১৫ আসনে লড়েও মহাজোটের উপমুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী

জুলেখা নাসরিন, প্রতিনিধি : বিহারের রাজনীতি অধিকাংশ সময় প্রবাহিত হয় জাতপাত এবং বর্ণের উপর ভিত্তি করে। ক্ষমতায় আসতে গেলে এখানে কিছু সূক্ষ সমীকরন কাজ করে। আর সেই সমীকরনের অঙ্ক মেলাতে সব রাজনৈতিক দল জান-প্রাণ দিয়ে ল়ডে। কেউ আবার টৌপও দেয়। আবার অনেক সময় হর্স ট্রেডিং বিষয়টাও ঘটে। অর্থাৎ বিধায়ক কেনাবেচা। ২০২৫ সালে ২৪৩ আসনের বিহার বিধানসভায় ৬১ আসনে লড়াই করছে কংগ্রেস। ২০ আসনে লড়াই করছে সি পি আই এম এল। বামেরা লড়ছে ৩০ আসনে। কিন্ত এই দলের মধ্যে কোনও নেতা বা কারও নাম উপমুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসাবে ঘোষনা করা হয়নি। অথচ বিহার নির্বাচনে মাত্র ১৫ আসনে লড়াই করা মুকেশ সাহানির নাম উপমুখ্যমন্ত্রী পদে ঘোষণা করে দিল মহাজোট। কিন্তু কেন ? কেন এতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে মুকেশ সাহানিকে? কী রয়েছে বছর ৪৪ এর মুকেশের মধ্যে…সিনেমার সেট মেকার থেকে কীভাবে হয়ে উঠলেন রাজনীতির কিং মেকার…..
মাত্র ১৮ বা ১৯ বছর বয়সে দ্বারভাঙ্গার সুপৌল গ্রামের বাড়ি থেকে বন্ধুর সঙ্গে পালিয়েছিলেন মুকেশ সাহানি. উদ্দেশ্য ছিল দিল্লি যাবেন. কিন্তু ভাগ্য মুকেশের জন্য অন্য কিছু সাজিয়ে নিয়ে অপেক্ষা করছিল. স্টেশনে পৌঁছে মুকেশ দেখেন, দিল্লির ট্রেন আসার আগে সেখানে এসেছে মুম্বইয়ের ট্রেন. সাত-পাঁচ না ভেবে সেই ট্রেনেই চেপে বসেন মুকেশ ও তাঁর বন্ধু. প্রথমে কিছু দিন মুম্বইতে সেলস ম্যানের চাকরি করেন তিনি. তারপর বলিউডের সিনেমার জন্য সেট তৈরির ঠিকাদারি কাজ করেন. পরে নিজেই একটি সেট তৈরির সংস্থা খোলেন মুকেশ. শাহরুখের দেবদাস থেকে সলমনের বজরঙ্গী ভাইজানের সেট মুকেশের সংস্থার তৈরি করা. যে মানুষটা রিল লাইফে ফুঁটিয়ে তোলেন নানান আঁকিবুকি.. রাজনীতির চোরাগলিতে সেই মানুষটাই দাবার আড়াই চালের ঘোড়া.

বিকাশশীল ইনসান পার্টির নেতা বিকাশ সাহানি, মল্ল, সাহানি এবং নিষাদ সম্প্রদায়কে নতুন স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। যাদের ৯ শতাংশ ভোট জটিল রাজনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে. বছর ৪৪-এর মুকেশ কেবল ক্ষমতার জন্য আলোচনার কেন্দ্রে আসতে চান তা নয়, তিনি বিহারের জেলে ও নৌকা চালক সম্প্রদায়ের স্বীকৃতি এবং প্রতিনিধিত্বের প্রতিফলও বটে. ২০২৫-এর বিধানসভা নির্বাচনে নীতিশ কুমারের দুই দশকের সরকারকে হটিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর মসনদ দখল করতে তেজস্বী যাদবের প্রধান বাজি মুকেশ সাহানি. বিহারে জাতপাতের অঙ্কে মাল্লা সম্প্রদায়ের জনসংখ্যার ভাগ মাত্র ২.৬ শতাংশ. আর নিষাদ সম্প্রদায়ের জনসংখ্যার ভাগ ৯.৬ শতাংশ. মুকেশের বিকাশশীল ইনসান পার্টির ভরসায় তেজস্বী যাদব, রাহুল গান্ধীরা ৯.৬ শতাংশ ভোটের স্বপ্ন দেখছেন. তেজস্বী যাদবের মহাগঠবন্ধনে ১৪.২৭ শতাংশ যাদব, ১৭.৭ শতাংশ মুসলিম ভোট, ৫.২৬ শতাংশ হরিজন ভোট. সেই ভোটের সঙ্গে এই নিষাদ সম্প্রদায়ের ভোট যোগ হলে জাতপাতের অঙ্কে ভোটের হার প্রায় ৪৭ শতাংশের কাছাকাছি চলে যেতে পারে. সে কারনেই মুকেশকে এত পাত্তা দিচ্ছেন তেজস্বীরা.
রাজনীতিতে মুকেশ ‘মাল্লার পুত্র’ বা ‘সন অফ মাল্লা’ হিসেবে পরিচিত, কিন্তু তাঁর দল বিকাশশীল ইনসান পার্টি নিষাদ সম্প্রদায়ের দিকে ঝুঁকে রয়েছে। তার দলের ১৫ জনের মধ্যে ৮ জনই নিষাদ প্রার্থী. ফলে মুকেশের আফশোস, রাজনীতিতে তিনি ‘সন অফ মাল্লা’ হিসাবে পরিচিত না হয়ে ‘সন অফ নিষাদ’ হিসাবে পরিচিত হলে ভালো করতেন. নিষাদ সম্প্রদায়ে বিন্দ, বেলদার এবং কেওয়াতের মতো অনেক উপজাতি রয়েছে। অতএব, নিষাদের ৯ শতাংশের মধ্যে মাল্লা এবং সাহানি জনসংখ্যাও রয়েছে। সমাজবিজ্ঞানীরা সাহানি-নিষাদ-মল্ল সম্প্রদায়কে একত্রে ‘বর্ণ সংগঠন’বলে অভিহিত করেন. এই সম্প্রদায় বিহারে অত্যন্ত পিছিয়ে পড়া শ্রেণী হিসাবে বিবেচিত, যা বিহারের মোট জনসংখ্যার ৩৬.০১ শতাংশ। মল্ল সম্প্রদায় বিহার জুড়ে কিছু জেলায় ছড়িয়ে রয়েছে. বিশেষ করে উত্তর বিহারে, মাল্লাদের উল্লেখযোগ্য প্রভাব লক্ষ্য করা যায়. পাটনা থেকে উত্তরে বৈশালী, মুজাফফরপুর, দারভাঙ্গা এবং মধুবনিতে মল্ল সম্প্রদায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভোট ব্যাঙ্ক।

