জেলমুক্তির পরেই এবার কি বিবাহ বন্ধনে পার্থ ?

অর্পিতাকে নিয়ে আর কোন রাখঢাক নেই প্রকাশ্যেই স্বীকৃতি দিলেন বান্ধবীকে এবারেই কি এক হবে চার হাত?

সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, সাংবাদিক : আজ থেকে প্রায় সাড়ে তিন বছর আগে গোটা বাংলার মানুষের চক্ষু চড়ক গাছ হয়ে গিয়েছিল, প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বান্ধবী অর্পিতার বাড়ি থেকে উদ্ধার হয়েছিল কোটি কোটি টাকা, খাটের নীচে বাথরুমে সেই টাকার পাহাড় দেখে কতই না মিম তৈরি হয়েছিল  অর্পিতার দু’টি ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হয় ৫০ কোটি টাকা নগদ। পার্থ ও অর্পিতা, দু’জনেরই অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা হয়।এরপরের ঘটনা সবাইই জানেন, নিয়োগ দুর্নীতিতে গ্রেফতার হন পার্থ, বাদ যাননি অর্পিতাও। বলা হয় পার্থ চট্টোপাধ্যায় রাজ্যের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ দুর্নীতির খলনায়ক। প্রাথমিক, উচ্চপ্রাথমিক, গ্রুপ সি-গ্রুপ ডি নিয়োগ নিয়ে ভুরিভুরি অভিযোগ, বান্ধবীর ফ্ল্যাট থেকে কোটি কোটি টাকা উদ্ধার, বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, আলিপুর জেল থেকে হাসপাতাল নিত্য যাতায়াত, এজলাসে বান্ধবী অর্পিতার সঙ্গে কথোপকথন, জামিন চেয়ে কান্না, শুনানি চলাকালীন পার্থের উদ্দেশ্যে অর্পিতার লাভ সাইন দেখানো— শেষ তিন বছরে খবরের ঘনঘটা তাঁকে ঘিরেই। মন্ত্রিত্ব খোয়াতে হয় পার্থকে। ২০২২ সালের ২৮ জুলাই তৃণমূল কংগ্রেস দল থেকে পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে সাসপেন্ড করা হয়। যতদিন নিয়োগ দুর্নীতির তদন্ত চলবে, ততদিন পার্থ দল থেকে সাসপেন্ড বলে জানানো হয় তৃণমূল কংগ্রেসের তরফে। জেলবন্দি থাকাকালীনও একের পর এক খবর লেখা হয়েছে পার্থকে নিয়ে। প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগারে কখনও পার্থের নিঃসঙ্গতা, কখনও টিভি দেখার আবদার, কখনও জেল কর্তৃপক্ষের অনুমতিতে সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়, সুচিত্রা ভট্টাচার্য, বুদ্ধদেব গুহ-র উপন্যাস পড়া শুরু করেন প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী। তবে সংশোধনাগারে থাকলেও অর্পিতা পার্থকে বেশ মিস করতেন। আলাদা থাকার দরুণ দূরত্ব বেড়েছে তবে টান কমেনি। হাজতবাসে একে অপরের থেকে দূরে থাকলেও তা কিন্তু কখনই ‘অপার’ বাঁধনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। কখনও ভার্চুয়াল হেয়ারিংয়ে ঠোঁটের ইঙ্গিত। কখনও সবার সামনে সাহসী যুবকের মতো হার্ট সাইন। দুর্নীতির অভিযোগ, কোটি-কোটি টাকা উদ্ধার, মন্ত্রিত্ব হারানো, কারাবাসের মতো হাজারো কেলেঙ্কারির মাঝে একটিই জিনিস ধ্রুবক থেকেছে তা হল এই মনের টান বারবার মিলেছে তার নিদর্শন। শুনানি চলাকালীন ভার্চুয়াল স্ক্রিনে একে অপরকে দেখেই মুচকি হেসেছেন পার্থ-অর্পিতা। ব্যাঙ্কশাল কোর্টে স্ক্রিনের ওপার থেকেই হার্ট সাইন দেখান পার্থ।

