শনিবার ভোরে খামেনেই নিজের অফিসে বসে কাজ করার সময় আচমকা হামলার শিকার হন। বিস্ফোরণে তাঁর সঙ্গে মৃত্যু হয়েছে তাঁর কন্যা, জামাই ও নাতনিরও।

রিয়া দাস, সাংবাদিক : পশ্চিম এশিয়ার আকাশে যেন আচমকাই নেমে এসেছে সর্বনাশের কালো মেঘ। ভোরের নিস্তব্ধতা চিরে মুহুর্মুহু বিস্ফোরণ, ড্রোনের গর্জন, ক্ষেপণাস্ত্রের তাণ্ডব। সব মিলিয়ে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে তেহরান-সহ ইরানের একাধিক বড় শহর। এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মাঝেই বিশ্ব রাজনীতিতে নেমে এসেছে এক বড় ধাক্কা। ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই নিহত হয়েছেন আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের যৌথ হামলায় এমনটাই নিশ্চিত করেছে তেহরান। ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, দেশজুড়ে টানা ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। ইরানের রেভলিউশনারি গার্ড এই ঘটনাকে কাপুরুষোচিত হামলা বলে আখ্যা দিয়ে জানিয়েছে, আমরা এক অনন্য, দূরদর্শী ও সাহসী নেতাকে হারালাম। এই ক্ষতির প্রতিশোধ ইতিহাস মনে রাখবে।
এর আগে ইজ়রায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু প্রথম খামেনেইয়ের মৃত্যুর দাবি করেন। তার পর সমাজমাধ্যমে সেই খবর নিশ্চিত করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যদিও শুরুতে ইরান একাধিক বার এই খবর উড়িয়ে দিয়ে জানিয়েছিল, তাদের সর্বোচ্চ নেতা নিরাপদেই রয়েছেন। কিন্তু রবিবার সকালে সরকারি সংবাদমাধ্যমের ঘোষণার পর যাবতীয় ধোঁয়াশার অবসান ঘটে। তেহরান জানায়, শনিবার ভোরে খামেনেই নিজের অফিসে বসে কাজ করার সময় আচমকা হামলার শিকার হন। বিস্ফোরণে তাঁর সঙ্গে মৃত্যু হয়েছে তাঁর কন্যা, জামাই ও নাতনিরও। দেশজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। রাস্তায় নেমে পড়েন হাজার হাজার মানুষ। কান্নায় ভেঙে পড়া নারী, হাতে খামেনেইয়ের ছবি ধরে শোকপ্রকা। সব মিলিয়ে তেহরানের রাস্তায় তৈরি হয় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। শনিবার সকাল থেকেই ইজ়রায়েল ও আমেরিকার যৌথ বাহিনী ইরানের উপর ব্যাপক আক্রমণ শুরু করে। তেহরান, ইসফাহান, মাশহাদ-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শহরে আছড়ে পড়ে ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও বোমা। নেতানিয়াহুর দাবি, এই অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিলেন খামেনেই ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। ট্রাম্প সমাজমাধ্যমে লেখেন, “ইতিহাসের পাতায় অন্যতম কুখ্যাত ব্যক্তি খামেনেই। তাঁর বাহিনীর হাতে যাঁদের প্রাণ গিয়েছে। আজ তাঁদের ন্যায়বিচার হল। “

একইসঙ্গে তিনি ইরানের নাগরিকদের উদ্দেশে নতুন করে দেশ গঠনের ডাক দেন এবং দেশবাসীকে শান্তির পথে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। তবে শান্তির আহ্বানের পাশাপাশি আরও অন্তত এক সপ্তাহ ইরানে বোমাবর্ষণ চলবে বলেও স্পষ্ট করেন তিনি। আর তারসঙ্গে ট্রাম্প আরও বলেন যে এবার ইরানের সঙ্গে সমঝোতা অনেক সহজ হবে। এই হামলার পাল্টা জবাবে ইরানও শনিবার রাত থেকেই ব্যাপক প্রত্যাঘাত শুরু করে। শুধু ইজরায়েল নয়, পশ্চিম এশিয়ায় থাকা একাধিক মার্কিন সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। সংযুক্ত আরব আমিরশাহির দুবাই ও আবু ধাবিতে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে, খালি করে দেওয়া হয় বিশ্বের উচ্চতম ভবন বুর্জ খলিফা। কাতারের দোহা, সৌদি আরবের রিয়াধ, কুয়েত, বাহরিন, ইরাক এবং জর্ডনেও হামলার খবর মিলেছে। এর ফলে কার্যত স্তব্ধ হয়ে পড়েছে গোটা পশ্চিম এশিয়া। একের পর এক দেশ নিজেদের আকাশসীমা বন্ধ করে দিয়েছে। বাতিল হয়েছে হাজার হাজার বিমান। বিমানবন্দরে আটকে পড়েছেন অসংখ্য যাত্রী। দুবাই বিমানবন্দরে আটকে পড়ছেন ভারতের ব্যটমিন্ট তারকা পিভি সিন্ধু। এই পরিস্থিতির ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ভারতের ব্যাডমিন্টন তারকা পিভি সিন্ধু। অল ইংল্যান্ড ওপেন খেলতে যাওয়ার পথে দুবাই বিমানবন্দরে আটকে পড়েন তিনি। সমাজমাধ্যমে সিন্ধু লেখেন, বিস্ফোরণের শব্দ, ধোঁয়া ও ধ্বংসস্তূপের মধ্যে কাটানো সেই মুহূর্ত ছিল আতঙ্কে ভরা। দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার জন্য তিনি দুবাই বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ও ভারতীয় দূতাবাসকে ধন্যবাদ জানান। একই পরিস্থিতিতে আটকে পড়েছেন বাংলাদেশের ক্রিকেটার মুশফিকুর রহিম-সহ সাধারণ মানুষ।