মুকেশ জীবনে একটিও নির্বাচনে জয়ী হননি, তবে বিহারের রাজনীতিতে তাঁর উত্থান নজরকাড়া। ২০১৫ সালে বিহার নির্বাচনে তাঁকে প্রথম বিজেপির হয়ে প্রচারে করতে দেখা যায়, ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে তিনি আর.জে.ডি শিবিরে যোগ দেন। যদিও তাঁর দল তিনটি আসনেই হেরে যায়। ২০২০ সালের অক্টোবরে তেজস্বী যাদবের সাংবাদিক সম্মেলন থেকে বেরিয়ে এসে বিধানসভা নির্বাচনের মাত্র এক মাস আগে এন.ডি.এ-তে যোগ দেন মুকেশ। বিজেপি তাদের এনডিএ কোটা থেকে মুকেশের দলকে ১১টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ দেয়। মাত্র চারটি আসনে জয়লাভ করে মুকেশের দল। যদিও মুকেশ নিজে হেরে যান। ২০২০ সালে বিধানসভা নির্বাচনে নিজের আসন থেকে হেরে যাওয়ার পরেও বিজেপির সুপারিশে মুকেশকে নীতিশ সরকারে মন্ত্রীত্ব দেওয়া হয়েছিল। উচ্চাকাঙ্খী মুকেশ বিহারের বাইরেও নিজের ছাপ রাখতে চেয়েছিলেন. উত্তরপ্রদেশে কোনও উপস্থিতি না থাকা সত্ত্বেও ২০২২ সালে উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনে প্রায় ৫০টি আসনে প্রার্থী দিয়েছিলেন মুকেশ। যদিও সব প্রার্থী হেরে যান। অনেকের আবার জামানত বাজেয়াপ্ত হয়।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথকে কটাক্ষ করার অভিযোগে মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার ২০২২ সালে বিহার মন্ত্রিসভা থেকে মুকেশকে বরখাস্ত করেন। সেই সময় তিনি পশুপালন ও মৎস্যমন্ত্রী ছিলেন. এরপর কিছুটা শক্তিহীন হয়ে পড়েন মুকেশ. এহেন মুকেশের শেষ মুহূর্তে পাল্টি খাওয়ার ইতিহাস রয়েছে. ২০২০ সালের শুরুতে মহাজোটের অংশ ছিল মুকেশের দল বিকাশশীল ইনসান পার্টি বা ভিআইপি। আসনরফা পছন্দ না হওয়ায় শেষ মুহূর্তে যোগ দেন এনডিএ-তে।
শেক্সপিয়ারের ম্যাকবেথ চরিত্রের কথা মনে আছে. ম্যাকবেথের অনিয়ন্ত্রিত এবং দুঃসাহসিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা তাঁকে পতনের দিকে পরিচালিত করেছিল, বিহারের রাজনীতির ক্রমবর্ধমান পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপট, মুকেশের উচ্চাকাঙ্ক্ষা, বিশ্বাসঘাতকতা এবং ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা একটি নাটকীয় চিত্রনাট্যের মতো ফুটে উঠেছে। তবে সাহানির হঠাৎ উত্থান মাল্লা সম্প্রদায়ের মানুষের মনে আশার সঞ্চার ঘটিয়েছেন. তবে তার কিছু হঠকারী সিদ্ধান্ত তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলতেও পারে.