বছরভর ম্যানগ্রোভ নার্সারি তৈরি করে আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হচ্ছেন ম্যানগ্রোভ আর্মির মহিলারা।

বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা : এক সময় আর্থিক ভাবে যথেষ্ট ভেঙে পড়েছিলেন সুন্দরবনের প্রত্যন্ত গ্রামের বহু মানুষ। একের পর এক প্রাকৃতিক বিপর্যয় তাঁদের চাষের জমি থেকে শুরু করে বাড়ি ঘর সবই কেঁড়ে নিয়েছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে কেউ কেউ এলাকাতেই কোন কাজ খুঁজলেন, কেউ কেউ চলে গেলেন ভিন রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে। এই পরিস্থিতিতে যখন বারে বারে সুন্দরবনকে রক্ষার জন্য ম্যানগ্রোভ রোপণের কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা, সরকারি, বেসরকারি সমস্ত উদ্যোগেই নদীর পাড়ে ম্যানগ্রোভ রোপণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তখন গোসাবার চরঘেরীর বাসিন্দা তথা ভূগোলের শিক্ষক উমাশঙ্করের হাত ধরে গ্রামের মহিলারা ম্যানগ্রোভের চারা তৈরির জন্য নার্সারি করলেন। গড়ে তুললেন নিজেদের ‘ম্যানগ্রোভ আর্মি’। বর্তমানে তাঁদের তৈরি সেই নার্সারিই সুন্দরবন রক্ষার অন্যতম রসদ।
সুন্দরবনের ‘ম্যানগ্রোভ আর্মি’ হলো মূলত স্থানীয় মহিলাদের নিয়ে গঠিত একটি দল, যারা সুন্দরবনকে বাঁচাতে ম্যানগ্রোভ চারা রোপণ ও সংরক্ষণের কাজ করে। এই উদ্যোগ প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে উপকূলকে রক্ষা, জীববৈচিত্র্য বৃদ্ধি এবং স্থানীয় মহিলাদের কর্মসংস্থান ও ক্ষমতায়নের মাধ্যমে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রকে শক্তিশালী করছে। চিরাচরিত জ্ঞান ব্যবহার করে বনসৃজনে গ্রামের মহিলারা ‘ম্যানগ্রোভ আর্মি’ হিসেবে একদিকে যেমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, তেমনি তারা স্থানীয় জ্ঞান ও শ্রম দিয়ে ম্যানগ্রোভ চারা রোপণ, পরিচর্যা করছেন। তাঁদের হাতে তৈরি ম্যানগ্রোভ চারাই একদিকে যেমন উমাশঙ্করের নেতৃত্বে সুন্দরবনের বিভিন্ন নদীর চরে রোপণ করা হচ্ছে, তেমনি বহু সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাকেও তাঁরা সেই চারা বিক্রি করছেন। যা থেকে উপার্জিত অর্থ তাঁদের অর্থনীতিকে উন্নত করছে।
উমাশঙ্কর বলেন, “ম্যানগ্রোভ নার্সারি তৈরিতে ম্যানগ্রোভ আর্মির ভূমিকা অপরিসীম। উপকূলবর্তী ও ব-দ্বীপ অঞ্চলে তাঁরা মূলত বীজ বা প্রোপাগল সংগ্রহ, চারা উৎপাদন এবং বিজ্ঞানসম্মত রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষা ও জীবিকা নির্বাহে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। এই চারাই সুন্দরবনের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতি বছর কয়েক লক্ষ নতুন ম্যানগ্রোভ রোপণে সাহায্য করছে।”
সঠিক বীজ সংগ্রহ ও অঙ্কুরোদগম যাতে ঠিক ভাবে হয় সে বিষয়ে ম্যানগ্রোভ আর্মিরা নজর রাখেন সর্বক্ষণ। সুন্দরবনের জঙ্গল থেকে ও নদীতে ভেসে আসা ম্যানগ্রোভের ফল এবং বীজ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সংগ্রহ করেন। এরপর সেগুলিকে নার্সারিতে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে রোপণ করেন। নিয়মিত পরিচর্যায় বীজ থেকে চারা তৈরি হয়। বর্তমানে এই কাজে প্রায় সাড়ে ছয়শো মহিলা নিযুক্ত রয়েছেন। ম্যানগ্রোভ আর্মির সদস্য সবিতা, মায়ারা বলেন, “ এই কাজ করে আমরা ভীষণ খুশি। একদিকে যেমন এই ম্যানগ্রোভ রোপণে সুন্দরবন রক্ষা পাবে, পরিবেশ দূষণ, নদী ভাঙন কমবে। ঝড়-ঝঞ্জার হাত থেকে আমরা রক্ষা পাবো, তেমনি এই ম্যানগ্রোভের নার্সারি ও ম্যানগ্রোভ রোপণ করে আমরা অর্থ উপার্জনও করছি। ফলে সংসারের হাল ফিরেছে অনেকটাই।” ম্যানগ্রোভ আর্মির হাতে ধরেই চলতি বছর ২৬ শে জুলাই রাজ্য সরকারের উদ্যোগে আয়োজিত পরিবেশ দিবসে উমাশঙ্করকে ম্যানগ্রোভ প্লান্টেশন প্রটেকশন কনজারভেশন এর জন্য বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হয়।