নতুন বাজি রিলায়েন্স জিও-র

‘সাব-২০০’ সেগমেন্টকে টার্গেট করেই নতুন ১৯৯ টাকার প্ল্যান।

সূচনা পল্যে, সাংবাদিক : মোবাইল রিচার্জের দাম বাড়ছে, ডেটার খরচ বাড়ছে, আর তার মাঝেই সাধারণ গ্রাহকের সবচেয়ে বড় চিন্তা- কম টাকায় এমন একটা প্ল্যান পাওয়া, যেখানে প্রতিদিন কিছুটা ডেটাও থাকবে, আবার ফোনটাও সচল থাকবে। বিশেষ করে ছাত্রছাত্রী, সেকেন্ডারি সিম ব্যবহারকারী কিংবা যাঁরা খুব বেশি ডেটা খরচ করেন না, তাঁদের জন্য কম বাজেটের ভালো প্ল্যান এখন সবচেয়ে বেশি দরকার। আর ঠিক সেই জায়গাতেই নতুন বাজি ফেলল রিলায়েন্স জিও।

২০০ টাকারও কমে বাজারে নিয়ে এল নতুন ১৯৯ টাকার প্রিপেড প্ল্যান। জিওর দাবি, এই প্ল্যানে মিলবে প্রতিদিন ১.৫ জিবি ডেটা, আনলিমিটেড কলিং এবং প্রতিদিন ১০০টি এসএমএস। অর্থাৎ কম খরচে দৈনন্দিন ব্যবহারকারীদের জন্য একদম ব্যালান্সড অফার। কিন্তু প্রশ্ন হল- এই প্ল্যান আসলে কতটা লাভজনক? কারা সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবেন? আর জিও কেন হঠাৎ এই নতুন প্ল্যান বাজারে আনল?

ভারতের টেলিকম বাজারে এখন ভয়ঙ্কর প্রতিযোগিতা চলছে। একদিকে এয়ারটেল, অন্যদিকে ভোডাফোন আইডিয়া- সবাই গ্রাহক ধরে রাখতে নতুন নতুন অফার আনছে। এর মধ্যেই জিও বুঝতে পেরেছে, বাজারে এমন একটা অংশ রয়েছে যারা কম দামের মধ্যে প্রতিদিনের ডেটা সুবিধা চায়। অনেকেই ৩০০-৪০০ টাকার বড় রিচার্জ করতে চান না। আবার শুধুমাত্র টকটাইম প্ল্যানেও কাজ চলে না। তাই এই ‘সাব-২০০’ সেগমেন্টকে টার্গেট করেই নতুন ১৯৯ টাকার প্ল্যান।

এই প্ল্যানে কী কী পাওয়া যাবে?

প্রথমেই আসি ডেটার কথায়। প্রতিদিন ১.৫ জিবি করে হাই-স্পিড ডেটা পাওয়া যাবে। অর্থাৎ দিনে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার, হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউবে কিছু ভিডিও দেখা- সবটাই সহজে করা যাবে। এর সঙ্গে রয়েছে-


আনলিমিটেড ভয়েস কলিং
প্রতিদিন ১০০টি এসএমএস
১৮ থেকে ২৩ দিনের ভ্যালিডিটি

তবে প্রতিদিনের ১.৫ জিবি ডেটা শেষ হয়ে গেলে ইন্টারনেট স্পিড কমে ৬৪ কেবিপিএস হয়ে যাবে। এটা জিওর ফেয়ার ইউজেজ পলিসির অংশ।

এখন প্রশ্ন হল- এই প্ল্যান কার জন্য সবচেয়ে ভালো?

সবচেয়ে আগে আসবেন বাজেট ইউজাররা। যারা কম খরচে একটা নির্ভরযোগ্য প্ল্যান চান, তাঁদের জন্য এটা ভালো অপশন। বিশেষ করে কলেজ পড়ুয়া, কম ডেটা ব্যবহারকারী বা সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য এই প্ল্যান কার্যকর হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, যাঁরা সেকেন্ডারি সিম ব্যবহার করেন। অনেকেরই দুটো সিম থাকে- একটা অফিসের জন্য, একটা ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য। সেই দ্বিতীয় নম্বরটাকে সক্রিয় রাখতে এই প্ল্যান যথেষ্ট।

তৃতীয়ত, লাইট টু মডারেট ইউজার। আপনি যদি সারাদিন গেমিং না করেন বা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওটিটি না দেখেন, তাহলে এই প্ল্যানেই আপনার কাজ হয়ে যাবে।

এখন একটু তুলনা করে দেখা যাক জিওর অন্য প্ল্যানগুলোর সঙ্গে। জিওর ১৮৯ টাকার প্ল্যানে মোট ২ জিবি ডেটা পাওয়া যায়। সেখানে প্রতিদিনের ডেটা সুবিধা নেই। ফলে যারা রোজ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন, তাঁদের জন্য সেটা খুব সুবিধাজনক নয়। আবার ২০৯ টাকার প্ল্যানে রয়েছে প্রতিদিন ১ জিবি ডেটা। কিন্তু ১৯৯ টাকার প্ল্যানে ১.৫ জিবি ডেটা দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ কম টাকায় বেশি ডেটা। অন্যদিকে ৩৩৯ টাকার প্ল্যানে অবশ্য ১.৫ জিবি ডেটা মিললেও তার ভ্যালিডিটি বেশি। তবে অনেকেই এত বেশি টাকা একসঙ্গে খরচ করতে চান না। ফলে ১৯৯ টাকার প্ল্যানটা মাঝামাঝি জায়গায় একটা ‘ভ্যালু ফর মানি’ অপশন হিসেবে উঠে আসছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জিও আসলে বাজারে একটা ফাঁকা জায়গা পূরণ করতে চাইছে। কারণ ২০০ টাকার নিচে এমন প্ল্যান খুব বেশি ছিল না যেখানে প্রতিদিন পর্যাপ্ত ডেটা পাওয়া যায়। তবে এই প্ল্যানের কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে।

প্রথমত, ভ্যালিডিটি তুলনামূলক কম। যারা একবার রিচার্জ করে পুরো মাস নিশ্চিন্ত থাকতে চান, তাঁদের জন্য এটা সেরা অপশন নয়। দ্বিতীয়ত, এখানে কোনও বড় ওটিটি সাবস্ক্রিপশন নেই। অনেক প্ল্যানে জিওসিনেমা বা অন্য অ্যাপের সুবিধা থাকে, এখানে সেটা নেই। তৃতীয়ত, যারা ভারী গেমিং করেন বা সারাদিন ভিডিও স্ট্রিমিং করেন, তাঁদের জন্য ১.৫ জিবি ডেটা যথেষ্ট নাও হতে পারে।

তবে ভারতের বাস্তব বাজার ধরলে এই প্ল্যানের বড় একটা চাহিদা তৈরি হতে পারে। কারণ দেশের একটা বড় অংশ এখনও কম বাজেটের মোবাইল রিচার্জের উপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল, ছোট শহর কিংবা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে ২০০ টাকার নিচের প্ল্যান এখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর একটা বিষয় এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে মোবাইল রিচার্জের দাম ধীরে ধীরে বাড়ছে। ফলে গ্রাহকেরা এখন এমন প্ল্যান খুঁজছেন যেখানে কম খরচে দৈনন্দিন প্রয়োজন মিটে যায়। জিও সম্ভবত সেই মনস্তত্ত্বটাই বুঝেছে। শুধু তাই নয়, বাজারে প্রতিযোগিতাও এখন তুঙ্গে। এয়ারটেল এবং ভোডাফোন আইডিয়াও নতুন নতুন অফার আনছে। ফলে গ্রাহক ধরে রাখতে জিওকে নিয়মিত নতুন প্ল্যান আনতেই হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দিনে আরও ছোট মেয়াদের এবং কম দামের ডেটা প্ল্যান বাজারে আসতে পারে। কারণ ভারতীয় গ্রাহকদের একটা বড় অংশ এখন ‘ফ্লেক্সিবল রিচার্জ’-এর দিকে ঝুঁকছে। সবাই আর একমাস বা তিনমাসের বড় প্ল্যানে যেতে চাইছেন না।

সব মিলিয়ে বলা যায়, জিওর নতুন ১৯৯ টাকার প্ল্যান মূলত সেইসব ব্যবহারকারীদের জন্য, যাঁরা কম টাকায় প্রতিদিন কিছুটা ডেটা, কলিং এবং এসএমএস সুবিধা চান। খুব ভারী ব্যবহার না হলে এই প্ল্যান দৈনন্দিন প্রয়োজন সহজেই মেটাতে পারবে। এখন দেখার বিষয়, এই প্ল্যানের জবাবে এয়ারটেল বা ভিআই কী নতুন অফার আনে। কারণ ভারতের টেলিকম বাজারে প্রতিযোগিতা যত বাড়বে, শেষ পর্যন্ত লাভ হবে সাধারণ গ্রাহকদেরই। ব্যুরো রিপোর্ট আর প্লাস নিউজ।