Date : 2022-01-29

রাজনীতির তুলনায় পুলিশে দুর্নীতি কম, দাবি অবসরপ্রাপ্তদের

ওয়েব ডেস্ক : ২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বর মুম্বই হামলার কথা এখনও অনেকেই ভোলেনি। পাকিস্তানি সামরিক গুপ্তচর বাহিনী পরিচালিত আত্মঘাতী জঙ্গিদের গুলি ও গ্রেনেডের আঘাতে ১৬৬ জন নিরীহ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। জখমের সংখ্যা ছিল ৩০০-রও বেশি। ওই নির্বিচারে গণহত্যা ছিল ভারতের বাণিজ্য রাজধানীতে লস্কর প্রধান হাফিজ মহম্মদ সইদের লেফটেন্যান্ট লাকভি-র আঘাত হানার প্রাথমিক পদক্ষেপ। অনেকটা স্মোকস্ক্রিনের মতো। তার অধীনস্থ আত্মঘাতী জঙ্গি বাহিনীতে স্নাইপারও ছিল। তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল নির্দিষ্ট কিছু পুলিশ অফিসারকে টার্গেট করে মারতে। সেইমতো মুম্বই পুলিশের হেমন্ত কারকারে, বিজয় কালাসকার এবং অশোক কামতেকে লেসার লাগানো টেলিস্কোপে খুঁজে বের করে হত্যা করা হয়।

আরও পড়ুন : ভুয়ো খবর থেকে সাবধান, উত্তর-পূর্ব ভারতে অশান্তি নিয়ে সতর্কতা জারি করল সেনা

ওই হামলায় মারা যান আরেক জন পুলিশ অফিসারও। তাঁর নাম তুকারাম ওম্বলে। তিনি একেবারে সামনে থেকে আজমল কাসবকে গুলি করতে গিয়েছিলেন। কাসবের হাতে চিনা একে-ফর্টিসেভেন ছিল। কাসবের গুলিবর্ষণে তুকারাম ওম্বলের মৃত্যু হয়। একটা সময় যেসব অফিসার দাউদ গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য রুখতে মুম্বই পুলিশের এনকাউন্টার সেলের দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তাঁদের উপর রাগটা দাউদ গ্যাং যে পুষে রেখেছিল আজমল কাসবদের হিটলিস্ট থেকেই ২৬ নভেম্বর তা প্রমাণ হয়ে গিয়েছিল। ২০০৬ সালের ১১ জুলাই মুম্বইয়ের সাতটি লোকাল ট্রেনে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। সেই সময় দেখা যায়, মুম্বই পুলিশের অ্যান্টি-টেরর সেলে কোনও উর্দু-জানা লোক নেই। তার মানে, পাকিস্তান থেকে উর্দু কোডে আসা কোনও গুপ্ত বার্তা পড়ার মতো বিশেষজ্ঞ মুম্বই পুলিশের এটিএসে তখন ছিল না। সন্ত্রাসবাদীদের কাছে মুম্বই শহর তাই এখনও অত্যন্ত সফট টার্গেট। কিছু দিন আগে (১১ ডিসেম্বর) নানাবতী প্যানেল গোধরা-পরবর্তী দাঙ্গায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ক্লিন চিট দিয়েছে।

আরও পড়ুন : ভাঙচুর রুখতে কড়া পদক্ষেপ, বন্ধ করা হল ইন্টারনেট পরিষেবা

তিন আইপিএস অফিসারের বিবরণ এই প্যানেল খারিজ করে দিয়েছে। তাঁদের মধ্যে দুজন ছিলেন গুজরাত পুলিশের ইন্টেলিজেন্সের দায়িত্বে, আর একজন ছিলেন আহমেদাবাদে পুলিশ কনট্রোল রুমের দায়িত্বে। হতে পারে, তাঁরা যেহেতু পুলিশের লোক, তাই মোটা ঘুষ খেয়ে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। অন্তত এই ধরনের অভিযোগ তাঁদের বিরুদ্ধে তোলা সোজা। যেমন, ইন্টেলিজেন্সের ডিসিপি আইপিএস সঞ্জয় ভাট। তাঁকে নানাবতী প্যানেল ‘বিক্ষুব্ধ ও হতাশ ব্যক্তিত্ব’ বলে ঘোষণা করে দিয়েছে। বাকি দুজন আইপিএসের একজন ইন্টেলিজেন্সের অ্যাডিশনাল ডিজিপি আর বি শ্রীকুমার। অন্যজন দাঙ্গার সময় পুলিশ কন্ট্রোল রুমের ডিসিপি রাহুল শর্মা। শুধু এই কেস বলে নয়, সোহরাবুদ্দিন মামলা থেকে ইসরাত জাহান এনকাউন্টার মামলা, সবেতে পুলিশই কাঠগড়ায়। ‘গণ্যমান্য-দেশবরেণ্য’রা ক্লিনচিট পেয়ে যান। পুলিশে বদ লোকের অভাব কোনও কালেই ছিল না। দশকের পর দশক ধরে ঘুষ খাওয়া থেকে পরস্পর খেয়োখেয়ি, ল্যাং মারামারি প্রায় সব দেশেই সব পুলিশ ডিপার্টমেন্টে আছে। বজ্জাত পলিটিশিয়ানরা তার সুযোগ নেন।

ভারতের মতো দেশে রাজ্যস্তরের আইনসভা থেকে সংসদ, দাগি জনপ্রতিনিধিদের তালিকা করলে দল-নির্বিশেষে কম্বলের লোম উঠে যাবে। সেই অনুপাতে পুলিশ বাহিনীতে অপরাধ কম। তারা হুকুমের দাস। অপরাধীদের গুলিতে পুলিশ কনস্টেবল-অফিসাররা মরলে, তাঁরা শহিদ হিসাবে পরিগণিত হন না, দেশদ্রোহী দুষ্কৃতীরা পুলিশের গুলিতে মারা গেলে রাতারাতি শহিদ স্মরণে রক্তঋণ শোধ করার ধুম পড়ে যায়। ১৯৩০-এর দশকে আমেরিকায় মবস্টার ও গ্যাংস্টারদের মারাত্মক উৎপাত ছিল। তারা অনেকে দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশ অফিসারদের সঙ্গে রফা করে রাজত্ব চালাত, রক্তগঙ্গা বওয়াত। কিন্তু প্রেসিডেন্ট হিসাবে নির্বাচিত হয়ে ফ্র্যাঙ্কলিন ডেলানো রুজভেল্ট ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশনকে মাফিয়া দমনে ফ্রি-হ্যান্ড দিয়েছিলেন। মার্কিন কংগ্রেস এবং আদালতও তাঁর পাশে ছিল। অবসরপ্রাপ্ত বর্ষীয়ান পুলিশ অফিসার ও বিচারপতিদের মতে, এই ধরনের মেরুদণ্ডওয়ালা রাজনীতিকের অভাব ভারতে এখনও প্রকট। মাঝখান থেকে বলির পাঁঠা হয় পুলিশ ডিপার্টমেন্ট।