তৃণমূল নেতার বাড়িতে বিস্ফোরণ ঘিরে রহস্য!

চার দিন পর ঘটনাস্থলে ফরেনসিক, সংগ্রহ নমুনা

বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা : গভীর রাতের বিকট শব্দে কেঁপে উঠেছিল গোটা এলাকা। আগুনের লেলিহান শিখা দেখে আতঙ্কে ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বিস্ফোরণের অভিঘাতে বাড়ির দরজার শাটার ছিটকে পড়েছিল প্রায় ১০০ মিটার দূরে। প্রাথমিকভাবে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের অনুমান করা হলেও ঘটনার চার দিন পর ঘটনাস্থলে ফরেনসিক টিম পৌঁছনোয় নতুন করে তৈরি হয়েছে প্রশ্ন।
বারুইপুর পূর্বের উত্তরভাগ কলোনি এলাকায় তৃণমূল নেতা দ্বিজেন মণ্ডলের বাড়িতে বিস্ফোরণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। সোমবার ঘটনাস্থলে পৌঁছয় ফরেনসিক ল্যাবরেটরির তিন সদস্যের একটি দল। বিস্ফোরণস্থল ঘুরে দেখার পাশাপাশি বাড়ির ক্ষতিগ্রস্ত অংশ এবং আশপাশের এলাকা থেকে বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করেন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা। বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করতেই এই পরীক্ষা বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে।
ঘটনাটি ঘটেছে বারুইপুর পূর্বের উত্তরভাগ কলোনির রামনগর-২ নম্বর এলাকায়। ১৪০ নম্বর বুথের লালপুল সংলগ্ন এলাকায় রয়েছে দ্বিজেন মণ্ডলের দোতলা বাড়ি। স্থানীয়দের দাবি, গভীর রাতে আচমকাই ওই বাড়িতে প্রবল বিস্ফোরণ ঘটে। রাত তখন আনুমানিক দুটো। আচমকা বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে আশপাশের বাড়িঘর। ঘুম ভেঙে আতঙ্কে বাইরে বেরিয়ে আসেন বাসিন্দারা। বাইরে বেরিয়ে তাঁদের নজরে পড়ে, বাড়ির ভিতরে আগুন জ্বলছে।
বিস্ফোরণের তীব্রতা নিয়ে এখনও এলাকায় চর্চা চলছে। স্থানীয়দের দাবি, বিস্ফোরণের অভিঘাতে বাড়ির দরজার শাটার খুলে গিয়ে প্রায় ১০০ মিটার দূরে ছিটকে পড়ে। বাড়ির বেশ কিছু অংশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মুহূর্তের মধ্যে এলাকায় আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়। খবর দেওয়া হয় দমকল বিভাগে। রাতেই একটি দমকলের ইঞ্জিন ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে। পরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।
ঘটনার খবর পেয়ে পরদিন সকালে ঘটনাস্থলে পৌঁছন বারুইপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অতীশ বিশ্বাস এবং বারুইপুর থানার আইসি-সহ পুলিশ আধিকারিকরা। তাঁরা বিস্ফোরণস্থল পরিদর্শন করেন। ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি খতিয়ে দেখার পাশাপাশি শুরু হয় প্রাথমিক তদন্ত।
পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, গ্যাস সিলিন্ডার ফেটে বিস্ফোরণ ঘটে থাকতে পারে। তবে বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে ফরেনসিক পরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা। সেই কারণেই ঘটনার চার দিন পর ঘটনাস্থলে পৌঁছয় তিন সদস্যের ফরেনসিক দল।
ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা বিস্ফোরণের সম্ভাব্য কেন্দ্রস্থল খুঁটিয়ে পরীক্ষা করেন। বাড়ির ভাঙা অংশ, ধ্বংসাবশেষ এবং বিস্ফোরণের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন সামগ্রী থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। কী ধরনের বিস্ফোরণ ঘটেছে, তার উৎস কোথায় এবং আগুন লাগার প্রকৃত কারণ কী—ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে সেই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে। তদন্তকারীদের আশা, নমুনা পরীক্ষার রিপোর্ট হাতে এলে ঘটনাটি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
তবে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোরও শুরু হয়েছে। বারুইপুর ২ নম্বর মণ্ডলের বিজেপি সভাপতি দীপঙ্কর কর্মকারের দাবি, দ্বিজেন মণ্ডল ওই এলাকার তৃণমূল নেতা। তাঁর অভিযোগ, রামনগর ২ নম্বর এলাকার ১৪০ নম্বর বুথের বিজেপি কার্যকর্তাদের উপর অতীতে নানা ধরনের অত্যাচার করা হয়েছে। এমনকি তাঁকেও ঘরছাড়া থাকতে হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
দীপঙ্কর কর্মকারের আরও দাবি, ৪ তারিখে ভোটের ফল প্রকাশের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। তাঁর অভিযোগ, সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই দ্বিজেন মণ্ডল এলাকা ছেড়ে পলাতক ছিলেন। যদিও বিজেপি নেতার করা এই অভিযোগগুলির স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে, বিস্ফোরণের সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধের কোনও যোগসূত্র রয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনও পুলিশের তরফে কোনও নিশ্চিত তথ্য সামনে আসেনি। প্রাথমিকভাবে সিলিন্ডার বিস্ফোরণের সম্ভাবনার কথা বলা হলেও তদন্তকারীরা অন্য কোনও সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছেন।
চার দিন পর ঘটনাস্থলে ফরেনসিক দলের উপস্থিতি তাই তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে। রাতের অন্ধকারে ঠিক কীভাবে বিস্ফোরণ ঘটল, কেন তার অভিঘাত এতটা তীব্র হল এবং আগুন লাগার প্রকৃত কারণই বা কী—এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর এখন খুঁজছে পুলিশ। ফরেনসিক রিপোর্ট হাতে আসার পরই ঘটনার আসল কারণ সম্পর্কে পরিষ্কার ছবি পাওয়া যেতে পারে। আপাতত বারুইপুর থানার তদন্তের পাশাপাশি ফরেনসিক রিপোর্টের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে উত্তরভাগের বাসিন্দারা।