ফিরল আমেদাবাদ বিমান দুর্ঘটনার স্মৃতি। ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যু হল মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী অজিত পওয়ার-সহ ৬ জনের। গঠন করা হল তদন্ত কমিটি।

সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, সাংবাদিক : মহারাষ্ট্রের বারামতিতে ভেঙে পড়ল মহারাষ্ট্রের উপ-মুখ্যমন্ত্রী অজিত পাওয়ারের বিমান। অবতরণের সময়েই বিমানটি ভেঙে পড়ে বলে খবর। ওই প্রাইভেট বিমানে এনসিপি নেতার সঙ্গে ছিলেন আরও ছয় জন। বিমানটি ভেঙে পড়ার পরই তাতে আগুন ধরে যায়। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় চলছে উদ্ধার কাজ। বিমান দুর্ঘটনায় ৬৬ বছর বয়সি অজিত পাওয়ারের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের তালিকায় রয়েছেন এনসিপি নেতার দুই নিরাপত্তাকর্মী, দু’জন বিমানকর্মী যারা হলেন এক জন পাইলট, অপর জন ফার্স্ট অফিসার। আর এই দুর্ঘটনা ফেরাল গত জুন মাসের ভয়াল আমেদাবাদ দুর্ঘটনার স্মৃতি।গত ১২ জুন দুপুর ১টা ৩৯ মিনিটে সরদার বল্লভভাই প্যাটেল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে ২৩ থেকে টেক অফ করে এআই-১৭১ নামের ফ্লাইটটি অফের কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্রু ‘মে ডে’ কল পাঠায়, যা সাধারণত চরম বিপদের সংকেত। এরপর আর যোগাযোগ করা যায়নি ককপিটের সঙ্গে। ৬২৫ ফুট উচ্চতায় পৌঁছেই সিগন্যাল হারিয়ে ফেলে বিমানটি এবং দ্রুত নীচে নেমে আসে। উড়ানের প্রায় ৯ মিনিটের মাথায় মেঘানিনগরের একটি মেডিক্যাল হস্টেলে মুখ থুবড়ে পড়ে। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি অজিত পওয়ারের ক্ষেত্রেও ঘটল।

বারামতী বিমাবন্দরে অবতরণের কথা ছিল অজিত পাওয়ারের চার্টার্ড ফ্লাইটটি। কিন্তু তার আগেই জরুরি অবতরণের অনুমতি চেয়েছিলেন পাইলট। মে ডে কল করেন আর এর থেকেই সন্দেহ করা হচ্ছে, বিমানে কোনও যান্ত্রিক ত্রুটি হয়েছিল কিনা। বিমানটি অবতরণের ঠিক আগেই ভেঙে পড়ে সেই রিমোট এলাকায়। সামনের দিকে আগুন লেগে সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়ে গেছে। বিমানের পিছনের লেজের কিছু অংশ দেখা যাচ্ছে। গোটা এলাকা কালো ধোঁয়ায় ঢেকে গেছে। ঘটনাস্থলের ছবি ও ভিডিওতে দেখা গেছে, বিমানটি দাউদাউ করে জ্বলছে এবং দমকলের কর্মীরা আগুন নেভানোর চেষ্টা করছেন। বিকট শব্দ পেয়েই দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছয় পুলিশ, দমকল ও অন্যান্য জরুরি পরিষেবার দল। স্থানীয় বাসিন্দারাও ছুটে যান দুর্ঘটনাস্থলের দিকে। তবে আগুনের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে প্রাথমিকভাবে উদ্ধারকাজে নামা কঠিন হয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বিকট শব্দ শুনে তাঁরা ঘটনাস্থলে পৌঁছন এবং জ্বলন্ত বিমানের ধ্বংসাবশেষ দেখতে পান। আগুনের কারণে কাছে গিয়ে সাহায্য করার কোনও সুযোগই ছিল না। তবে পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় উদ্ধারকাজ শুরু করতে গিয়ে কিছুটা বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল উদ্ধারকারীদের। দুর্ঘটনাগ্রস্ত বিমানটি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, বিমানের ভাঙা টুকরো চতুর্দিকে ছড়িয়ে রয়েছে, ডিরেক্টরেট জেনারেল অব সিভিল অ্যাভিয়েশনের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, শেষ মুহূর্তে বিমানে মারাত্মক টেকনিক্যাল ত্রুটি ও অস্থিরতা দেখা দেয়। অবতরণের চেষ্টা চলাকালীন পাইলটের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। দুর্ঘটনার পরপরই বিমানটিতে আগুন ধরে যায়। দুর্ঘটনায় পড়া বিমানটি লেসারজেট ৪৫এক্সআর গোত্রের। এটি একটি হাই-পারফরম্যান্স, সুপার-লাইট বিজনেস জেট। এই মডেলটি দ্রুতগতি, জ্বালানি সাশ্রয় এবং উচ্চ-উচ্চতায় উড়ানের ক্ষমতার জন্য পরিচিত। লিয়ারজেট ৪৫ মডেলের বিমান অতীতেও দুর্ঘটনার কবলে পড়েছিল। জানা যাচ্ছে, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে বিশাখাপত্তনম থেকে মুম্বইয়ের উদ্দেশে উড়ানের সময়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়েছিল একটি লিয়ারজেট ৪৫ বিমান। সেটিতেও অবতরণের সময়েই দুর্ঘটনা ঘটেছিল। ইতিমধ্যেই দেশের বেসামরিক বিমান নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ডিজিসিএ উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে তারাই তদন্ত শুরু করবে। এই ভয়াবহ খবরটা যেন প্রথম ধাক্কায় বিশ্বাস করার মতোই নয়। অনেকে করেনও নি। বরং চমকে উঠেছিলেন। চনমনে সদাব্যস্ত মানুষটাকে মঙ্গলবারেও সচিবালয়ে দেখা গেছে। কিন্তু বুধবার তিনি আর নেই। বারামতীর ‘দাদা’ নামে পরিচিত অজিত পাওয়ার ১৯৯১ সাল থেকে বারামতী আসনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। লোকসভা ও বিধানসভা—দু’ক্ষেত্রেই এই কেন্দ্র থেকে দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনি। ১৯৫৯ সালের ২২ জুলাই আহমেদনগর জেলার দেওলালি প্রভরায়ে জন্ম অজিত পাওয়ারের। কাকা শরদ পাওয়ারের হাত ধরেই রাজনীতিতে হাতেখড়ি ও বেড়ে ওঠা। পরে নিজের সংগঠনী শক্তি ও প্রশাসনিক দক্ষতায় অজিত হয়ে ওঠেন মহারাষ্ট্র রাজনীতির অন্যতম প্রধান মুখ। বলতে গেলে, পুণে ও আশপাশের জেলায় রাজনৈতিক ভাবেই দাপট ছিল অজিতের। একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের দায়িত্ব সামলেছেন অজিত পাওয়ার। বহুবার উপ-মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে তিনি রাজ্যের বাজেট ও নীতিনির্ধারণে প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেছেন।দ্রুত কাজের ধরন, সরাসরি জনসংযোগ আর বারামতীতে অটুট দখল—এই তিনে ভর করেই দীর্ঘদিন প্রভাব বজায় রেখেছিলেন অজিত পাওয়ার। তাঁর প্রয়াণে মহারাষ্ট্র রাজনীতিতে যে বড়সড় শূন্যতা তৈরি হল, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। জোট সমীকরণ, আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য—সবকিছুর উপরই এর প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।এক্স হ্যান্ডেলে টুইট করে শোক প্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একইসঙ্গে ঘটনায় সঠিক তদন্তের দাবিও জানিয়েছেন তিনি। তিনি লিখছেন…
“অজিত পাওয়ারের আকস্মিক ও মর্মান্তিক প্রয়াণে আমি গভীরভাবে শোকাহত ও স্তব্ধ। মহারাষ্ট্রের উপ-মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তাঁর অবদান ও নেতৃত্ব চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আজ সকালে বারামতীতে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনায় তাঁর সঙ্গে থাকা সহযাত্রীদেরও করুণ মৃত্যু হয়েছে—এই দুঃসংবাদ আমাদের সকলকে গভীর বেদনার মধ্যে ডুবিয়ে দিয়েছে। এই অপূরণীয় ক্ষতির মুহূর্তে তাঁর কাকা শরদ পাওয়ারজি সহ গোটা পরিবার, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব এবং অসংখ্য অনুগামীদের প্রতি আমার আন্তরিক সমবেদনা ও গভীর শ্রদ্ধা জানাই। এমন এক শোকাবহ সময়ে তাঁদের মানসিক শক্তি ও সাহস কামনা করি। শোক বার্তা জানিয়েছেন প্রধান মন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও। তিনিও লিখেছেন এই ঘটনায় তিনি গভীর ভাবে শোকাহত। তিনি মানুষের নেতা ছিল, সবার সঙ্গে তার গভীর ভাবে আলাপ ছিল। মহারাষ্টের মানূষের কাছে তিনি ঈশ্বর সম ছিলেন। তার পরিবার এবং অনুরাগীদের সমবেদনা জানাই। রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুও অজিত পাওয়ারের মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করেছেন। এক শোকবার্তায় তিনি জানান, বারামতিতে বিমান দুর্ঘটনায় উপ-মুখ্যমন্ত্রী অজিত পাওয়ার সহ একাধিক ব্যক্তির মৃত্যুর খবরে তিনি গভীরভাবে শোকাহত। মহারাষ্ট্রের উন্নয়নে, বিশেষ করে সমবায় ক্ষেত্রে অজিত পাওয়ারের অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে বলে উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপতি। এছাড়াও অন্যান্য রাজনোউইতিক ব্যক্তিত্বরাও শোকজ্ঞাপন করেছেন। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার ঠিক আগেই অজিত পাওয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামী লালা লাজপত রায়ের জন্মবারিষ্কী উপলক্ষ্যে তাকে স্মরণ করে পোস্ট করেন কে জানত তার মাত্র কিছুক্ষণের মধ্যেই তাকে নিয়েই পোস্টে পোস্টে ছয়লাপ হবে সোশ্যলা মিডিয়া! ইতিমধ্যেই অজিত পাওয়ারের বাড়িতে একে একে আসতে শুরু করেছেন রাজনৈতিক দলের সদস্যরা। উপমুখ্যমন্ত্রীর স্ত্রী, খুড়তুতো বোন সুপ্রিয়া সুলে বারামতীর বাড়িতেই ছিলেন। তারা রওনা দিয়েছেন ঘটনাস্থলের উদ্দেশ্যে।