হে রাম !শেষে রামমন্দিরেও চুরি !

অযোধ্যার রামমন্দিরের দানপাত্রে চুরিকাণ্ডে গ্রেফতার ৮।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : অযোধ্যার রামমন্দিরে ভক্তদের দানের কোটি কোটি টাকা নগদ ও মূল্যবান সামগ্রী চুরির ঘটনায় আট অভিযুক্তের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের-এর পর তাদের গ্রেফতার করল পুলিশ। তদন্তে স্বচ্ছতার স্বার্থে রাম জন্মভূমি তীর্থ ক্ষেত্রের সাধারণ সম্পাদক তথা বিশ্ব হিন্দু পরিষদ-এর সহ-সভাপতি চম্পত রাইকে ইস্তফা দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সংগঠনের সভাপতি অলোক কুমার।
১৩ জুন সিট গঠন করেছিল উত্তরপ্রদেশ সরকার। প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী অনুদানের কয়েকশো কোটি টাকা নগদ, সিন্ধি সম্প্রদায়ের দেওয়া প্রায় একশোটি রুপোর ইট ছাড়াও বহু সোনার গয়নার হদিস নেই। রিপোর্টে চম্পত সহ মোট ১৭ জনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
এই আবহে চম্পতের সঙ্গে দূরত্ব বাড়াচ্ছে ভিএইচপি। সংগঠনের সভাপতি অলোক কুমার বলেন, নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে চম্পত রাইয়ের ইস্তফা দেওয়া উচিত। শেষ পাওয়া খবরে জানা গেছে অবশেষে ইস্তফা দিয়েছেন চম্পত রাই।

মন্দির কমিটির সদস্য কৃষ্ণ মোহনের অভিযোগের ভিত্তিতে আট জনের বিরুদ্ধে চুরি, চুরির সামগ্রী নিজেদের কাছে রাখা, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের অভিযোগে এফআইআর হয়েছে। এরা হলেন – রামশঙ্কর মিশ্র, অবিনাশ শুক্ল, অনুকল্প মিশ্র, লবকুশ মিশ্র, মণীশ কুমার যাদব, সুভাষ শ্রীবাস্তব, করুণেশ পাণ্ডে এবং রামশঙ্কর যাদব।
এদের মধ্যে লবকুশ ও অনুকল্প গ্রেফতার হয়েছেন বলে খবর। প্রসঙ্গত রাম মন্দিরে চুরির বিষয়টি নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে শুনানির একটি আর্জি খারিজ করে সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, শুনানি হবে আগামী সোমবার।
সিট-এর রিপোর্টে বলা হয়েছে, মন্দির প্রতিষ্ঠার পর থেকে মন্দিরের দেড়শো সেবাদারের আর্থিক সম্পত্তি এতটাই বেড়েছে যে, এদের মধ্যে অনেকেই হরিদ্বার, হৃষিকেশ, মুসৌরির মতো পর্যটনস্থলে হোটেল, রিসর্ট কিনেছেন। চলতি মাসেই স্থানীয় বিজেপি নেতা রজনীশ সিংহ প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখে এ নিয়ে তদন্তের দাবি জানান। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে চম্পত রাইয়ের কাছে রিপোর্ট চাওয়া হলে, সিট তদন্তের কথা বলে রিপোর্ট দেননি চম্পত। এফআইআরে তাঁর নাম না থাকলেও সূত্রের মতে, অভিযুক্ত রামশঙ্কর ওরফে টিনু হলেন চম্পত ঘনিষ্ঠ।
এক তদন্তকারী পুলিশ আধিকারিক জানিয়েছেন, মন্দিরের প্রণামী বাক্স এবং অনুদানের টাকা নিয়ে কী হত, কোথায় কোথায় পাঠানো হত-সেই পুরো প্রক্রিয়ায় রামশঙ্কর যাদবের ভূমিকা ঠিক কী ছিল, তা খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা।
এই ঘটনার জল অনেক দূর গড়িয়েছিল। সম্প্রতি রাজ্য সরকারের তৈরি করে দেওয়া বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট তাদের প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্ট জমা দেয়। সেই রিপোর্টে স্পষ্ট জানানো হয়েছিল, রাম মন্দিরের দানে প্রথম দর্শনেই বড়সড় অসঙ্গতি মিলেছে এবং এই ঘটনায় ফৌজদারি ধারায় মামলা রুজু করে কড়া পদক্ষেপ করা উচিত। সিট-এর সেই সুপারিশ পাওয়ার পরেই দ্রুত ব্যবস্থা নেয় পুলিশ।