প্রাক্তন মন্ত্রীর ইশারা দেখে অর্পিতারও মুখে ফুটে ওঠে হাসি। আবার পার্থর ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি দেখিয়েও পাল্টা ইশারা করেন অর্পিতা। আসলে প্রেমে পড়লে মানুষ ফোন-মেসেজে অপরজনের খোঁজ নেন, ‘খেয়েছ?’ ঠিক যেন সেভাবেই অর্পিতা খেয়েছেন কিনা তার খোঁজ নেন পার্থ। চলে জিভ ভেংচির খেলাও। হেসে ফেলেন অর্পিতা। কোর্টের কচকচানির মাঝেই যেন দুজনের মনে বেজেছিল প্রেমের গিটার, দেখান হার্ট সাইনও, কিভাবে পার্থর মনের হদিশ পেলেন অর্পিতা? তিনি নাকি পেশায় অভিনেত্রী। তাঁর ফেসবুক প্রোফাইলে সেই কথা লেখা রয়েছে। বেশ কয়েকটা সিনেমায় অভিনয় করেছেন তিনি। এছাড়া সেই সময় তিনি নাকতলা উদয়ন সঙ্ঘের ব্র্যান্ড অ্য়াম্বাসাডর ছিলেন বলে জানা গিয়েছে। ওই পুজো পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের পুজো বলেই পরিচিত। পার্থ-অর্পিতাকে দুর্গাপুজো-সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এক সঙ্গে দেখা গিয়েছে। তাঁর ছবি দিয়ে পার্থের পৃষ্ঠপোষণায় সেই পুজোর পোস্টার, ফেস্টুনও করা হয়েছিল। গুরুপূর্ণিমার দিন পার্থকে গুরু হিসেবে সম্বোধন করে, পার্থের ছবি দিয়ে ফেসবুকে একটি পোস্ট করেন অর্পিতা। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, ‘শুধু অক্ষরজ্ঞানই নয়, গুরু শিখিয়েছেন জীবনজ্ঞান, গুরুমন্ত্রকে আত্তীকরণ করা সাগর পেরিয়ে যাও। শুভ গুরুপূর্ণিমা। এখান থেকেই দুজনের ঘনিষ্ঠতা বাড়ে, আর সেই ঘনিষ্ঠতা এমন জায়গাতেই পৌঁছে যায় যে পার্থর মন দখল করে ফেলেন অর্পিতা। কিন্তু এই যে অর্পিতার দুই ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হয়েছিল কোটি কোটি টাকা সেই টাকা আসলে কার? পার্থর? অর্পিতার? নাকি নিয়োগ দুর্নীতিরই টাকা? পার্থ বলেছিলেন, ওই টাকা তাঁর নয়। তবে এর থেকে বেশি কিছু ভাঙেননি। তবে অর্পিতা দাবি করেছিলেন, তাঁর ফ্ল্যাট থেকে যে পরিমাণ নগদ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে,তার সবটাই পার্থের। অর্পিতা এও দাবি করেছিলেন যে, বাড়িতে কত টাকা রাখা আছে তা তিনি জানতেন না। পার্থের কর্মীরা মাঝেমধ্যেই এসে টাকা রেখে দিতেন বলেও দাবি করেছিলেন। শুধু তাই-ই নয়, যেখানে টাকা রাখা হত, সেই ঘরে তাঁর কোনও প্রবেশাধিকার ছিল না বলেই দাবি করেছিলেন অর্পিতা। এর পর একাধিক বার এই প্রশ্ন তাদের করা হলেও উত্তর বদলায়নি। পার্থ বলেছেন কার টাকা খুঁজে বার করুন। এর পর শুনানির পর শুনানি হয়েছে, মানুষ ভেবেছেন একদিন ওদের জামিন হবে শুধু জানা যাবে না এই বিপুল টাকা কিসের? আর সত্যিই কিন্তু তাই হয়েছে। গত বছরের শেষ দিকে জামিন পান অর্পিতা, পাঁচ লক্ষ টাকার বন্ডের বিনিময়ে অর্পিতাকে জামিন দেওয়া হয়।

