‘আমার সোনার বাংলা’-য় এ কেমন বিতর্ক!

বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে। অসমে মাত্র দু লাইন গেয়েই ভাষণ শুরু করলেন বিজেপি নেতৃত্বরা!

রিয়া হালদার, সাংবাদিক : বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান ‘আমার সোনার বাংলা’। স্বদেশ পর্যায়ের দেশাত্মবোধক এই গানে রবীন্দ্রনাথ বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর মাটির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক বর্ণনা করেছেন। সীমান্তের দুই প্রান্তের বাঙালিরাই আজও নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গানটি গেয়ে থাকেন। এমনকি ভারতের বিভিন্ন শহরের কিছু বাঙালি রেস্তোরাঁয়ও ‘আমার সোনার বাংলা’ নাম ব্যবহার করা হয়। আর সেই গান নিয়েই বিতর্ক।

যে গানটি গাওয়া নিয়ে বিতর্ক চরমে উঠেছে বিজেপি শাসিত অসম রাজ্যে। গত সোমবার বরাক উপত্যকায় বাংলাদেশ লাগোয়া জেলা শ্রীভূমিতে কংগ্রেসের এক সভা ছিল। যেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটির প্রথম দুই লাইন গেয়ে নিজের বক্তৃতা শুরু করেছিলেন অসমের বাঙালি অধ্যুষিত শ্রীভূমি জেলার বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা। বুধবার থেকে সেই সভার ১৯ সেকেন্ডের একটি ভিডিও শেয়ার করতে থাকেন বিজেপির নেতা-কর্মীরা। ওই ভিডিওতে দেখা যায় প্রবীণ কংগ্রেস নেতা, বিধুভূষণ দাস, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটির প্রথম দুই লাইন গাইছেন এবং তারপরে ‘বন্ধুগণ’ বলে তার ভাষণ শুরু করতে যাচ্ছেন। ব্যাস, ভিডিওটি সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, বিষয়টি অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার নজরে আসতেই পুরো জেলা কংগ্রেস কমিটির বিরুদ্ধে পুলিশি তদন্তের নির্দেশ দেন।

বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের এক শ্রেণির রাজনৈতিক নেতা এবং মহম্মদ ইউনূস যখন উত্তর-পূর্ব ভারত তাদের দেশের অংশ বলে প্রচ্ছন্নভাবে দাবি করছেন, সেরকমই একটা সময়ে দলীয় সভায় বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত গেয়ে কংগ্রেস আসলে বাংলাদেশি নেতাদের সেই ‘আখ্যান’কেই জোরদার করছে। কংগ্রেস নেতার গান পরিবেশনের ঘটনায় অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার নির্দেশ দিয়েছেন। কংগ্রেসের নেতাদের গ্রেফতারের হুঁশিয়ারি দিয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। এ বিষয়ে আসামের মন্ত্রী অশোক সিংহল এক্স হ্যান্ডলে লিখেছেন, “বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’ গাওয়া হলো কংগ্রেস সভায়। এটা সেই দেশের গান, যারা ভারতের উত্তর-পূর্ব আলাদা করতে চায়!” অর্থাৎ, বিজেপির প্রশ্ন, কংগ্রেসের সভায় কেন বাংলাদেশের গান গাওয়া হবে?

এমন পরিস্থিতে পাল্টা দিয়েছেন লোকসভার কংগ্রেস উপনেতা তথা প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি গৌরব গগৈ। তাঁর অভিযোগ, বিজেপি সব সময় বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে অপমান করে। কংগ্রেসের পক্ষ থেকে এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করা হয়েছে। ‘আমার সোনার বাংলা’ বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হওয়ার অনেক আগে লেখা হয়েছিল। এটি বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের প্রতীক, বিভেদের নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিজেপি একদিকে বাঙালি সংস্কৃতিকে অবমূল্যায়ন করে, আবার অন্যদিকে নির্বাচনী স্বার্থে বাঙালি ভাষাভাষী ভোটারদের ব্যবহার করে। আজ তাদের প্রতিক্রিয়া প্রমাণ করছে তারা রবীন্দ্রনাথের উত্তরাধিকার ও ঐতিহ্য সম্পর্কে অজ্ঞ।

বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত গাওয়াকে ঘিরে যখন বিতর্ক তুঙ্গে তখন ওই কংগ্রেস নেতার পাশে দাঁড়িয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মহুয়া মৈত্র। তাঁর বক্তব্য, ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯০৫ সালে ব্রিটিশদের বঙ্গভঙ্গ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি লিখেছিলেন। পরে গানটির প্রথম ১০টি লাইন বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল ১৯৭১ সালে। সব বাঙালির কাছে “আমার সোনার বাংলা’ গানটি একটি আবেগ। গেরুয়া শিবির এই বিষয়টি বুঝবে না।’

কংগ্রেস নেতা বিধুভূষণের দাবি, সেদিনের সভা শুরু করেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্রের লেখা ‘বন্দে মাতরম্’ গেয়ে, আর শেষে গাওয়া হয়েছিল ভারতের জাতীয় সংগীত ‘জন গণ মন অধিনায়ক’ দিয়ে। তবে বিতর্ক যাই হোক, অসম হোক বা অন্য কোনও রাজ্য রবীন্দ্রনাথের গান গাওয়া কি অপরাধ? রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে রাষ্ট্রদ্রোহিতা? কোনদিকে এগোচ্ছে সমাজ? যিনি ১৯১৩ সালে ঠাকুর তাঁর “অত্যন্ত সংবেদনশীল, সতেজ এবং সুন্দর” গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্যে প্রথম নোবেল প্রাইজ অর্জন করেছিলেন। তাঁর গান নিয়ে বিতর্ক? যাঁর দেশাত্মবোধক গান ২ বাংলার মানুষের কাছে আবেগ ও ভালোবাসার। তাঁর গান নিয়ে রাজনীতি ? ২ দেশেরই জাতীয় সংগীত রবীন্দ্রনাথের। ভারতে যদি তাঁর গান দেশপ্রেমের হয়। অপরদিকে, তাঁরই গান দেশদ্রোহের কিভাবে হতে পারে ? আপনারাই জানান কমেন্টে।