ছোট ছোট বিনিয়োগে বড় রিটার্ন

কোন কৌশলে রিটার্ন আরও বাড়ানো যায়?

সূচনা পল্যে, নিজস্ব সংবাদদাতাঃ ছোট ছোট বিনিয়োগে বড় রিটার্ন- শুনতে হয়তো অবাক লাগতে পারে, কিন্তু আধুনিক বিনিয়োগ ব্যবস্থায় এটাই এখন বাস্তব সত্য। আর এই পরিবর্তনের অন্যতম অস্ত্র হল SIP বা Systematic Investment Plan। কিন্তু কীভাবে ছোট SIP থেকেও দীর্ঘমেয়াদে বড় রিটার্ন পাওয়া সম্ভব, এবং কী কী কৌশল অবলম্বন করলে এই রিটার্ন আরও বাড়ানো যায়? প্রথমেই বুঝে নেওয়া দরকার SIP আসলে কী? SIP এমন একটি বিনিয়োগ পদ্ধতি, যেখানে আপনি প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করেন। সেটা হতে পারে ৫০০ টাকা, ১০০০ টাকা বা তার বেশি। এই বিনিয়োগটি মাসে মাসে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কেটে নেওয়া হয় এবং বাজারের ওঠানামার মধ্যেও আপনার তহবিল বাড়তে থাকে। এখানেই লুকিয়ে আছে SIP-এর সবচেয়ে বড় শক্তি- রুপি কস্ট অ্যাভারেজিং এবং কম্পাউন্ডিং।

এখন আসি প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলে- যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শুরু করা। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সময়ই আপনার সবচেয়ে বড় বন্ধু। আপনি যত আগে বিনিয়োগ শুরু করবেন, আপনার টাকা তত বেশি সময় পাবে বেড়ে ওঠার। ধরুন, একজন ব্যক্তি ২৫ বছর বয়স থেকে প্রতি মাসে মাত্র ১০০০ টাকা করে SIP শুরু করল। অন্য একজন ৩৫ বছর বয়সে শুরু করল প্রতি মাসে ২০০০ টাকা। দেখলে মনে হবে দ্বিতীয়জন বেশি বিনিয়োগ করছে। কিন্তু অবাক করা বিষয় হল- প্রথমজনই শেষ পর্যন্ত অনেক বড় রিটার্ন পেতে পারে। কেন? কারণ তার কাছে বেশি সময় আছে।

দ্বিতীয় কৌশল হল- নিয়মিত ও ধারাবাহিক বিনিয়োগ। SIP-র সবচেয়ে বড় সুবিধা হল, এখানে আপনাকে বাজারের ওঠানামা নিয়ে খুব বেশি ভাবতে হয় না। শেয়ার বাজার পড়ে গেলেও আপনাকে SIP বন্ধ করতে হবে না। বরং তখনই আরও বেশি ইউনিট আপনি কম দামে কিনতে পারবেন। একে বলা হয় রুপি কস্ট অ্যাভারেজিং। অনেক মানুষ বাজার পড়লে ভয় পেয়ে SIP বন্ধ করে দেন। এটিই সবচেয়ে বড় ভুল। মনে রাখবেন, বাজার পড়ছে মানে আপনার জন্য ডিসকাউন্ট চলছে। ইউনিট কেনা আপনার ভবিষ্যতের রিটার্ন বাড়াতে সাহায্য করে। তাই বিনিয়োগে সফল হতে গেলে শৃঙ্খলা বা ডিসিপ্লিন বজায় রাখাই সবচেয়ে জরুরি। তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হল- স্টেপ-আপ SIP বা SIP-এর পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়ানো। ধরুন,

এতে আপনার সঞ্চয়ও বাড়বে, আবার ভবিষ্যতে আপনি আরও বড় ফান্ড তৈরি করতে পারবেন। আজ যে ছোট টাকা আপনি বিনিয়োগ করছেন, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে সেটি ধীরে ধীরে বড় অঙ্কে পরিণত হবে। আর এই ছোট ছোট বাড়ানোর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে বিশাল রিটার্ন দিতে পারে।এবার আসি চতুর্থ কৌশলে- সঠিক ফান্ড নির্বাচন করা। সব মিউচুয়াল ফান্ড একরকম নয়। কারও লক্ষ্য স্বল্পমেয়াদি, কারও লক্ষ্য দীর্ঘমেয়াদি। কেউ বেশি ঝুঁকি নিতে পারেন, কেউ কম। তাই নিজের লক্ষ্য ও ঝুঁকির ক্ষমতা অনুযায়ী ফান্ড বেছে নেওয়া দরকার। সাধারণত যারা দীর্ঘ সময়ের জন্য বিনিয়োগ করেন, তাদের জন্য ইকুইটি ফান্ড ভালো রিটার্ন দিতে পারে। তবে যদি কম ঝুঁকি চান, তাহলে ডেট ফান্ড বা হাইব্রিড ফান্ড বেছে নেওয়া যেতে পারে। একটি ফান্ড বেছে নেওয়ার সময় দেখতে হবে তার পূর্ববর্তী কর্মক্ষমতা, ফান্ড ম্যানেজারের অভিজ্ঞতা এবং ফান্ডের খরচ কেমন।

