নামি রেস্তোরাঁয় মিলছে পচা খাবার!

মালদহ শহরের মনস্কামনা রোড এলাকার এই নামী রেস্তোরাঁর রান্নাঘরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও পচা-বাসি খাবার মেলায় তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।

বিশ্বজিৎ মণ্ডল, নিজস্ব সংবাদদাতা : বেশ কিছু বছর আগে একটা খবর সংবাদ শিরোনামে জায়গা করে নিয়েছিল। ভাগাড় কাণ্ড। ২০১৮ সালে রাজ্যে প্রকাশ্যে আসা পচা ও মৃত পশুর মাংসের অবৈধ কারবারই ভাগাড় কাণ্ড নামে পরিচিত। রাজ্যের শহর থেকে জেলার নামিদামি রেস্টুরেন্টের নাম জড়িয়েছিল সেই ভাগার মাংস কাণ্ডে। বজবজ, ট্যাংরা, ধাপা ও কল্যাণীসহ বিভিন্ন ভাগাড় বা ডাম্পিং গ্রাউন্ড থেকে মৃত পশুর পচা মাংস সংগ্রহ করা হতো। রাসায়নিক ও ফরমালিন মিশিয়ে এবং হিমঘরে মাছের বাক্সের আড়ালে সেই পচা মাংস মজুত করা হতো। কোলকাতা ও তার আশেপাশের বিভিন্ন হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে এই পচা মাংস কম দামে সরবরাহ করা হতো। এমনকি ভিন্‌ রাজ্যে ও বিদেশেও তা পাচারের অভিযোগ উঠেছিল।ভয়ে মানুষ হোটেল -রেস্টুরেন্টে যাওয়া প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিল।এরপর খাদ্য দফতরের তৎপরতায় ফিরে আসে স্বচ্ছতা।

বর্তমানে অধিকাংশ মানুষই বাইরের খাবারের ওপর নির্ভরশীল। তা সে বন্ধু বা কাছের মানুষের সাথে ঝাঁ চকচকে রেস্টুরেন্টে সময় কাটানোই হোক অথবা ফ্যামিলির সঙ্গে উইকেন্ডে ভোজন। মানুষের চাহিদার ওপর নির্ভর করে নিত্যনতুন খাবারের ভ্যারাইটি আনতে ব্যস্ত হোটেল ও রেস্তোরাঁ গুলি। আপনি যখন আপনার পরিবার বা প্রিয়জনের সঙ্গে সুস্বাদু খাবারের স্বাদ আস্বাদন করতে ব্যস্ত,তখন সেই খাবার অজান্তে আপনার শরীরের বড়সড় ক্ষতির কারণ হচ্ছে না তো? ভাবছেন হয়ত এ এবার কী কথা। কিন্তু আজ আপনাদের সামনে মালদার একটি ঝাঁ চকচকে রেস্তোরাঁর পেছনের অস্বাস্থ্যকর ছবি তুলে ধরব। যা আপনাকে বাইরে খাবার বিষয়ে আতঙ্কিত করবে।

গোটা বিষয়টি একটু বুঝিয়ে বলি। একটি হোটেল বা রেস্তোরাঁর প্রাণকেন্দ্র কি বলুন তো? রান্নাঘর। আমাদের খাবার টেবিলে যখন পছন্দের খাবার সাজানো থাকে তখন আমরা ভাবার প্রয়োজন মনে করি না যে খাবারটি কতটা স্বাস্থ্যকরভাবে বানানো হয়। কেননা আমরা চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করে খাবার খাই । আর এটাই হয়ে আসছে। একইরকমভাবে মালদার এই রেস্তোরাঁটি বাইরে থেকে ঝাঁ চকচকে, আধুনিক ও বিলাসবহুল। তবে রান্নাঘর একেবারেই অস্বাস্থ্যকর।বিষয়টি নজরে আসে যখন মালদহের রেস্তরাঁগুলিতে কড়া নজরদারি জেলা প্রশাসনের তরফে।জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে এবং সাধারণ মানুষের পাতে পরিবেশিত খাবারের মান বজায় রাখতে জেলার ২৫টি নামীদামী রেস্তরাঁয় হানা দেন খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ক আধিকারিকরা । পরিদর্শনের সময় মালদহ শহরের মনস্কামনা রোড এলাকার এই নামী রেস্তোরাঁর রান্নাঘরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও পচা-বাসি খাবার মেলায় তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।