এই লাগাতার সংঘর্ষে সাধারণ মানুষের জীবনে নেমে এসেছে চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক। এমন পরিস্থিতিতে পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশে থাকা ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে কড়া সতর্কতা জারি করল নয়াদিল্লি। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের তরফে বিবৃতি দিয়ে জানানো হয়েছে, গোটা অঞ্চলে নিরাপত্তার অবনতি ঘটেছে এবং সাধারণ নাগরিকদের প্রাণের ঝুঁকি বেড়েছে। তাই সকলকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, প্রয়োজন ছাড়া বাড়ির বাইরে না বেরোতে, ভিড় ও উত্তেজনাপ্রবণ এলাকা এড়িয়ে চলতে এবং সর্বদা চোখ-কান খোলা রাখতে। বিদেশ মন্ত্রকের নির্দেশিকায় আরও স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে, পশ্চিম এশিয়ায় বসবাসকারী বা কর্মরত ভারতীয় নাগরিকদের স্থানীয় প্রশাসন ও ভারতীয় দূতাবাসের জারি করা সমস্ত নিরাপত্তা নির্দেশ মেনে চলতে হবে। বিভিন্ন দেশে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাসগুলিতে জরুরি হেল্পলাইন নম্বর সক্রিয় রাখা হয়েছে, যাতে যে কোনও বিপদের মুহূর্তে দ্রুত সাহায্য পাওয়া যায়। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, ইজরায়েল এবং ইরানে বসবাসকারী ভারতীয়দের সর্বাধিক সতর্কতা অবলম্বনের কথা বিশেষ ভাবে উল্লেখ করেছে নয়াদিল্লি। পাশাপাশি, যাঁরা এখনও নিজেদের নাম নিকটবর্তী ভারতীয় দূতাবাসে নথিভুক্ত করেননি, তাঁদের দ্রুত অনলাইনে সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার অনুরোধ জানানো হয়েছে, যাতে প্রয়োজনে তাঁদের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করা সম্ভব হয়।
নয়াদিল্লির তরফে জানানো হয়েছে, পরিস্থিতির প্রতিটি মুহূর্ত গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বিদেশ মন্ত্রকের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই সংকটের সময়ে সব দেশের উচিত সংযত থাকা এবং কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের পথ খোঁজা। একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতাকে সম্মান করাই শান্তির একমাত্র ভিত্তি।’’ ভারতের তরফে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে, সামরিক সংঘর্ষের বদলে সংলাপই এই জটিল পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র উপায়। এই সতর্কতার পেছনে রয়েছে পশ্চিম এশিয়ায় দ্রুত বদলে যাওয়া সামরিক বাস্তবতা। এই প্রেক্ষাপটে ভারতের অসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রক এবং ডিজিসিএ দেশীয় বিমান সংস্থাগুলিকে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছে। সৌদি আরব, ইরান-সহ পশ্চিম এশিয়ার অন্তত ১১টি দেশের আকাশসীমা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আগামী ২ মার্চ পর্যন্ত আপাতত এই নির্দেশিকা বলবৎ থাকবে বলে জানানো হয়েছে। দেশের সব বিমানবন্দরকে পরিস্থিতির দিকে নজর রাখতে এবং জরুরি পরিকল্পনা প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে, যাতে কোনও ভারতীয় যাত্রী বিপদের মুখে না পড়েন।
এই যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে রাশিয়া, নরওয়ে, বেলজিয়াম-সহ একাধিক দেশ। রাশিয়া এই হামলাকে দায়িত্বজ্ঞানহীন সামরিক পদক্ষেপ বলে আখ্যা দিয়ে অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশও কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের উপর জোর দিচ্ছে। তবে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা চরমে। খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, মধ্যপ্রাচ্যের শক্তি এবং বিশ্ব কূটনীতিতে যে প্রবল ঢেউ উঠবে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। একদিকে শোক, অন্যদিকে প্রতিশোধের আগুন। এই দুইয়ের মাঝেই দাঁড়িয়ে রয়েছে আজ ইরান। পশ্চিম এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে যুদ্ধের আতঙ্ক। ইতিহাসের এক ভয়াবহ অধ্যায়ের সূচনা হয়ে গেল কি না, সেই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে বিশ্ব রাজনীতির অন্দরমহলে। কারণ এই সংঘাত শুধু দুটি দেশের নয় এর অভিঘাত পড়তে পারে গোটা পৃথিবীর উপর। আর সেই অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে গোটা বিশ্ব।