পঞ্চম কৌশল হল- ডাইভার্সিফিকেশন বা বৈচিত্র্য আনা। কখনও সব ডিম এক ঝুড়িতে রাখা উচিত নয়- এই প্রবাদ বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও একদম সত্য। আপনার সমস্ত টাকা যদি শুধু একটি ফান্ডে বা একটি সেক্টরে রাখেন, তাহলে ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। বরং বিভিন্ন ধরনের ফান্ডে টাকা ভাগ করে বিনিয়োগ করলে ঝুঁকি কমে যায়। যেমন, কিছু টাকা লার্জ ক্যাপ ফান্ডে, কিছু মিড ক্যাপে, কিছু ডেট ফান্ডে। এতে একটি জায়গায় ক্ষতি হলে অন্য জায়গা তা সামলে নিতে পারে।এখন আসা যাক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে- দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি। SIP কোনও শর্টকাট নয়। আজ টাকা ঢুকিয়ে কাল মোটা অঙ্কের রিটার্ন পাওয়া যাবে, এমনটা নয়। SIP হল ধৈর্যের পরীক্ষা। সাধারণত কমপক্ষে ৫ বছর, আর ভালো ফল পেতে চাইলে ১০ থেকে ২০ বছর সময় দিতে হয়। এই দীর্ঘ সময়ে আপনার ছোট ছোট বিনিয়োগ এক বিশাল ফান্ডে পরিণত হতে পারে। ষষ্ঠ কৌশল হল- নিয়মিত পর্যালোচনা ও প্রয়োজনে পরিবর্তন। বছরে অন্তত একবার আপনার বিনিয়োগের অবস্থা দেখে নেওয়া উচিত। কোনও ফান্ড যদি অনেকদিন ধরে খারাপ পারফরম্যান্স করে, তা হলে সেটা বদলানোর কথাও ভাবা যেতে পারে। তবে ছোটখাটো ওঠানামার জন্য হুট করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। বিনিয়োগ সবসময় ঠান্ডা মাথায় ও তথ্যের ভিত্তিতে করা উচিত।

আরেকটি বড় ভুল যা অনেকেই করে থাকেন, তা হল মার্কেট টাইম করার চেষ্টা। অর্থাৎ কখন বাজারে ঢুকব, কখন বেরোব- এই হিসাব করতে গিয়ে অনেকেই লাভের সুযোগ হারান। SIP-তে এই চিন্তার কোনও দরকার নেই। কারণ আপনি প্রতি মাসে বিনিয়োগ করছেনই, কখনও কম দামে, কখনও বেশি দামে। শেষ পর্যন্ত সব মিলিয়ে গড় দামটাই আপনার জন্য কাজ করে।সবশেষে বলা যায়, SIP শুধু একটি বিনিয়োগ পদ্ধতি নয়, এটি একটি অভ্যাস। এটি আপনাকে নিয়মিত টাকা সঞ্চয় করতে শেখায়, আর ভবিষ্যতের জন্য একটি শক্ত আর্থিক ভিত্তি গড়ে তোলে। আপনি যদি আজ থেকেই ছোট অঙ্কে SIP শুরু করেন, ধারাবাহিক থাকেন, ধৈর্য রাখেন, সঠিক ফান্ড নির্বাচন করেন এবং দীর্ঘমেয়াদে ভাবেন, তাহলে নিশ্চিতভাবে একদিন এই ছোট ছোট বিনিয়োগই আপনার বড় স্বপ্নকে বাস্তব করবে। কারণ মনে রাখতে হবে-বড় সম্পদ গড়ে ওঠে একদিনে নয়, গড়ে ওঠে ছোট ছোট, নিয়মিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। আর SIP হল সেই সিদ্ধান্তগুলির মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী একটি অস্ত্র।