নেতাজির ‘মৃত্যুদিন’ পোস্টার ঘিরে বিতর্ক, চাপে বিজেপি

সমালোচকদের মতে, এটি শুধু ঐতিহাসিকভাবে বিভ্রান্তিকর নয়, বরং নেতাজির মতো এক মহান নেতার স্মৃতির প্রতিও অসম্মানজনক।

বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা: দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজপুর–সোনারপুর এলাকায় এক নির্বাচনী পোস্টারকে ঘিরে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক। বিজেপি প্রার্থী রূপা গাঙ্গুলির সমর্থনে লাগানো একটি পোস্টারে স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেতা সুভাষ চন্দ্র বসু-র ‘মৃত্যুদিন’ উল্লেখ করা হয়। আর এই তথ্যকেই কেন্দ্র করে উঠেছে প্রশ্নের ঝড়, কারণ এখনও পর্যন্ত ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে নেতাজির মৃত্যুদিন ঘোষণা করেনি।
পোস্টারটি প্রকাশ্যে আসতেই বিভিন্ন মহলে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ইতিহাসবিদ থেকে সাধারণ মানুষ—অনেকেই এই ধরনের উল্লেখকে “ভুল” এবং “অসংবেদনশীল” বলে দাবি করেছেন। দীর্ঘদিন ধরেই নেতাজির অন্তর্ধান নিয়ে নানা মতভেদ রয়েছে। ১৯৪৫ সালের ১৮ আগস্ট তাইহোকু বিমান দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে—এই তত্ত্বটি প্রচলিত হলেও, তা নিয়ে এখনও বিতর্ক রয়েছে। একাধিক তদন্ত কমিশন গঠন হলেও, নেতাজির মৃত্যু নিয়ে চূড়ান্ত ও সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায়নি।
এই প্রেক্ষাপটে কোনও রাজনৈতিক প্রচারে নেতাজির ‘মৃত্যুদিন’ নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা অনেকের কাছেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে মনে হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এটি শুধু ঐতিহাসিকভাবে বিভ্রান্তিকর নয়, বরং নেতাজির মতো এক মহান নেতার স্মৃতির প্রতিও অসম্মানজনক।
বিষয়টি নিয়ে সরব হয়েছেন রাজপুর সোনারপুর পুরসভার চেয়ারম্যান পল্লব কুমার দাস। তিনি এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করে বলেন, “নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু বাঙালির আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তাঁর মৃত্যুদিন নিয়ে এখনও পর্যন্ত কোনও সরকারি ঘোষণা নেই। সেখানে এই ধরনের পোস্টার লাগানো অত্যন্ত দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ।” তিনি আরও দাবি করেন, এই ধরনের ঘটনা ভোটের আগে বিভ্রান্তি ছড়ানোর একটি প্রচেষ্টা।
অন্যদিকে, এই বিতর্ক সামনে আসতেই দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট পোস্টারগুলি এলাকা থেকে খুলে ফেলা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এই ঘটনা সামনে আসার পরেও বিজেপির পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি। ফলে প্রশ্ন আরও ঘনীভূত হয়েছে—কীভাবে এমন একটি তথ্য পোস্টারে স্থান পেল? এর পিছনে কারা দায়ী? এবং কেনই বা যাচাই না করেই এমন সংবেদনশীল বিষয় ব্যবহার করা হল নির্বাচনী প্রচারে?
রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, ভোটের মরশুমে আবেগঘন বিষয়কে কাজে লাগানোর প্রবণতা নতুন নয়। কিন্তু নেতাজীর মতো এক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে ঘিরে ভুল তথ্য প্রচার করা অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়, যা সহজেই জনমনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে, যেখানে নেতাজির প্রতি মানুষের আবেগ গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিরোধী দলগুলিও বিজেপিকে কটাক্ষ করতে শুরু করেছে। তাঁদের অভিযোগ, ইতিহাস সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান ছাড়াই শুধুমাত্র রাজনৈতিক লাভের উদ্দেশ্যে এই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। যদিও বিজেপির তরফে এখনও কোনও ব্যাখ্যা না আসায় পুরো বিষয়টি নিয়ে জল্পনা আরও বাড়ছে।
সব মিলিয়ে, একটি পোস্টার ঘিরে তৈরি হওয়া এই বিতর্ক এখন রাজনৈতিক রূপ নিতে শুরু করেছে। নির্বাচনের মুখে এই ধরনের ঘটনা যে রাজনৈতিক সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে, তা বলাই বাহুল্য। একইসঙ্গে এটি আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে—ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের নিয়ে কোনও মন্তব্য বা তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে কতটা সতর্কতা এবং দায়িত্ববোধ প্রয়োজন।
নেতাজির মতো এক মহান স্বাধীনতা সংগ্রামীর স্মৃতিকে ঘিরে এই বিতর্ক শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটাই দেখার। তবে আপাতত স্পষ্ট—একটি পোস্টারই রাজনৈতিক মহলে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এবং প্রশ্ন তুলে দিয়েছে তথ্যের সত্যতা ও দায়িত্ববোধ নিয়েও।