লাদাখ মানেই প্রকৃতির এক মনমুগ্ধকর রূপ, যে রূপের টানে প্রতিবছর ছুটে আসেন লক্ষ লক্ষ পর্যটক। যে যেমনভাবে পারেন একবার ঘুরে দেখতে চান লেহ্ লাদাখের বরফ ঢাকা প্রান্তর। কিন্তু সেই লাদাখেই কি না প্রকৃতির এমন রূপ ? আতঙ্কের প্রহর গুনতে শুরু করেছেন লাদাখ বাসী। তবে শুধু লাদাখের মানুষ ই নন, গত আগষ্ট মাসের লাদাখের প্রাকৃতিক ছবি আতঙ্কিত করে তুলেছে দেশের ভূবিজ্ঞানী ও আবহবিদদের মধ্যেও। অনেকের আশঙ্কা এইভাবে চললে আর খুব বেশিদিন হয়তো লাদাখ কে আর মনমুগ্ধকর বলে মনে হবে না।

সঞ্জু সুর, নিজস্ব প্রতিনিধিঃ- লাদাখে প্রকৃতি তার চরম রূপে দেখা দিয়েছে। গত আগস্ট মাসে পুরো লাদাখ অঞ্চল জুড়ে রেকর্ড ভাঙা বৃষ্টিপাতের ফলে দেখা দিয়েছে আকস্মিক বন্যা, ভেঙেছে রাস্তা-সেতু, ভেসে গেছে বহু বাড়িঘর। ভারতীয় আবহাওয়া দফতরের (IMD) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর আগস্টে স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৯৩০% বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে লাদাখে। সাধারণত যেখানে প্রতিবছর এই আগস্ট মাসে এখানে গড়ে ৪.৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়, সেখানে এবার হয়েছে ৪৯.৫ মিলিমিটার। বারো গুণেরও বেশি।

এই নজিরবিহীন বর্ষণ দেখা গিয়েছে লেহ-কারগিল জুড়েও। লেহ জেলায় রেকর্ড হয়েছে ৫৫ মিমি বৃষ্টি, যেখানে গড় বৃষ্টিপাত হয় মাত্র ৫.৬ মিমি। অন্যদিকে, কারগিলে ২ মিমির জায়গায় এবারে হয়েছে বৃষ্টিপাত হয়েছে ৩২.৬ মিমি। অল্প সময়ের মধ্যে এত বেশি বৃষ্টিপাতে বহু স্থানে নেমে এসেছে পাহাড়ি ঝরনা, তৈরি হয়েছে নতুন জলধারা, যা ভাসিয়ে নিয়ে গেছে চাষের জমি ও বসতি। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে আকস্মিক বন্যায় ভেঙে গেছে সেতু, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সড়কপথ। লেহ-মানালি ও লেহ-শ্রীনগর হাইওয়ে, যা এই অঞ্চলের প্রধান লাইফলাইন, তা অনেক জায়গায় পর্যায়ক্রমে বন্ধ রাখতে হয়েছে। অনেক জায়গাতেই পর্যটকরা আটকে পড়েছেন, বহু গ্রামবাসী বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পড়েছেন। সেনাবাহিনী দিয়ে তাঁদের উদ্ধার করতে হয়েছে।

আবহবিদদের মতে, এই অস্বাভাবিক বৃষ্টির কারণ হলো দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু ও একাধিক পশ্চিমী ঝঞ্ঝার বিরল মিলন। IMD–এর এক আবহবিদ জানিয়েছেন—“লাদাখ সাধারণত মৌসুমি বৃষ্টির বাইরে থাকে। কিন্তু এবারে পশ্চিমী ঝঞ্ঝা ও মৌসুমি বায়ু একসঙ্গে সক্রিয় হওয়ায় স্বাভাবিকের তুলনায় বহু গুণ বেশি বৃষ্টি হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ ধরনের বিরল পরিস্থিতি ভবিষ্যতে আরও ঘন ঘন ঘটতে পারে।” জলবায়ু পরিবর্তনের এই সংকেত প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞদের মত, লাদাখের ভঙ্গুর পরিবেশব্যবস্থা ও সীমিত সম্পদসমৃদ্ধ অঞ্চলের জন্য এ ঘটনা বড় সতর্কবার্তা। দ্রুত হিমবাহ গলন, ভূমিধস, নদীর গতিপথ পরিবর্তনের মতো ঝুঁকি আগামী দিনে বেড়ে যাবে। পরিবেশবিজ্ঞানীদের বক্তব্য, “লাদাখের মতো শুষ্ক ও পাহাড়ি অঞ্চলে এত অতিরিক্ত বৃষ্টি একটি স্পষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের প্রমাণ। এখনই টেকসই পরিকাঠামোয় বিনিয়োগ না করলে বিপর্যয় আরও বাড়বে।”
লাদাখে এবারের অভিজ্ঞতা স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের সমস্যা নয়, বর্তমানের সংকট। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অবিলম্বে জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ, জরুরি সাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা এবং স্থানীয় মানুষকে সচেতন করা জরুরি। নইলে পাহাড়ি এই অঞ্চল ক্রমেই আরও অরক্ষিত হয়ে পড়বে।