“হাসিনাকে নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়
গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ভারত। প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশের মানুষের শান্তি ও স্থিতিশীলতায় ভারত প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”

অনুসূয়া দাস, সাংবাদিক: পিতৃহন্তারকের দল অনিবার্যভাবে ফের দখল নিয়েছে বাংলাদেশের। এবার লক্ষ্য কন্যা। ১৯৭৫-এর ১৫ অগাস্টের ভোর যেন ফের ফিরে এল ধানমণ্ডিতে। শুধু ধানমন্ডিই বা কেন, ২০২৫-এর নভেম্বরের ভরদুপুরে সেই স্মৃতি ফিরে এল ঢাকায়, চট্টগ্রামে। সেই দুঃসহ ভোরের স্মৃতি এখনও বাংলাদেশ ভোলেনি। পঞ্চাশ বছর আগের বঙ্গবন্ধু হত্যার স্মৃতি ফিরে এল ঢাকার আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের রায়কে ঘিরে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের রায়ে দোষী সাব্যস্ত হলেন মুজিব কন্যা। বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর ফাঁসির সাজা ঘোষণা করল আদালত। শেখ হাসিনাকে দেওয়া হয়েছে মৃত্যুদণ্ড। তবে ভারতে থাকাকালীন কীভাবে গ্রেপ্তার হবেন হাসিনা? মৃত্যুদন্ড কার্যকর হতেই হাসিনাকে ফেরতের দাবি করেছে বাংলাদেশ। ইউনূসকে কী জবাব দিল ভারত? এমন পরিস্থিতিতে কী করবে বাংলাদেশ?

১৭ নভম্বর। তারিখটা ইতিবাচক ও নেতিবাচক। দুই ভাবেই জড়িয়ে গেল শেখ হাসিনার জীবনের সঙ্গে। ১৯৬৭ সালের এই দিন। বিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ আলি মিঁয়ার সঙ্গে নতুন জীবন শুরু করেছিলেন তিনি। ২০২৫ -র সেই ১৭ নভেম্বর। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের রায়ে দোষী সাব্যস্ত হলেন মুজিব কন্যা। এর আগে রাজনৈতিক জীবনে বহুবার জেলে গিয়েছেন তিনি। তবে কোনও মামলাতেই দোষী সাব্যস্ত হয়ে সাজার মুখোমুখি হননি। জীবনে এই প্রথমবার দোষী সাব্যস্ত হয়ে সাজার মুখোমুখি হলেন। আদালত গত বছরের জুলাইয়ের বিদ্রোহের জন্য হাসিনাকে দোষী সাব্যস্ত করেছে। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে জুলাইয়ের বিদ্রোহের সময় নিরস্ত্র বেসামরিক নাগরিকদের উপর গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আদালত ছয়টি ভাগে ৪৫৩ পৃষ্ঠার রায় দিয়েছে। আদালত জানিয়েছে যে হাসিনার অপরাধ মানবতাবিরোধী। এই রায়ে বলা হয়েছে যে হাসিনা ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে একজন স্বৈরশাসক হওয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। ২০২৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচনে তিনি বিরোধী দলকে চূর্ণবিচূর্ণ করেছিলেন। পরবর্তীকালে, যখন শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমেছিল, তখন তাদের উপর গুলি চালানো হয়েছিল। আদালত হাসিনাকে অসংখ্য অপরাধের জন্য দোষী সাব্যস্ত করেছে এবং এই গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছে। রায় ঘোষণার পর বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মহম্মদ ইউনুস রায়কে ঐতিহাসিক রায় বলে আখ্যা দেন। এবং ভারতকে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের জন্য আহ্বান জানান। যদিও এদিনের রায়ের প্রতিক্রিয়ায় শেখ হাসিনা বলেন

