পার্টি থেকে শেষযাত্রা, পুলিশের মারে ২২ বছরের যুবকের স্বপ্নের ছিন্নভিন্ন সমাপ্তি
জুলেখা নাসরিন, সাংবাদিক: মধ্যপ্রদেশের ভোপালের ইন্দ্রপুরীর নীরব রাতটা আচমকা দলবেঁধে চিৎকারে ভরে উঠেছিল উদিত আর তার বন্ধুদের। কিন্তু শনিবার ভোররাতে আচমকা নীরবতা, নিস্তব্ধতা নেমে এল সেখানে। পুলিশের মারে মৃত্যু হলো ২২ বছরের এক তরুণ ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্রের। মৃত ছাত্রের নাম উদিত কুমার গাইকি। পুলিশি নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। আর ভাইরালও হয়েছে সেই মুহূর্তের ভিডিও।

ঠিক কী ঘটনা ঘটেছিল একবার বলি আপনাদের। ইন্দ্রপুরীর সি সেক্টরে বন্ধুদের সঙ্গে পার্টি করছিলেন উদিত। সেখানে গণ্ডগোল হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়ার পরেই ঘটনাস্থলে যায় পুলিশ। উদিতের এক বন্ধু জানাচ্ছে, পুলিশ সেখানে যেতেই ভয়ে একটি অন্ধকার গলির দিকে পালিয়ে যান উদিত। দুই কনস্টেবল সন্তোষ বামানিয়া এবং সৌরভ আর্য, উদিতের পিছোনে ছুটে যান। কিছুক্ষণ পরেই উদিতের বন্ধুরা মার এবং চিৎকারের আওয়াজ পান। তাঁরা সেখানে গিয়ে দেখেন যে, উদিতের জামা খোলা এবং তাঁর মাথা-সহ শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাতের চিহ্ন। উদিতের আরও এক বন্ধুর দাবি, পুরো বিষয়টি মিটিয়ে দেওয়ার জন্য উদিতের কাছে ১০ হাজার টাকা চেয়েছিলেন ওই দুই কনস্টেবল। তা দিতে অস্বীকার করার জন্য তাঁকে মারধর করা হয়। যে ভিডিও ভাইরাল হয়েছে সেখানে দেখা যাচ্ছে, একজন পুলিশকর্মী উদিতকে ধরে রেখেধেন। আর অন্যজন নির্মমভাবে লাঠি দিয়ে উদিতকে মারছেন।

আপনাদের জানিয়ে রাখি উদিতের বাবা রাজ কুমার গাইকি মধ্যপ্রদেশের বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মী। তাঁর মা একজন শিক্ষিকা। তিন ভাই-বোনের মধ্যে উদিতই ছোট। বালাঘাটের ডিএসপি কেতন আদলকের শ্যালক ছিলেন উদিত।
উদিতের পরিবারের বক্তব্য, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পড়াশোনা শেষ করে সদ্য একটি সংস্থায় চাকরি পেয়েছিলেন উদিত। বৃহস্পতিবার তিনি বন্ধুদের সঙ্গে সেহোর গিয়েছিলেন কলেজ থেকে সার্টিফিকেট তুলতে। বন্ধুরা তার চাকরির আনন্দে পার্টির অনুরোধ করলে, সন্ধ্যেবেলা ছোট পার্টির আয়োজন করে সে। সেই পার্টিতেই আচমকাই হাজির হন স্থানীয় থানার দুই কনস্টেবল। প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, পুলিশ ওই পার্টি থেকে ১০ হাজার টাকা দাবি করে। উদিত ও তাঁর বন্ধুরা টাকা দিতে অস্বীকার করলে দুই কনস্টেবল ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। শুরু হয় বচসা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, উদিত প্রতিবাদ করতেই তাঁর জামা ছিঁড়ে দেওয়া হয়, এবং লাঠি দিয়ে বেধড়ক মারধর করা হয় তাঁকে। রক্তাক্ত উদিতকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান তার অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে ভোপাল এইমস-এ স্থানান্তর করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় সেখানেই মৃত্যু হয় তাঁর।
উদিতের বাবা রাজ কুমার গাইকি জানাচ্ছেন, ৯ অক্টোবর সন্ধ্যে বেলায় উদিতের সঙ্গে শেষবার কথা হয়েছিল তাঁর। এবং উদিত ফোনে তাঁর বাবাকে জানিয়েছিলেন, কলেজের একটি বিশেষ কাজে সে শহরে যাচ্ছে। কিন্তু সেখান থেকে সে দ্রুত ফিরে আসবে। শোকে বিহ্বল উদিতের বাবা বলছেন, তিনি বিশ্বাস করতেই পারছেন না যে, ওটাই ছিল তার ছেলের সঙ্গে শেষ কথা। ইতিমধ্যে উদিতের পোস্টমর্টেম রিপোর্টও এসেছে। যে রিপোর্টে উল্লেখ, গভীর চোটের কারণে মৃত্যু হয়েছে উদিতের। তার প্যানক্রিয়াসে গভীর আঘাত এবং সেখান থেকে ইন্টারনাল ব্লিডিং-এর ফলে ওই ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়ার মৃ্ত্যু হয়েছে বলে উল্লেখ ময়নাতদন্তের রিপোর্টে।
পুলিশের মারে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়ার মৃত্যুর খবরে উত্তাল হয়ে ওঠে এলাকা। স্থানীয়রা অভিযুক্ত পুলিশকর্মীর দাবিতে সরব হন। প্রতিবাদ বিক্ষোভও চলতে থাকে। ইতিমধ্যে সেখানকার জোন-২ এলাকার ডিসিপি বিবেক কুমার সিংয়ের নির্দেশে, সন্তোষ বামানিয়া এবং সৌরভ আর্য নামে অভিযুক্ত দুই কনস্টেবলকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। রবিবার তাদের আদেলতে পেশ করা হলে ১৪দিনের বিচারবিভাগীয় হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক। যদিও উদিতের পরিবার সিবিআই তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
বিজেপিশাসিত মধ্যপ্রদেশে তোলা না পেয়ে খোদ পুলিশ পিটিয়ে মারল এক হবু ইঞ্জিনিয়ারকে। এই ঘটনায় উত্তাল সেখানের রাজনীতি। গোটা ঘটনার জন্য মোহন যাদব সরকারকে তোপ দেগেছে বিরোধীরা। মধ্যপ্রদেশ প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি জিতু পাটওয়ারি বলেন, দুই পুলিশকর্মী এক যুবককে পিটিয়ে খুন করল। তার পরেও প্রশাসনের তরফে কোনও পদক্ষেপ করা হয়নি। এমনকি যুবকের পরিবারের সঙ্গে প্রশাসনের তরফে কেউ দেখা করেননি। বিজেপি সরকারের শাসনকালে মধ্যপ্রদেশের আইনশৃঙ্খলা অবস্থা তলানিতে ঠেকেছে। ভোপালের ঘটনা তা আবার তা প্রমাণ করে দিল। এই ঘটনায় সোশ্যাল মিডিয়ায় #JusticeForUdit এই দাবিতে সরব হয়েছে।