অনিল আম্বানিকে ‘ফ্রড’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, সেই রিপোর্ট নিয়েই এবার গুরুতর প্রশ্ন তুলল আদালত।

সূচনা পল্যে, সাংবাদিক: ব্যাঙ্ক প্রতারণা মামলায় বড় স্বস্তি অনিল আম্বানির। বম্বে হাইকোর্ট বুধবার এক গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশে ব্যাঙ্ক অফ বরোদা, আই-ডি-বি-আই ব্যাঙ্ক এবং ইন্ডিয়ান ওভারসিজ ব্যাঙ্ককে অনিল আম্বানির বিরুদ্ধে আপাতত কোনও কড়া পদক্ষেপ না নিতে বলেছে। এই নির্দেশের ফলে আপাতত স্বস্তি পেলেন রিলায়েন্স গ্রুপের চেয়ারম্যান অনিল আম্বানি। কারণ, যেই ফরেন্সিক অডিট রিপোর্টকে ভিত্তি করে তাঁকে ‘ফ্রড’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, সেই রিপোর্ট নিয়েই এবার গুরুতর প্রশ্ন তুলল আদালত।
বিষয়টি কী?
২০২০ সালে একটি ফরেন্সিক অডিট রিপোর্ট তৈরি করেছিল BDO LLP নামে একটি সংস্থা। এই রিপোর্টের উপর ভিত্তি করেই সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্কগুলি অনিল আম্বানির বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ এনে ব্যবস্থা নেওয়ার পথে হাঁটছিল। কিন্তু বম্বে হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই রিপোর্ট আইনি ভাবে গ্রহণযোগ্য কি না, তা নিয়েই বড় প্রশ্ন রয়েছে। বার অ্যান্ড বেঞ্চের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিচারপতি মিলিন্দ যাদব এই অডিট রিপোর্ট নিয়ে কড়া প্রাথমিক মন্তব্য করেছেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ- BDO LLP যে রিপোর্ট দিয়েছে, তাতে এমন কোনও চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের স্বাক্ষর নেই, যাঁর RBI নিয়ম অনুযায়ী ‘ফরেন্সিক অডিট করে প্রতারণা নির্ধারণ করার যোগ্যতা’ রয়েছে। অর্থাৎ, রিপোর্টটি তৈরি করেছে এমন এক সংস্থা, যারা মূলত একটি accounting consultant firm- কিন্তু তারা ICAI-র নথিভুক্ত চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফার্ম নয়। এই বিষয়টাই হয়ে উঠেছে মামলার মূল টার্নিং পয়েন্ট। আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, RBI-র গাইডলাইন অনুযায়ী, কোনও ব্যাঙ্ক যদি কাউকে ‘fraud’ ঘোষণা করতে চায়, তাহলে সেই সিদ্ধান্ত অবশ্যই এমন ফরেন্সিক অডিটের উপর ভিত্তি করে হতে হবে, যেখানে স্বীকৃত চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের স্বাক্ষর থাকবে। নন-চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট বা কনসালট্যান্ট সংস্থার রিপোর্টের উপর দাঁড়িয়ে কাউকে ফ্রড ঘোষণা করা যায় না। এই যুক্তিতেই হাইকোর্ট ব্যাঙ্কগুলিকে আপাতত কড়া পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছে। এখানে উল্লেখযোগ্য, অনিল আম্বানির আইনজীবীরা আদালতে সাফ জানিয়ে দেন-
BDO LLP কোনওভাবেই ICAI-র রেজিস্টার্ড চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফার্ম নয়
তারা কেবল একটি accounting consultant firm
তাই তাদের রিপোর্টকে আইনত ফরেন্সিক অডিট হিসেবে ধরা যায় না