হাসিনা বলেন
এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত
ট্রাইব্যুনালে আমাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়নি
আদালতে ন্যায্যতার সঙ্গে বিচার হলে আমি অভিযোগকারীদের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক আদালত শেখ হাসিনাকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। আদালত হাসিনার দুই সহযোগীকেও সাজা দিয়েছে। প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। প্রাক্তন পুলিশ মহাপরিদর্শক তথা আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে রাজসাক্ষী হওয়ার পর পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। যদিও এই সাজা মানছি না বলে হুঙ্কার শানান আওয়ামী নেতারা।
২০২৪ সালে ছাত্র আন্দোলনের জেরে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন এবং পরে ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন। ক্ষমতাচ্যুতির পর ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আইসিটি পুনর্গঠন করে। সেই ট্রাইব্যুনালই ২০২৪ সালের আন্দোলনে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে। শেখ হাসিনা বর্তমানে রয়েছেন ভারতে। এখন প্রশ্ন উঠছে, ভারতে থাকাকালীন তার মৃত্যুদণ্ড কীভাবে কার্যকর করা হবে? হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর প্রথমবার মুখ খুলল ভারতের বিদেশমন্ত্রক বা এমইএ।
দিল্লি জানায়
তারা বাংলাদেশের মানুষের শান্তি, গণতন্ত্র
স্থিতিশীলতার স্বার্থেই কাজ চালিয়ে যাবে
সব পক্ষের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে আলোচনা বজায় রাখবে
২০২৪ সালের অগাস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে
শেখ হাসিনা দিল্লিতেই আশ্রয় নিয়েছেন
হাসিনাকে নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়
ভারত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে
কাছের প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশের মানুষের শান্তি ও
স্থিতিশীলতায় ভারত প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং এ জন্য
সব পক্ষের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে কাজ করবে
কূটনৈতিক সূত্রের খবর, ভারত মনে করে, দু’দেশের স্বাক্ষর করা প্রত্যর্পণ চুক্তিকে সামনে নিয়ে এলেও হাসিনাকে ফেরত পাঠাতে বাধ্য নয় নয়াদিল্লি। দু’দেশের মধ্যে ২০১৩ সালে এই প্রত্যর্পণ চুক্তি সই হয়েছিল। চুক্তির ছ’নম্বর ধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, প্রত্যর্পণের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা যায় যদি অভিযোগের চরিত্র রাজনৈতিক হয়। ভারত এক্ষেত্রে গোড়া থেকেই হাসিনাকে ফেরত চাওয়ার বিষয়টিকেই রাজনৈতিক বলেই মনে করছে। অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিদেশ মন্ত্রক সংক্ষিপ্ত ভাবেই জানিয়েছে, ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের মানুষের সর্বোচ্চ স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নে ভারত প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। শেখ হাসিনাকে ঢাকার দাবি মেনে ইউনুস সরকারের হাতে তুলে দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে একটি শব্দও ব্যয় করেনি সাউথ ব্লক। তবে জানা গিয়েছে, বঙ্গবন্ধু কন্যাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে ঢাকাগামী বিমানে তুলে দেওয়ার প্রশ্নই উঠছে না। বলা হচ্ছে, এই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ঢাকার নিজস্ব। ভারতের উপরে তার কোনও আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। ওই ট্রাইব্যুনালের কথা শুনতে বাধ্য নয় সাউথ ব্লক।
এমন পরিস্থিতিতে নয়াদিল্লির পদক্ষেপ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতকে জানাবে যে ইন্টারপোলের নোটিশ জারি করা হয়েছে এবং হাসিনাকে গ্রেপ্তার করে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করার জন্য তাদের সহযোগিতা চাইবে। ভারত এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। বাংলাদেশ সরকারের পরোয়ানা সম্পর্কে অবহিত হওয়ার পর, যদি ভারত বলে যে তারা হাসিনাকে গ্রেপ্তার করবে না বা তাকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করবে না, তাহলে বাংলাদেশ বিষয়টি জাতিসংঘে তুলতে পারে। সেখানে তারা ভারতের উপর আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।