয়া, ভাঙচুরের হুমকি, এমনকি গাড়ির ভিতরে তল্লাশি চালানোরও অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার একটি ভিডিয়ো ইতিমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে বলে দাবি। কিন্তু কেন মাঝরাস্তায় এক শিক্ষকের গাড়ি আটকানো হল? কী নিয়ে এত উত্তেজনা? আর এই ঘটনায় বিজেপির অন্দরেই বা কী বলছে?
অভিযোগ অনুযায়ী, বুধবার সন্ধ্যায় ব্যক্তিগত কাজ সেরে বাড়ি ফিরছিলেন মৃত্যুঞ্জয় মণ্ডল। গোপালপুরের কেন্দুয়া ব্রিজের কাছে তাঁর এক পুরনো বন্ধুর সঙ্গে কথা বলার জন্য গাড়ি থামান তিনি। সেই সময় আচমকাই সেখানে পৌঁছন বিজেপি নেত্রী অন্তরা সাহা চক্রবর্তী। অভিযোগ, তিনি মৃত্যুঞ্জয় মণ্ডলের গাড়ি আটকে দেন। এরপর শুরু হয় বচসা। আর সেই বচসার মধ্যেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ।
মৃত্যুঞ্জয় মণ্ডলের অভিযোগ, তাঁকে গাড়ির ভিতরে আটকে রেখে হেনস্থা করা হয়। এমনকি তাঁকে মারতে উদ্যত হওয়ার অভিযোগও উঠেছে। গাড়ি ভেঙে ফেলার হুমকি দেওয়া হয় বলেও দাবি। অভিযোগ আরও গুরুতর হয় যখন বলা হচ্ছে, তাঁর গাড়ির কাচে ধাক্কা দেওয়া হয় এবং তাঁর চশমা খুলে নেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, তাঁর গাড়ি দাঁড় করিয়ে ভিতরে তল্লাশিও চালানো হয় বলে অভিযোগ। ঘটনার সময় মৃত্যুঞ্জয় মণ্ডলের সঙ্গে তাঁর দেহরক্ষীও ছিলেন। তিনি রাজ্য পুলিশের কর্মী বলে জানা গিয়েছে। অভিযোগ, তাঁকেও হেনস্থার মুখে পড়তে হয়।
এই ঘটনার একটি ভিডিয়ো সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিয়োয় কয়েকজনকে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ে জড়িয়ে পড়তে দেখা যাচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে। ঘটনাটি ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে চাপানউতোর। তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিয়োটির সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট বা সত্যতা স্বাধীন ভাবে যাচাই করা হয়নি। ফলে ভিডিয়োয় ঠিক কী কারণে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়েছিল, তা নিয়ে এখনও প্রশ্ন রয়েছে। তবে অভিযোগের গুরুত্ব নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কারণ অভিযোগ উঠেছে একজন জনপ্রতিনিধি তথা শিক্ষকের গাড়ি আটকে তাঁকে হেনস্থা করার।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিজেপির অন্দরেও শুরু হয়েছে বিতর্ক। বসিরহাট সাংগঠনিক জেলা বিজেপির সহ-সভাপতি রাজেন্দ্র সাহা সরাসরি দলের নেত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, ৪ তারিখের পর যারা বিজেপিতে এসেছেন, তাঁদের মধ্যেই কেউ কেউ এ ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছেন। অর্থাৎ, তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে দলবদল করে বিজেপিতে আসা নেতাকর্মীদের প্রসঙ্গ। এই মন্তব্যের পর স্বাভাবিকভাবেই আরও জোরালো হয়েছে রাজনৈতিক তরজা। তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ মানতে নারাজ অন্তরা সাহা চক্রবর্তী। বরং তিনি পাল্টা অভিযোগ তুলেছেন বিজেপির জেলা সহ-সভাপতি রাজেন্দ্র সাহার বিরুদ্ধেই। অন্তরা সাহা চক্রবর্তীর দাবি, রাজেন্দ্র সাহার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তাঁরা আগেই জানিয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে তোলাবাজির অভিযোগও রয়েছে বলে দাবি বিজেপি নেত্রীর। কিন্তু সেই অভিযোগের পরও কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেই পাল্টা দাবি তাঁর। অর্থাৎ, একটি গাড়ি আটকানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখন বিজেপির দুই পক্ষের মধ্যে শুরু হয়েছে সরাসরি অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- এই ঘটনাটি কি শুধুই ব্যক্তিগত বিবাদ? নাকি এর পিছনে রয়েছে রাজনৈতিক বিরোধ? মৃত্যুঞ্জয় মণ্ডল উত্তর ২৪ পরগনা জেলা পরিষদের পরিষদীয় দলনেতা। অন্যদিকে, অভিযুক্ত অন্তরা সাহা চক্রবর্তী বিজেপির নেত্রী। ফলে ঘটনাটি স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক রং পেয়েছে। এক পক্ষের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয়ের জোরেই একজন শিক্ষককে হেনস্থা করা হয়েছে। অন্য পক্ষের পাল্টা বক্তব্য, ঘটনার পিছনে অন্য কারণ রয়েছে এবং তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তদন্ত হলে এই সংঘাতের আসল কারণ আরও পরিষ্কার হতে পারে।
ঘটনার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, একজন শিক্ষকের গাড়ি শুধু থামানোই হয়নি, গাড়ির ভিতরে তল্লাশিও চালানো হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে- কোন অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁর গাড়িতে তল্লাশি চালানো হয়েছিল? তাঁর সঙ্গে থাকা দেহরক্ষীকে কেন হেনস্থা করা হল? এবং মাঝরাস্তায় একজন জনপ্রতিনিধির গাড়ি আটকানোর অধিকারই বা কে দিল? এই প্রশ্নগুলির উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়। একদিকে শিক্ষক মৃত্যুঞ্জয় মণ্ডলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন। অন্যদিকে বিজেপি নেত্রী অন্তরা সাহা চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে হেনস্থার অভিযোগ। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিজেপির অন্দরেই একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ। ফলে একটি রাস্তার ঘটনাই এখন বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠছে। বিজেপির এক নেতা বলছেন, নতুন করে দলে আসা কিছু নেতানেত্রীর জন্য দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে অভিযুক্ত নেত্রী বলছেন, তাঁর বিরুদ্ধেই নয়, যাঁরা অভিযোগ তুলছেন তাঁদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল- রাজনীতি যে দলেরই হোক, একজন শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি বা সাধারণ নাগরিকের সঙ্গে প্রকাশ্য রাস্তায় আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। কেউ যদি কোনও অন্যায় করে থাকেন, তার তদন্ত করার জন্য প্রশাসন রয়েছে, পুলিশ রয়েছে, আইন রয়েছে। রাস্তার উপর গাড়ি আটকে হেনস্থা করার অভিযোগের সত্যতা তদন্তেই সামনে আসা প্রয়োজন। আর এই ঘটনায় যদি সত্যিই কারও বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ মেলে, তাহলে দল-মত নির্বিশেষে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।