মহালয়ার বিশেষ অনুষ্ঠানে কলকাতায় বড় জমায়েতের সম্ভাবনা ঘিরে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে চলেছে কলকাতা পুলিশ। ইডেন গার্ডেন্সে প্রায় ৪০,০০০ দর্শকের উপস্থিতির সম্ভাবনা রয়েছে। সেই সঙ্গে সন্ধ্যার মূল অনুষ্ঠানের আগে রেড রোডে আয়োজিত রোডশো দেখতে ১০,০০০-এরও বেশি মানুষ জড়ো হতে পারেন বলে প্রশাসনের অনুমান। পরিস্থিতি সামাল দিতে মার্চে আয়োজিত টি-২০ পুরুষ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের সময় যে ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, তার কাছাকাছি মডেল অনুসরণ করার প্রস্তুতি চলছে।

সুস্মিত মজুমদার, নিজস্ব সংবাদদাতা
ইডেনে দুই স্তরের নিরাপত্তা
এক পুলিশ আধিকারিক জানিয়েছেন, ইডেন গার্ডেন্সের ভিতরে প্রায় ৪০,০০০ দর্শকের জন্য দুই স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হবে। একই সময়ে রেড রোডে প্রায় ১৫,০০০ মানুষের জমায়েত হতে পারে বলে পুলিশের অনুমান। সেই কারণে রেড রোড এলাকাতেও পৃথক নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হবে। বিশেষ পুলিশ বাহিনী এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া দল বা কুইক রেসপন্স টিম ইডেন গার্ডেন্স সংলগ্ন এলাকায় মোতায়েন থাকবে।
প্রশাসনের মূল লক্ষ্য থাকবে একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রবেশ ও বেরিয়ে যাওয়ার সময় যাতে কোনও ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি না হয়। ভিড়ের চাপ সামলানোর পাশাপাশি ইডেন এবং রেড রোডের মধ্যে মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণেও বিশেষ নজর দেওয়া হবে। পুলিশ আধিকারিকরা জানিয়েছেন, পুরো অনুষ্ঠান চলাকালীন স্টেডিয়াম সংলগ্ন এলাকায় নজরদারি ও দ্রুত পদক্ষেপের ব্যবস্থা সক্রিয় থাকবে।

রেড রোড ও কিংসওয়ে বন্ধ, বাসের রুটে পরিবর্তন
ময়দান এলাকায় যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে অনুষ্ঠানের সময় কিংসওয়ে সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। রেড রোডও বন্ধ। শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা সরকারি ও বেসরকারি বাসের রুটেও পরিবর্তন আনা হবে। কলকাতা ট্রাফিক পুলিশ বাসগুলিকে চৌরঙ্গি রোড হয়ে ঘুরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে।
বিপুল সংখ্যক ব্যক্তিগত গাড়ি এবং বিশেষ চার্টার্ড গাড়ি আসার সম্ভাবনা থাকায় পার্কিং ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রশাসন জানিয়েছে, আইপিএল ম্যাচের দিনগুলিতে যে ধরনের পার্কিং ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করা হয়, তার আদলে ব্যবস্থা করা হবে। মূলত স্ট্র্যান্ড রোডকে কেন্দ্র করে গাড়ি পার্কিং ও যান নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে।
মহালয়ার দিন থেকেই শুরু উৎসবমুখর আমেজ। রেড রোড থেকে ইডেন গার্ডেন্স পর্যন্ত খোলা জিপে মুখ্যমন্ত্রী ও রাজ্যপালের যাত্রা। পাশাপাশি রেড রোডে ১২টি জেলার সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য তুলে ধরতে তৈরি হবে পৃথক স্টল। প্রতিটি স্টলে সংশ্লিষ্ট জেলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও শিল্পকলার পরিচয় তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে। কর্মসূচিতে নেতাজির ছবিতে মাল্যদান এবং বিশেষ আলোকসজ্জারও আয়োজন থাকছে। বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে থাকছে ইডেন গার্ডেন্সে থ্রি-ডি প্রজেকশন, লেজ়ার শো, আতশবাজি এবং বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে এবার কলকাতা ও রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে উৎসবের আবহকে আরও জমজমাট করে তুলতে একগুচ্ছ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর। কলকাতায় গঙ্গার দুই পাড়কে উৎসবের রঙে সাজিয়ে তোলার উদ্যোগ রয়েছে। ১০ থেকে ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত প্রিন্সেপ ঘাট, বাবুঘাট, কুমোরটুলি ঘাট, মিলেনিয়াম পার্ক এবং রামকৃষ্ণপুর ঘাট-সহ একাধিক নদীতীরবর্তী এলাকায় সাজসজ্জা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে।