আর এবার জেলমুক্তি পার্থেরও। পার্থ যেদিন বাড়ি ফিরলেন সেদিন তার বাড়ির সামনে ভিড়, মানুষ হাতে প্ল্যাকার্ড ইত্যাদিন নিয়ে দাঁড়িয়ে, বাড়ি ফিরে পোষ্য কুকুরের গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে আবেগপ্রবণ পার্থ। আর এর মধ্যেই কোন রাখঢাক না করে অর্পিতাকে নিয়ে মুখ খুলে বসলেন তিনি। পার্থ বলেন, “অর্পিতা আমার বান্ধবী। তাতে অসুবিধে কী আছে? লোকের ২টো বউ থাকতে পারে। আমার বান্ধবী থাকতে পারে না? যাঁরা এটা নিয়ে বিদ্রুপ করেছেন, তাঁদের প্রতি সহানুভূতি রইল। পার্থের কথায়, ‘‘একজন মহিলাকে অসম্মান করা তো খুব সহজ। আমার স্ত্রী প্রয়াত। তার পরে কোনও মহিলা যদি আমার সঙ্গে পারিবারিক বন্ধুত্ব করতে চান, সে ক্ষেত্রে কি কারও কোনও আপত্তি থাকতে পারে? অর্পিতার পরিচয় তো শুধু আমার বান্ধবী নয়! সে অভিনেত্রী, ৩০-৩৫টি ওড়িয়া ছবিতে কাজ করেছে। দিনের পর দিন যে ভাবে তাঁকে অসম্মান করা হয়েছে, তা অন্যায়।রইল। নিন্দুকদের দাবি, দুই বউ বক্তব্যে পার্থর নিশানায় ছিলেন কলকাতার প্রাক্তন মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায় এবং তাঁর বান্ধবী বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়, আর এই কথা শুনে চুপ থাকেননি বৈশাখীও। ইট ছুঁড়েছিলেন পার্থ চট্টোপাধ্যায়।

পাল্টা পাটকেল ধেয়ে এল বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়ের তরফে। পার্থর উদ্দেশে বৈশাখীর কটাক্ষ, “শোভন বান্ধবীর জন্য দলের পদ ছেড়েছিল। আর উনি বান্ধবীর বাড়িতে টাকা জড়ো করে করেছেন। পার্থক্য আছে বৈশাখীর কটাক্ষ, পার্থ ভালো মানুষ হতে পারেননি। তবে এতদিনে যে পুরুষ হয়ে দাঁড়াতে পেরেছেন, সেজন্য তাঁর সাধুবাদ প্রাপ্য। এলআইসি ফর্মে তো আঙ্কেল, নিস হিসাবে পরিচয় দিয়েছিলেন। সংশোধনাগারে গিয়ে নিজেকে সংশোধন করেছেন। বন্ধু হয়ে দাঁড়িয়েছেন। উনি মানুষ না হলেও পুরুষ হয়েছেন তার জন্য সংগ্রামী অভিনন্দন। এই মুহূর্তে কিন্তু নতুন করে সত্যিই পার্থ অর্পিতা নয়া সেনসেশন। যেভাবে সাড়ে তিন বছর পর বাড়ি ফিরেই অর্পিতাকে স্বীকৃতি দিলেন তিনি তাতে করে আগামী বছরেই যদি চারহাত চারচোখের মিলন ঘটে খুব একটা আশ্চর্যের কিন্তু কিছু নেই। তবে সবটাই তো জল্পনা সবটাই তো সম্ভাবনা, আসলে অপা কি চায় সে কি আর সাধারণ মানুষ বলতে পারে!