গোসাবায় জেলা-স্তরের বন সপ্তাহ ২০২৬-এর সূচনা, সবুজের আহ্বানে সামিল প্রশাসন ও পড়ুয়ারা।

বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা : গোসাবা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা: সুন্দরবনের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং ম্যানগ্রোভ অরণ্য রক্ষার বার্তা আরও বিস্তৃতভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে গোসাবায় আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হল জেলা-স্তরের বন সপ্তাহ ২০২৬। এবারের বন সপ্তাহের মূল প্রতিপাদ্য ‘মায়ের নামে একটি গাছ’, যা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘Ek Ped Maa Ke Naam’ উদ্যোগের ভাবনা থেকে অনুপ্রাণিত। বন দপ্তরের উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, বনকর্তা, শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রী এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সক্রিয় অংশগ্রহণে দিনভর পরিবেশ সচেতনতার এক অনন্য আবহ তৈরি হয়।
সকালের সূচনা হয় এক বর্ণাঢ্য প্রভাত ফেরির মাধ্যমে। গোসাবা আর.আর. ইনস্টিটিউশন এবং রাঙাবেলিয়া হাই স্কুলের শতাধিক ছাত্র-ছাত্রী পরিবেশ রক্ষার বার্তা লেখা প্ল্যাকার্ড, ব্যানার এবং স্লোগান নিয়ে গোসাবার বিভিন্ন রাস্তা পরিক্রমা করে। তাঁদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয় গাছ লাগানো, বন রক্ষা এবং প্রকৃতি সংরক্ষণের আহ্বান। পথচলতি মানুষও এই সচেতনতামূলক কর্মসূচিতে উৎসাহের সঙ্গে অংশ নেন এবং বন সংরক্ষণের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন হওয়ার বার্তা পান।
প্রভাত ফেরির পর দুই বিদ্যালয়ে বন, পরিবেশ ও বন্যপ্রাণ সংরক্ষণকে কেন্দ্র করে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হয়। ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের ছবিতে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্য, রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, নদী, পাখি, বন্যপ্রাণ এবং প্রকৃতির অপূর্ব সৌন্দর্য তুলে ধরে। বিচারকদের মতে, ছোটদের এই সৃজনশীল উদ্যোগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
দুপুরে গোসাবা বিডিও অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হয় বন সপ্তাহের মূল উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন সুন্দরবন বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী দীপঙ্কর জানা। উপস্থিত ছিলেন গোসাবার বিধায়ক বিকর্ণ নস্কর, দক্ষিণ ২৪ পরগনার ডিভিশনাল ফরেস্ট অফিসার (ডিএফও) নিশা গোস্বামী, আইএফএস, অতিরিক্ত জেলা শাসক মনজিত কুমার যাদব, সুন্দরবন টাইগার রিজার্ভের ডেপুটি ফিল্ড ডিরেক্টর চিত্রক ভট্টাচার্য, আইএফএস, বন দপ্তরের আধিকারিক, প্রশাসনের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষিকারা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তারা সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্যের পরিবেশগত গুরুত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তাঁরা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং উপকূল ভাঙনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্যই সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এই বন শুধু বন্যপ্রাণের আবাসস্থল নয়, লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকা ও উপকূলীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বক্তারা আরও বলেন, পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, সমাজের প্রতিটি মানুষের। প্রত্যেক পরিবার যদি অন্তত একটি করে গাছ রোপণ করে এবং তার পরিচর্যার দায়িত্ব নেয়, তাহলে আগামী দিনে আরও সবুজ ও নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। সেই লক্ষ্যেই এবারের বন সপ্তাহে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানের পর বিডিও অফিস চত্বরে অতিথি, বনকর্তা এবং প্রশাসনের আধিকারিকদের উপস্থিতিতে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। অতিথিরা নিজ হাতে বিভিন্ন প্রজাতির চারা রোপণ করেন এবং পরিবেশ সংরক্ষণের অঙ্গীকার করেন। বন দপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বন সপ্তাহ উপলক্ষে জেলার বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার চারা গাছ রোপণের পাশাপাশি সেগুলির নিয়মিত পরিচর্যারও ব্যবস্থা করা হবে।
দিনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল একটি আলোকসজ্জিত ভাসমান ট্যাবলোর উদ্বোধন। বন দপ্তরের উদ্যোগে তৈরি এই বিশেষ নৌকাটি আগামী কয়েকদিন সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী ও খালপথে পরিক্রমা করবে। ট্যাবলোর মাধ্যমে বন সংরক্ষণ, ম্যানগ্রোভ রক্ষা, বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ এবং পরিবেশ সচেতনতার বার্তা প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। বন দপ্তরের আধিকারিকদের আশা, এই অভিনব উদ্যোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে আরও সচেতনতা তৈরি করবে।
বন সপ্তাহ উপলক্ষে আগামী কয়েকদিন জেলার বিভিন্ন স্কুল, কলেজ এবং গ্রামীণ এলাকায় বৃক্ষরোপণ, সচেতনতামূলক প্রচার, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়েছে। বিশেষ করে শিশু ও যুব প্রজন্মকে পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করতেই এই উদ্যোগ বলে জানানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে বন সপ্তাহের প্রথম দিন গোসাবায় পরিবেশ রক্ষা ও সবুজায়নের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হয়ে উঠল। প্রশাসন, বন দপ্তর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষের যৌথ উদ্যোগে সুন্দরবনকে আরও সবুজ, সুরক্ষিত ও পরিবেশবান্ধব করে তোলার অঙ্গীকারই এদিনের কর্মসূচির মূল বার্তা হয়ে উঠেছে।