মনস্কামনা রোডের ওই রেস্তোরাঁয় পৌঁছে রান্নাঘর পরিদর্শন করতেই একাধিক অনিয়ম নজরে আসে আধিকারিকদের। খাদ্য সুরক্ষা দফতরের আধিকারিকদের দাবি, ফ্রিজে ২০ থেকে ২৫ দিন ধরে মাছ, খাসির মাংস, পনির, মসলা-সহ বিভিন্ন কাঁচা খাবার রাখা ছিল। এমনকী নিকাশিনালার উপর দিয়ে খাবার নিয়ে কর্মীদের যাতায়াত করতে দেখা যায়। রান্নাঘরের মধ্যেই রয়েছে শৌচালয়। দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষিত খাবার থেকে পচা দুর্গন্ধও ছড়াচ্ছিল বলে অভিযোগ। রেস্তোরাঁর রাঁধুনি রিঙ্কু হরিজন জানান, মাছ, খাসির মাংস, পনির, মসলা-সহ বিভিন্ন খাবার ১০ থেকে ১৫ দিন ধরে ফ্রিজে রাখা ছিল। তিনি কয়েকদিন আগে কাজে যোগ দিয়েছেন তাই এই সমস্তবিষয়ে ওয়াকিবহাল নন।

ইতিমধ্যেই খাবারের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। খাদ্য সুরক্ষা আধিকারিকদের স্পষ্ট বক্তব্য, ল্যাবরেটরির রিপোর্ট ও পরিদর্শনের তথ্যের ভিত্তিতে অভিযুক্ত রেস্তরাঁর বিরুদ্ধে খাদ্য নিরাপত্তা আইনের সমস্ত প্রযোজ্য ধারায় কড়া আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। নিয়ম অনুযায়ী, নিয়মভঙ্গকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নমুনা সংগ্রহ ও আইনি নোটিস পাঠানোর পূর্ণ অধিকার রয়েছে এই টিমটির।এই ঘটনার পর জেলাবাসীকে আশ্বস্ত করে কড়া বার্তা দিয়েছেন মালদহের জেলা শাসক (DM) রাজনবীর সিং কাপুর। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, “জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে কোনওভাবেই আপস করা হবে না। নোংরা পরিবেশে খাবার তৈরি বা সাধারণ মানুষকে পচা-বাসি ও অস্বাস্থ্যকর খাবার পরিবেশন করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেললে কাউকে রেয়াত করা হবে না।” অতিরিক্ত জেলাশাসক অনিরুদ্ধ নন্দী বলেন, বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। খাবারের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হবে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার তৈরি ও পরিবেশনের অভিযোগের সমস্ত দিক খতিয়ে দেখে রিপোর্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতেই পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্বভাবতই গোটা ঘটনায় উদ্বিগ্ন রেস্তোরাঁর নিয়মিত গ্রাহকরা।খাবারের গুণগত মান ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার দাবি তুলেছেন তারা। তবে শুধু মালদাই নয় রাজ্যের বহু শহর ও জেলায় ছড়িয়ে ছিঁটিয়ে রয়েছে এই ধরনের বহু রেস্তোরাঁ। বাইরে থেকে চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্য। টেবিলে হয়ত পরিপাটি করে সাজিয়ে পরিবেশন করা হচ্ছে বাসি-পচা খাবার। অজান্তে আমরা পয়সা খরচ করে শরীরে ঢোকাচ্ছি বিষাক্ত খাবার।