এই ঘটনার সূত্রপাত বেশ কিছুদিন আগে। বিরোধী দল সমাজবাদী পার্টির নেতা তেজ নারায়ণ পাণ্ডে প্রথম জনসমক্ষে অভিযোগ তোলেন যে, রাম মন্দিরের ভক্তদের দেওয়া কোটি কোটি টাকার অনুদানে ব্যাপক দুর্নীতি ও নয়ছয় হচ্ছে।
ট্রাস্টের তরফ থেকে খোদ মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের সরকারের কাছে আবেদন জানানোর পরেই, গত ১৩ জুন তিন সদস্যের সিট গঠন করা হয়েছিল। এরপর ১৫ থেকে ২০ জুনের মধ্যে টানা পাঁচটিন অযোধ্যাতেই ছিলেন তদন্তকারীরা।
তদন্ত প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত আধিকারিকদের সূত্রে জানা গিয়েছে, সিট-এর সদস্যরা মন্দিরের প্রতিটি প্রণামী বাক্স, টাকা গোনার ঘর, স্ট্রং রুম বা স্টোরেজ, অ্যাকাউন্টিং খাতা, কারা সেই ঘরে যাতায়াত করতে পারতেন এবং সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারি ব্যবস্থা-সবকিছুই পরীক্ষা করেন। আর তাতেই ধরা পড়ে যে ভক্তদের দেওয়া সোনার গয়না এবং নগদ টাকার হিসেবে প্রথম থেকেই গরমিল ছিল।
২০২০ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়ের পর অযোধ্যায় মন্দির নির্মাণ ও তার দেখভালের জন্য গঠিত হয়েছিল শ্রী রাম জন্মভূমি তীর্থ ক্ষেত্র ট্রাস্ট। তারপর থেকে বিগত বছরগুলিতে রামলালার চরণে দেশ-বিদেশ থেকে ভক্তরা দু’হাত উজাড় করে অনুদান পাঠিয়েছেন। সূত্রের দাবি, গত কয়েক বছরে শুধুমাত্র নগদ অনুদান হিসেবেই ট্রাস্টের তহবিলে জমা পড়েছে প্রায় ৩,৫০০ কোটি টাকা। এর বাইরে সোনা, রুপো, হিরের গয়না-সহ বিবিধ মূল্যবান সামগ্রীর পাহাড় জমেছে ট্রাস্টের সিন্দুকে।
এই যে আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ এখন দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু, রাজনৈতিক মহলের দাবি, তার বীজ নাকি বোনা হয়েছিল আজ থেকে ছ’বছর আগেই। মন্দির পরিচালনাকারী শ্রী রাম জন্মভূমি তীর্থ ক্ষেত্র ট্রাস্ট-এর একটি অভ্যন্তরীণ অডিট রিপোর্টে ২০২০ সালেই আর্থিক ব্যবস্থাপনার একাধিক গুরুতর গলদ ও ত্রুটির কথা স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছিল। সেই সময়েই অডিটররা সতর্ক করে বলেছিলেন, ট্রাস্টের গোটা কাজকর্মে চূড়ান্ত পেশাদারিত্বের অভাব রয়েছে এবং অনুদানের হিসাব রাখার কোনও সুসংগঠিত বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থা সেখানে নেই।
গোয়েন্দাদের অনুমান, এই দুর্নীতি শুধু এই আটজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর জাল আরও গভীরে ছড়িয়ে থাকতে পারে। ঘটনার পিছনে আর কোন বড় মাথা কাজ করছে, এবার সেটাই খুঁজে বের করতে চাইছে উত্তরপ্রদেশ পুলিশ ।রামমন্দির শুধু কোনও ধর্মীয় স্থান নয়, ভারতের কোটি কোটি মানুষের গভীর বিশ্বাস ও আবেগের কেন্দ্রবিন্দু। সেই মন্দিরের পবিত্র অনুদান ও তার ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওঠা এই প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যেও তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।