নদীগর্ভে ১০০ মিটারের বেশি অংশ—আতঙ্কে বাসিন্দারা।

বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা: টানা বৃষ্টির জেরে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিস্তীর্ণ এলাকায় যখন জলমগ্ন পরিস্থিতি, ঠিক তখনই ডায়মন্ড হারবারে হুগলি নদীর বাঁধে বড়সড় ধস নামায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়াল। ১১৭ নম্বর জাতীয় সড়কের পাশে হুগলি নদী সংলগ্ন বাঁধের ১০০ মিটারেরও বেশি অংশ ভেঙে নদীগর্ভে তলিয়ে গিয়েছে বলে জানা গিয়েছে। জাতীয় সড়কের একেবারে পাশেই নদীবাঁধের এই বিপর্যয় ঘটায় স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি প্রশাসনের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গত কয়েকদিন ধরে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জুড়ে চলছে টানা বৃষ্টি। বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া নিম্নচাপের প্রভাবে জেলার বিভিন্ন প্রান্তে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হয়েছে। এর জেরে একদিকে যেমন নিচু এলাকা জলমগ্ন হয়েছে, তেমনই নদী ও খালের জলস্তরও বেড়েছে। সেই পরিস্থিতির মধ্যেই ডায়মন্ড হারবারে নদীবাঁধের বড় অংশে ধস নামার ঘটনা সামনে আসে।
স্থানীয়দের দাবি, অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে বাঁধের মাটি ক্রমশ নরম ও আলগা হয়ে যায়। তার উপর নদীর জলস্তর বৃদ্ধি এবং জলের স্রোতের চাপ থাকায় বাঁধের দুর্বল অংশে ধস নামে। মুহূর্তের মধ্যে বাঁধের বিস্তীর্ণ অংশ ভেঙে নদীর জলে তলিয়ে যায়। যদিও ঠিক কী কারণে এতটা অংশ ভেঙে পড়ল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় আতঙ্ক তৈরি হয়। কারণ, ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধের একদিকে হুগলি নদী, অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ ১১৭ নম্বর জাতীয় সড়ক এবং জনবসতি। বাঁধের আরও অংশ ভেঙে পড়লে নদীর জল লোকালয়ে ঢুকে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন। একইসঙ্গে জাতীয় সড়কের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ঘটনার খবর পেয়ে প্রশাসনের আধিকারিকরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছন। ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পরিদর্শন করে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা হয়। বাঁধের কোন অংশ কতটা দুর্বল হয়ে পড়েছে, আরও কোথাও ধসের সম্ভাবনা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে নজরদারি শুরু হয়েছে। পরিস্থিতি যাতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায়, তার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা অরতি মুখার্জি বলেন, ‘‘অতিবৃষ্টির কারণে হুগলি নদীর পাড়ে ১১৭ নম্বর জাতীয় সড়কের কাছে ধস নেমেছে। বাঁধের বড় অংশ ভেঙে পড়ায় আমরা আতঙ্কে রয়েছি। নদীর জল যদি আরও বাড়ে, তাহলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে।’’
ডায়মন্ড হারবারের বিজেপি নেতা দীপক হালদারও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর দাবি, শুধু ডায়মন্ড হারবার নয়, দক্ষিণ ২৪ পরগনার উপকূলবর্তী একাধিক এলাকাতেই নদীবাঁধ দুর্বল হয়ে পড়েছে। দ্রুত বাঁধ মেরামতির পাশাপাশি যেসব এলাকায় ধসের আশঙ্কা রয়েছে, সেখানে আগাম ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
ডায়মন্ড হারবারের পাশাপাশি দক্ষিণ ২৪ পরগনার অন্যান্য উপকূলবর্তী এলাকাতেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। গঙ্গাসাগরের ধবলা হাট, লালপুর-সহ নামখানার একাধিক এলাকায় নদীবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গিয়েছে। রায়চকেও নদীবাঁধে ধস নেমেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে। বেশ কিছু জায়গায় বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে নোনা জল লোকালয়ে ঢুকতে শুরু করেছে বলে অভিযোগ।
নদীর নোনা জল ঢুকে পড়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়েছে। বিশেষ করে নদীর তীরবর্তী নিচু এলাকাগুলিতে বসবাসকারী মানুষজন ঘরবাড়ি এবং চাষের জমি নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। বৃষ্টির পরিমাণ আরও বাড়লে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা তাঁদের।
গঙ্গাসাগরে পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইতিমধ্যেই প্রশাসনের তরফে বেশ কিছু পরিবারকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। অতিবৃষ্টির কারণে গঙ্গাসাগরের ২২টি পরিবারকে ত্রাণশিবিরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। সেখানে তাঁদের থাকা ও খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পরিস্থিতির দিকে নজর রেখে প্রয়োজন হলে আরও মানুষকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হতে পারে।
এদিকে নদীবাঁধ ভেঙে যাওয়ার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। বাঁধের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দ্রুত মেরামত না হলে পরবর্তী জোয়ারে নদীর জল ঢুকে পড়তে পারে। বিশেষ করে হুগলি নদীতে জোয়ারের সময় জলের চাপ বাড়লে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ আরও ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে নদীবাঁধের পরিস্থিতির উপর বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে। বিপজ্জনক অংশগুলিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ দ্রুত মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। জাতীয় সড়কের পাশের অংশ হওয়ায় গোটা বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
একদিকে লাগাতার বৃষ্টি, অন্যদিকে নদীর জলস্তর বৃদ্ধি এবং একের পর এক নদীবাঁধে ধস—সব মিলিয়ে দক্ষিণ ২৪ পরগনার উপকূলবর্তী এলাকায় দুর্যোগের পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হচ্ছে। ডায়মন্ড হারবারে ১০০ মিটারের বেশি বাঁধ নদীগর্ভে চলে যাওয়ার ঘটনা সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আপাতত প্রশাসনের নজর ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধের দিকে। আগামী কয়েক ঘণ্টায় বৃষ্টি ও নদীর জলস্তরের পরিস্থিতির উপরই নির্ভর করছে এলাকার পরবর্তী পরিস্থিতি।