কেন এই সাসপেনশনের নির্দেশ ? কীভাবে হয় এই সাসপেনশন? কারা আছেন এই তালিকায়? এই পদক্ষেপের পর আর কী কী সম্ভাবনাময় দিক উঠে আসছে? ভোটে কতটা প্রভাব ফেলবে এই পদক্ষেপ?

অনুসূয়া দাস, সাংবাদিক : চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের আগে রাজ্য সরকার ও নির্বাচন কমিশনের সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার ইঙ্গিত। রাজ্যের আরও সাতজন সরকারি আধিকারিককে সাসপেন্ড করার নির্দেশ ইসির। নির্বাচনী বিধি লঙ্ঘন, দায়িত্বে গাফিলতি এবং পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগ তাঁদের বিরুদ্ধে। ইতিমধ্যেই এই সিদ্ধান্ত ঘিরে রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। এই পদক্ষেপ শুধু প্রশাসনিক নয়, ভোটের আগে তা রাজনৈতিক বার্তাও বহন করছে। রাজ্যে ভোট যত এগোচ্ছে, ততই বাড়ছে নজরদারি, ততই বাড়ছে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা।
বেশ কয়েকটি জেলায় ভোটার তালিকা সংশোধন, সংবেদনশীল বুথ চিহ্নিতকরণ এবং আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত রিপোর্টে অসঙ্গতি ধরা পড়ে। কমিশনের বিশেষ টিম তদন্তে নামে। উঠে আসে একাধিক অনিয়মের প্রমাণ। সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় একাধিক জেলায় রিপোর্টিং ও তদারকিতে একাধিক অসঙ্গতি ধরা পড়ে। এই প্রেক্ষিতেই সাতজন আধিকারিকের বিরুদ্ধে রাজ্য সরকারকে সাসপেনশনের নির্দেশ দেওয়ার জন্য চিঠি পৌঁছয় নবান্নে। রাজ্যের চার আধিকারিককে আগেই সাসপেন্ড করে তাঁদের বিরুদ্ধে এফআইআর করার নির্দেশ দিয়েছিল কমিশন। কিন্তু এফআইআর দায়ের না-হওয়ায় শুক্রবার দিল্লিতে নির্বাচন সদনে তলব করা হয়েছিল রাজ্যের মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তীকে। তার পরের দিনই জানা যায়, ওই চার আধিকারিকের বিরুদ্ধে এফআইআর করার জন্য মঙ্গলবার পর্যন্ত রাজ্যকে সময় দিয়েছে কমিশন। এরই মধ্যে রবিবার রাজ্যের আরও সাত আধিকারিককে সাসপেন্ড করার নির্দেশ দিয়ে মুখ্যসচিবকে চিঠি পাঠায় কমিশন।
সাসপেন্ড করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সমশেরগঞ্জ, ফারাক্কা, ময়নাগুড়ি, সুতি, ক্যানিং পূর্ব এবং ডেবরা বিধানসভার মোট সাতজন এইআরও-র নামে। তালিকায় রয়েছেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিং পূর্ব বিধানসভা এলাকার দুই এইআরও সত্যজিৎ দাস এবং জয়দীপ কুণ্ডু, জলপাইগুড়ির ময়নাগুড়ির এইআরও ডালিয়া রায়চৌধুরী, মুর্শিদাবাদের সমশেরগঞ্জের এইআরও শেফাউর রহমান, মুর্শিদাবাদের ফরাক্কার এইআরও নীতীশ দাস, মালদার সুতির এইআরও শেখ মুর্শিদ আলম। আছেন পশ্চিম মেদিনীপুরের ডেবরার এইআরও দেবাশিস বিশ্বাস। অভিযোগ প্রয়োজনীয় নথি এবং ভোটারদের যোগ্যতা যাচাই না করেই সেসব নথি আপলোড করেছেন এই ৭ আধিকারিক। ভোটারদের ম্যাপিংয়ে অসঙ্গতি থাকা সত্ত্বেও, সংশোধনমূলক কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এছড়াও কর্তব্যে গাফিলতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয় এই ৭ আধিকারিকের বিরুদ্ধে। কমিশন রাজ্যকে ওই আধিকারিকদের বিরুদ্ধে ডিসিপ্লিনারি অ্যাকশনের নির্দেশ দিয়েছে। দোষী সাব্যস্ত হলে অভিযুক্ত আধিকারিকদের বাধ্যতামূলক অবসর গ্রহণ, কোনও সরকারি চাকরিতে ভবিষ্যতে নিয়োগের সুযোগ ছাড়াই বাধ্যতামূলক অবসর গ্রহণ এবং চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হতে পারে।
নির্বাচন কমিশনারের তরফে পাঠানো চিঠিতে নাম রয়েছে সরকারি আধিকারিক ডালিয়া রায়চৌধুরীর। তাঁকে ডেকে পাঠান জলপাইগুড়ি জেলাশাসক। ময়নাগুড়ি বিডিওকে সঙ্গে নিয়ে জেলাশাসকের দফতরে যান ময়নাগুড়ির এইআরও ডালিয়া রায় চৌধুরী। ময়নাগুড়ি নারী উন্নয়ন আধিকারিক পদে কর্মরত ছিলেন তিনি। জেলাশাসকের দফতরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে ডালিয়া রায়চৌধুরী বলেন তিনি যা করেছেন উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে। কোনও অন্যায় কাজ তিনি করেননি। কেন নির্বাচন কমিশন তাঁকে সাসপেন্ড করতে চায়, তা তিনি জানেন না বলে দাবি করেন।
সাত এইআরও-র বিরুদ্ধে সাসপেনশনের নির্দেশ দিয়ে রাজ্য সরকারের কাছে চিঠি আসার ঘটনা নিয়ে সরব হয়েছে রাজ্যের শাসক দল।
তবে এই পদক্ষেপে উঠছে প্রশ্ন। রাজ্য সরকারকে এড়িয়ে কি কমিশন এই পদক্ষেপ নিতে পারে? প্রশ্ন উঠছে এই আইনি ক্ষমতা কি তাদের হাতে রয়েছে ? তবে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পৌঁছতে হবে একটু পিছনে। ১৯৯৩ সালে একটি মামলার ভিত্তিতে ২০০০ সালে রায় দেয় সুপ্রিম কোর্ট। সেই রায় অনুযায়ী জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ১৩ সিসি ধারা অনুযায়ী নির্বাচন সংক্রান্ত যে কোনও কাজে তাদের অধীনে বা ডেপুটেশনে থাকা আধিকারিকদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করতে পারে কমিশন। ২০২৬-র ভোটের আগে এসআইআর প্রক্রিয়ায় পক্ষপাতদুষ্টের অভিযোগ নিয়ে বারেবারে কমিশনের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে রাজ্য সরকার। এবার কমিশনের তরফে এই পদক্ষেপ রাজ্য সরকার ও কমিশনের সংঘাত আরও চরমে পৌঁছল তা বলাই যায়।