২০২৪ সালের ৩১ মার্চ – দেশে মোট এটিএম ছিল ২ লক্ষ ৫৩ হাজার ৪১৭টি । ২০২৫ সালের ৩১ মার্চ – সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ২ লক্ষ ৫১ হাজার ০৫৭-এ

সূচনা পল্যে, সাংবাদিক : ডিজিটাল লেনদেন যত বাড়ছে, ততই বদলে যাচ্ছে দেশের ব্যাঙ্কিং মানচিত্র। নগদ টাকার ব্যবহার কমছে, বাড়ছে ইউপিআই আর মোবাইল ব্যাঙ্কিংয়ের দাপট। তারই সরাসরি প্রভাব পড়ছে এটিএম পরিষেবার উপর।
রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে, দেশে এটিএমের সংখ্যা কমছে। যদিও একই সঙ্গে বাড়ছে ব্যাঙ্ক শাখার সংখ্যা। ঠিক কী বলছে আরবিআই-এর রিপোর্ট? কেন বন্ধ হচ্ছে এটিএম? আর ভবিষ্যতে গ্রাহকদের উপর এর প্রভাবই বা কী হতে চলেছে?

আরবিআই রিপোর্ট কী বলছে?
রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের রিপোর্ট অনুযায়ী, গত এক বছরে দেশে এটিএমের সংখ্যা কমেছে প্রায় ২,৩৬০টি।
২০২৪ সালের ৩১ মার্চ – দেশে মোট এটিএম ছিল ২ লক্ষ ৫৩ হাজার ৪১৭টি
২০২৫ সালের ৩১ মার্চ – সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ২ লক্ষ ৫১ হাজার ০৫৭-এ
অর্থাৎ, সংখ্যার বিচারে পতন খুব বড় না হলেও এই প্রবণতা তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।
কোন ব্যাঙ্কে কতটা কমল এটিএম?
রিপোর্ট অনুযায়ী- বেসরকারি ব্যাঙ্কগুলির এটিএম কমেছে সবচেয়ে বেশি।
২০২৪ সালে – যেখানে সংখ্যা ছিল ৭৯,৮৮৪
২০২৫ সালে – তা নেমে এসেছে ৭৭,১১৭-এ
রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাঙ্কগুলির এটিএমও কমেছে।
আগে ছিল – ১ লক্ষ ৩৪ হাজার ৬৯৪টি
এখন কমে হয়েছে – ১ লক্ষ ৩৩ হাজার ৫৪৪টি
তবে একটি ব্যতিক্রমও রয়েছে। ব্যাঙ্কের বাইরে স্বাধীনভাবে পরিচালিত, অর্থাৎ থার্ড পার্টি সংস্থার এটিএমের সংখ্যা সামান্য বেড়েছে। সবমিলিয়ে দেশের এটিএম নেটওয়ার্কে ধীরে হলেও সঙ্কোচনের প্রবণতা স্পষ্ট।
কেন কমছে এটিএম?
রিজার্ভ ব্যাঙ্ক নিজেই জানিয়েছে, এটিএমের সংখ্যা করে যাওয়ার পিছনে প্রধান কারণ হল – ডিজিটাল লেনদেনের দ্রুত বৃদ্ধি। বর্তমানে-
ইউপিআই, মোবাইল ব্যাঙ্কিং, ইন্টারনেট ব্যাঙ্কিং, ডিজিটাল ওয়ালেট। এই সব মাধ্যম ব্যবহার করেই মানুষ দৈনন্দিন কেনাকাটা থেকে শুরু করে বড় অঙ্কের লেনদেন সেরে ফেলছেন। ফলে নগদ টাকা তোলার প্রয়োজন আগের তুলনায় অনেকটাই কমেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটিএম চালানো ব্যাঙ্কগুলোর জন্য যথেষ্ট ব্যয়বহুল। কারণ-
এটিএম বসানোর খরচ, ভাড়া, নিরাপত্তা, টাকা ভরার খরচ, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রযুক্তিগত আপডেট।
সব মিলিয়ে অনেক এটিএম অলাভজনক হয়ে উঠছে। বিশেষ করে অফসাইট এটিএম, অর্থাৎ ব্যাঙ্ক শাখার বাইরে থাকা এটিএমগুলো বন্ধ করছে বহু বেসরকারি ব্যাঙ্ক। এর বদলে তারা গ্রাহকদের ডিজিটাল মাধ্যমে লেনদেনে উৎসাহিত করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটিএম কমার পেছনে বড় কারণ গ্রাহকদের আচরণগত পরিবর্তন। আজ স্মার্টফোন থাকলেই দোকানে কেনাকাটা, বিল পেমেন্ট, টাকা পাঠানো, রিচার্জ, সবই সম্ভব।
ফলে নগদ টাকা তোলার প্রয়োজন অনেক ক্ষেত্রেই পড়ছে না। এই পরিবর্তিত অভ্যাসই ব্যাঙ্কগুলিকে তাদের পরিকাঠামো নতুনভাবে সাজাতে বাধ্য করছে।
কিন্তু শাখা বাড়ছে কেন?
এখানেই রয়েছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। যেখানে এটিএম কমছে, সেখানে ব্যাঙ্ক শাখার সংখ্যা কিন্তু বাড়ছে। আরবিআই জানাচ্ছে, ২০২৫ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত দেশে বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কের মোট শাখার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লক্ষ ৬৪ হাজার। এক বছরে এই সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ২.৮ শতাংশ। এই শাখা বৃদ্ধির মূল ভরকেন্দ্র- গ্রামীণ ও আধা-শহর এলাকা। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিই সেখানে বেশি করে নতুন শাখা খুলছে।
রিপোর্ট অনুযায়ী- বেসরকারি ব্যাঙ্কগুলি মূলত শহরাঞ্চল ও মহানগরেই নতুন শাখা খুলছে। আর সরকারি ব্যাঙ্কগুলি জোর দিচ্ছে গ্রাম ও আধা-শহর এলাকায় আর্থিক অন্তর্ভুক্তির উপর। অর্থাৎ ডিজিটাল লেনদেন বাড়লেও, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাঙ্কিং পরিষেবা পৌঁছে দিতে শাখাভিত্তিক পরিকাঠামো এখনও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে আরবিআই।
সবমিলিয়ে বলা যায়- ডিজিটাল বিপ্লব দেশের ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার চেহারা বদলে দিচ্ছে। একদিকে কমছে এটিএমের প্রয়োজন, অন্যদিকে বাড়ছে অনলাইন লেনদেনের ওপর নির্ভরতা। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের রিপোর্ট স্পষ্ট করে দিচ্ছে- ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রসারের কারণেই গ্রাহকদের এটিএমের উপর নির্ভরতা কমছে, আর সেই কারণেই ব্যাঙ্কগুলিও ধীরে ধীরে এটিএম সংখ্যা কমাচ্ছে। তবে একই সঙ্গে গ্রামীণ ও আধা-শহর এলাকায় শাখা বাড়িয়ে আর্থিক পরিষেবাকে আরও বিস্তৃত করার চেষ্টাও চালাচ্ছে ব্যাঙ্কগুলি। ডিজিটাল ভারত-এর পথে হাঁটতে গিয়ে ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থায় এই রূপান্তর যে ভবিষ্যতে আরও গভীর হবে, তা বলাই বাহুল্য। নগদের জায়গা নিচ্ছে প্রযুক্তি- আর সেই পরিবর্তনের ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠছে দেশের এটিএম মানচিত্রেও।