এই যুক্তি মেনেই আদালত আপাতত স্থগিতাদেশ দেয়। তবে আদালত এটাও স্পষ্ট করেছে, এটি চূড়ান্ত রায় নয়। শুধু প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যাঙ্কগুলির পদক্ষেপের উপর আপাতত নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন উঠছে- এর মানে কি অনিল আম্বানি পুরোপুরি নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে গেলেন? আইনজ্ঞদের মতে, একেবারেই নয়। এই আদেশের মানে শুধুমাত্র এতটাই- যে প্রক্রিয়ায় তাঁকে ফ্রড ঘোষণার পথে হাঁটা হচ্ছিল, সেই প্রক্রিয়ায় ত্রুটি রয়েছে। অর্থাৎ, ভবিষ্যতে যদি ব্যাঙ্কগুলি নিয়ম মেনে, RBI-র গাইডলাইন অনুসারে নতুন করে ফরেন্সিক অডিট করায়, তাহলে আবার পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। কিন্তু আপাতত এই মুহূর্তে, ব্যাঙ্ক অফ বরোদা, আইডিবিআই ব্যাঙ্ক এবং ইন্ডিয়ান ওভারসিজ ব্যাঙ্ক- এই তিন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক অনিল আম্বানির বিরুদ্ধে কোনও কড়া ব্যবস্থা নিতে পারবে না। এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল-
ব্যাঙ্ক প্রতারণা হিসেবে কাউকে চিহ্নিত করা হলে তার প্রভাব অত্যন্ত গুরুতর হয়।
ফ্রড ঘোষণার অর্থ
ঋণ পাওয়া কার্যত অসম্ভব হয়ে যায়
ব্যবসায়িক লেনদেনে বড় বাধা আসে
এমনকি ভবিষ্যতের কর্পোরেট কার্যকলাপও প্রায় অচল হয়ে পড়ে
সেই কারণেই এই মামলাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আদালত যে বিষয়টি সামনে এনেছে, তা হল- ফরেন্সিক অডিটের মান ও বৈধতা। কে অডিট করবে, কী যোগ্যতায় করবে, এবং কোন নিয়মে রিপোর্ট তৈরি হবে- এই প্রশ্নগুলোই এখন কেন্দ্রবিন্দুতে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পর্যবেক্ষণ ভবিষ্যতে আরও বহু ব্যাঙ্ক প্রতারণা মামলায় দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে। কারণ, বহু ক্ষেত্রেই ব্যাঙ্কগুলি বাইরের কনসালট্যান্ট সংস্থার রিপোর্টের উপর নির্ভর করে বড় সিদ্ধান্ত নেয়। এই রায়ের ফলে সেই প্রক্রিয়া আরও কঠোর আইনি পরীক্ষার মুখে পড়বে। এদিকে অনিল আম্বানির আইনজীবীরা আদালতে দাবি করেছেন, এই মামলায় তাঁর মক্কেলের বিরুদ্ধে কোনও ইচ্ছাকৃত প্রতারণার প্রমাণ নেই। তাঁদের বক্তব্য, ব্যবসায়িক ব্যর্থতা আর প্রতারণা- এই দুটো বিষয়কে এক করে দেখা যায় না। তাঁদের আরও দাবি, শুধুমাত্র একটি ত্রুটিপূর্ণ অডিট রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে কাউকে অপরাধী হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া সংবিধান বিরোধী। এই মামলার পরবর্তী শুনানি কবে হবে, তা আদালত পরে জানাবে। ততদিন পর্যন্ত ব্যাঙ্কগুলির উপর জারি থাকছে হাইকোর্টের নির্দেশ। সব মিলিয়ে বলা যায়, বহু চর্চিত ব্যাঙ্ক প্রতারণা মামলায় আপাতত বড় স্বস্তি পেলেন অনিল আম্বানি। তবে লড়াই এখানেই শেষ নয়। আইনি লড়াই চলবে, এবং পরবর্তী শুনানিতেই স্পষ্ট হবে- এই মামলার ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাচ্ছে। এই মুহূর্তে একটাই কথা নিশ্চিত- বম্বে হাইকোর্টের এই পর্যবেক্ষণ ব্যাঙ্কিং সেক্টর ও ফরেন্সিক অডিট ব্যবস্থার ওপর বড় প্রভাব ফেলতে চলেছে।