সুন্দরবনে বাঘের চারণ ভূমি বিস্তৃত হচ্ছে, দাবি বন দফতরের।

বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা: সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণে ফের মিলল সুখবর। বহু প্রতীক্ষিত বাঘশুমারির প্রাথমিক রিপোর্টে উঠে এসেছে আশাব্যঞ্জক তথ্য। ক্যামেরা ট্র্যাপে ধরা পড়েছে একাধিক বাঘিনী ও শাবকের ছবি। শুধু সুন্দরবনের উত্তর বা পশ্চিম অংশেই নয়, এবার বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী দক্ষিণ প্রান্তেও রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের উপস্থিতির প্রমাণ মিলেছে বলে দাবি করেছে বন দফতর। বন দফতরের মতে, এটি সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র এবং বাঘ সংরক্ষণ কর্মসূচির জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক বার্তা।
প্রায় চার বছর পর গত ডিসেম্বরে সুন্দরবনে পুনরায় পূর্ণাঙ্গ বাঘশুমারির কাজ শুরু করে বন দফতর। সাড়া দেশের মতই সুন্দরবন এলাকাতেও ট্র্যাপ ক্যামেরা বসিয়ে তোলা হয় বাঘেদের ছবি। সেই ছবি বিশ্লেষণ করে বাঘেদের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়। বাঘেদের গায়ের ডোরা-কাটা দাগই এক বাঘ থেকে আরেক বাঘকে আলাদা করে। কম্পিউটারে বিশেষ এপ্লিকেশানের মাধ্যমে বাঘেদের গননার কাজ চালানো হয়। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনের বিভিন্ন রেঞ্জে অন্তত ১০-১২টি পূর্ণবয়স্ক বাঘিনী এবং তাদের সঙ্গে একাধিক শাবকের ছবি ধরা পড়েছে বলে দাবি বন দফতরের। তাঁদের মতে, যেখানে বাঘিনী ও শাবকের উপস্থিতি রয়েছে, সেখানে ওই এলাকার পরিবেশ সুস্থ এবং প্রজনন প্রক্রিয়া স্বাভাবিক রয়েছে বলেই ধরে নেওয়া হয়।
আগের বাঘ সুমারি অনুযায়ী সুন্দরবনে অন্তত ১০১ টি বাঘ রয়েছে বলে দাবি করেছিল বন দফতর। সেই সংখ্যা আরও বেশ খানিকটা যে বেড়েছে তা বারে বারে দাবি করেছে সুন্দরবন ব্যাঘ্র প্রকল্প। কারণ সাম্প্রতিক অতীত কিম্বা বিগত দু তিন বছরের হিসেব দেখলে সুন্দরবনের একাধিক জায়গাতেই বাঘিনী ও তার সাথে একাধিক শাবকের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গিয়েছে। ফলে বাঘের সংখ্যা যে সুন্দরবনে এক ধাক্কায় এবার অনেকটাই বেড়েছে তা মেনেও নিয়েছেন বনকর্তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনের ক্যারিং ক্যাপাসিটি এখনও বাঘের জন্য উপযুক্ত। পর্যাপ্ত খাদ্য, নিরাপদ আবাসস্থল এবং বন সংরক্ষণের ফলে বাঘের বিচরণক্ষেত্রও বিস্তৃত হচ্ছে। এমনকি দক্ষিণের উপকূলবর্তী এলাকায় বাঘের উপস্থিতি প্রমাণ করছে যে তারা নতুন অঞ্চলেও স্বাভাবিকভাবে বিচরণ করছে।
এবারের বাঘশুমারিতে গোটা সুন্দরবনকে একাধিক ভাগে ভাগ করে প্রায় ৪৫ দিন ধরে ক্যামেরা ট্র্যাপের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রতিটি বাঘের ডোরাকাটা দাগ বিশ্লেষণ করে পৃথক বাঘকে শনাক্ত করার শেষ মুহূর্তের কাজ চলছে। বন দফতরের আশা, চূড়ান্ত রিপোর্ট প্রকাশিত হলে সুন্দরবনে বাঘ সংরক্ষণের সাফল্যের আরও স্পষ্ট চিত্র সামনে আসবে। বাঘিনী ও শাবকের সাম্প্রতিক ছবি ইতিমধ্যেই বনকর্মী থেকে পরিবেশপ্রেমী সকলের মধ্যেই নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
সুন্দরবনে বাঘেদের সংখ্যা বৃদ্ধির থেকেও বনকর্তাদের কাছে খুশির খবর যে বাঘেদের চারণ ভূমি বৃদ্ধি পেয়েছে সুন্দরবনে। এর আগের সুমারিতে সুন্দরবনের সজনেখালি ও বসিরহাট রেঞ্জ মিলিয়ে সুন্দরবনের উত্তর ও পশ্চিম দিকেই মূলত বাঘেদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গিয়েছিল। তবে এবার বাঘেদের উপস্থিতি সুন্দরবনের দক্ষিন দিকে অর্থাৎ বঙ্গপোসাগরের দিকেও যথেষ্ট পরিমাণে লক্ষ্য করা গিয়েছে বলে দাবি বন দফতরের। পাশাপাশি সুন্দরবনে বাঘেদের ঘনত্ব আগের তুলনায় বেড়েছে বলেও দাবি করছেন বনকর্তারা। ২০১৮ সালে যেখানে সুন্দরবনে বাঘেদের ঘনত্ব ছিল ১০০ বর্গ কিলোমিটারে ৩.৬, সেখানে ২০২২ সালে তা বেড়ে হয় ৪.২৭। হিসেব বলছে সর্বশেষ বাঘ গননার ফাইনাল রিপোর্ট হাতে এলেই দেখা যাবে এই সংখ্যাটা অনেকটাই বৃদ্ধি পাবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সুন্দরবন ব্যাঘ্র প্রকল্পের এক কর্তা বলেন, “ সুন্দরবনে বাঘেদের চারণ ভূমি আগের তুলনায় অনেকটাই বেড়েছে। যেখানে সুন্দরবনের দক্ষিন প্রান্তে বিগত বাঘ সুমারিতে বাঘেদের উপস্থিতি একেবারেই লক্ষ্য করা যায়নি, এবারের গননায় তা লক্ষ্য করা গিয়েছে। বাঘেদের সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে তারা যে নিজেদের থাকার জায়গাও নতুন করে খুঁজে নিতে শুরু করেছে এটা তারই প্রমাণ।”