মিলেনিয়াম পার্ক এবং বাজেকদমতলা ঘাটেও থাকছে বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বিভিন্ন শিল্পী ও ব্যান্ডের পরিবেশনার পাশাপাশি থাকছে গঙ্গা আরতি। চারটি জায়গায় গঙ্গা আরতি আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
১০ অক্টোবরের পর ১১ থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে হবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। দুর্গাপুর, শিলিগুড়ি, কোচবিহার, মালদহ, বহরমপুর, দিঘা এবং বিষ্ণুপুরে একাধিক অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় শিল্পী ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলির অংশগ্রহণে সংশ্লিষ্ট এলাকার নিজস্ব ঐতিহ্য ও লোকসংস্কৃতিকে তুলে ধরা হবে। দুর্গাপুরের গান্ধী ময়দানে ১১-১২ অক্টোবর, শিলিগুড়ির কাওয়াখালি প্রাঙ্গণে সাংস্কৃতিক আয়োজন, ১২-১৩ অক্টোবর কোচবিহারের রাসমেলা ময়দান এবং বিষ্ণুপুরের মেলা প্রাঙ্গণে বর্ণময় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে। ১৩-১৪ অক্টোবর মালদহের বিবেকানন্দ প্রাঙ্গণ ও বহরমপুরের ব্যারাক স্কয়ারে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নিউ দিঘার সমুদ্রসৈকতে ১৪-১৫ অক্টোবর হবে বিশেষ আয়োজন। এছাড়া আগমনী থেকে বিসর্জন দুই পর্বের জন্য পৃথক গানও তৈরি করছে তথ্য ও সংস্কৃতি দফতর। দুর্গোৎসবের আবহকে আরও নিবিড় করতে এই উদ্যোগ বলে জনিয়েছেন দপ্তরের আধিকারিকরা।
রেড রোডে বাংলার বিভিন্ন জেলার সংস্কৃতি
রেড রোডের রোডশোতেও বাংলার বিভিন্ন জেলার নিজস্ব নৃত্য ও সাংস্কৃতিক ধারাকে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ জায়গা আলো দিয়ে সাজানোর পরিকল্পনাও করা হয়েছে। ফলে মহালয়ার সন্ধ্যায় কলকাতার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় উৎসবের আবহ তৈরি হবে।
পুলিশ জানিয়েছে, রেড রোডের অনুষ্ঠান সাধারণ মানুষের জন্য খোলা থাকবে। তবে ইডেন গার্ডেন্সের মূল অনুষ্ঠানে প্রবেশ শুধুমাত্র আমন্ত্রণপত্রের মাধ্যমে করা হবে। ফলে দুই অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশের নিয়ম আলাদা থাকবে এবং সেই অনুযায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থাও সাজানো হচ্ছে।
মঞ্চের নিরাপত্তা পরীক্ষা করবে পূর্ত দফতর
ইডেন গার্ডেন্সের মূল মঞ্চের স্থায়িত্ব নিয়েও বিশেষ সতর্কতা নেওয়া হচ্ছে। অনুষ্ঠানের আগে রাজ্য পূর্ত দফতর মঞ্চের কাঠামো পরীক্ষা করবে এবং সেটি অনুষ্ঠানের জন্য নিরাপদ ও উপযুক্ত কি না, তা যাচাই করে শংসাপত্র দেবে। এত বড় সংখ্যক দর্শকের উপস্থিতিতে মঞ্চ ও অন্যান্য অস্থায়ী কাঠামোর নিরাপত্তাকে প্রশাসন বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
এর পাশাপাশি কলকাতা পুরসভাকে অনুষ্ঠানস্থল ও আশপাশের এলাকার ডাস্টবিন নিয়মিত পরিষ্কার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে কোনও জায়গায় আবর্জনা জমে না থাকে। জনস্বাস্থ্য কারিগরি দফতর বা পাবলিক হেলথ ইঞ্জিনিয়ারিং দফতর ইডেন এবং আশপাশের এলাকায় বায়ো-টয়লেট বসাবে। দর্শক ও সাধারণ মানুষের জন্য পানীয় জলের ব্যবস্থাও করা হবে।
মহালয়ার এই অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে কলকাতায় একসঙ্গে বিপুল মানুষের সমাগম হতে চলেছে। তাই অনুষ্ঠান পরিচালনার পাশাপাশি নিরাপদে মানুষের যাতায়াত, যান নিয়ন্ত্রণ, পার্কিং এবং নাগরিক পরিষেবা সচল রাখাকে প্রশাসনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হিসেবে দেখা হচ্ছে।