অবিশ্বাস্য থেকে অদম্য ভারত!

ভারতে  আকস্মিক ভ্রমণপিপাসার পিছনে কারণ কী ?  গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল,  আমাদের পরিকাঠামো কি কোটি কোটি স্বপ্নের এই উড়ানের ভার সামলাতে পারবে?

আর প্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : এক দশক আগেও, ভারতে পর্যটন ছিল দুরকম। একজন ব্যাকপ্যাকার যিনি রহস্যময় জায়গার খোঁজ করছেন এবং আরেকজন যিনি বিলাসবহুলভাবে পর্যটন করছেন, রাজস্থানের কোনও প্রাসাদে অবস্থান করছেন। মধ্যবিত্তরা অর্থাৎ সাধারণ ভারতীয় পরিবারগুলো বেশিরভাগই নয় বিয়ের পর মধুচন্দ্রিমার জন্য না হয় তীর্থযাত্রার জন্য ভ্রমণ করত।

২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। কাশ্মীরের বরফাচ্ছন্ন চূড়া থেকে কুর্গের কফি বাগান পর্যন্ত, ভারতে এক বিশাল পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে। অভ্যন্তরীণ পর্যটন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিদেশি পর্যটকদের আগমন নতুন উদ্যমে ফিরে আসছে। এই খাতটি এখন একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি। যা জিডিপিতে প্রায় ৬% অবদান রাখছে।

কিন্তু এই আকস্মিক ভ্রমণপিপাসার পিছনে কারণ কী ?  গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল,  আমাদের পরিকাঠামো কি কোটি কোটি স্বপ্নের এই উড়ানের ভার সামলাতে পারবে?

১. “সংযোগ বিপ্লব” (উড়ান ও বন্দে ভারত)

সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এনেছে সহজলভ্যতা। উড়ে দেশ কা আম নাগরিক প্রকল্পে ৫০০টিরও বেশি রুটে পরিষেবা চালু করা হয়েছে।  যার ফলে দ্বারভাঙ্গা বা কিষাণগড়ের মতো অবহেলিত বিমানবন্দরগুলো পরিচিতি পেয়েছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পৌঁছনোর জন্য এখন আর দুই দিনের ট্রেন যাত্রার প্রয়োজন নেই। পাকিয়ং পর্যন্ত উড়ে যেতে পারেন। একইসঙ্গে  বন্দে ভারত এক্সপ্রেস ট্রেনগুলো ভ্রমণকে আরও সহজ করে দিয়েছে। যা ভ্রমণের সময় ৪০% পর্যন্ত কমিয়ে দিয়েছে।

২. আধ্যাত্মিক নবজাগরণ

ধর্মীয় পর্যটন এখন “আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা” পর্যটনে রূপান্তরিত হয়েছে। কাশী বিশ্বনাথ করিডোরের পুনর্নির্মাণ এবং অযোধ্যায় রাম মন্দিরের উদ্বোধন কেবল ভক্তদেরই আকর্ষণ করেনি। এগুলো ছোট এবং বড় অর্থনীতির জন্ম দিয়েছে। শুধুমাত্র অযোধ্যাতেই দর্শনার্থীর সংখ্যা ১০ গুণ বেড়েছে।  যা প্রমাণ করে যে পরিকাঠামো একটি তীর্থস্থানকে একটি বৈশ্বিক গন্তব্যে পরিণত করতে পারে।

৩. “ইনস্টাগ্রাম প্রভাব” এবং ডিজিটাল সুবিধা

সোশ্যাল মিডিয়া ভ্রমণ বিপণনকে গণতান্ত্রিক রূপ দিয়েছে। মেঘালয়ের একটি লুকিয়ে থাকা জলপ্রপাত বা ল্যান্ডোরের একটি ক্যাফে এখন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ভাইরাল হয়ে যায়। যা রাতারাতি জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রও তৈরি করে ফেলছে। ইউপিআই বিপ্লবের সঙ্গে মিলিত হয়ে একজন ভ্রমণবিলাসী হিমালয়ের প্রত্যন্ত গ্রামের একটি চায়ের দোকানেও কিউআর কোডের মাধ্যমে টাকা দিচ্ছেন। ফলে সবমিলিয়ে ভ্রমণের সমস্তরকমের প্রতিবন্ধকতা দূর হয়ে গিয়েছে।

ভবিষ্যত কী?

এই সহজলভ্যতা, সমৃদ্ধি নাকি বোঝা? ২০৩০ সালের দিকে তাকালে গতিপথটি ঊর্ধ্বমুখী বলে মনে হলেও একটা আবছা সতর্কবার্তার  ট্যাগও জুড়ে রয়েছে।

২০৩০ সালের মধ্যে পর্যটন খাতে ৫০ মিলিয়ন নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। শহর থেকে গ্রামীণ অঞ্চলে হোমস্টে, স্থানীয় গাইড, কারিগরের কাজ বাড়বে ব্যাপকভাবে।

বিদেশের বদলে দেশের মধ্যে বিয়ের আয়োজন করুন। এমনই আহ্বান জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ফলে আমরা দেখছি যে ইতালি/থাইল্যান্ডের মতো গন্তব্যে বিয়ের জন্য ব্যয় করা পুঁজি আবার উদয়পুর, কেরালা এবং গোয়ায় ফিরে আসছে।

ইতিমধ্যেই জল সংকট এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটের সম্মুখীন হচ্ছে সিমলা এবং মানালির মতো শৈলশহরগুলো। ফলে আমাদের পর্যটন কেন্দ্রগুলোর ‘ধারণক্ষমতা’ ভেঙে পড়ছে।

সরকারকে প্রচারের চাইতে ব্যবস্থাপনার দিকে মনোনিবেশ করতে হবে।

আমরা হিমালয়কে কোনো থিম পার্কের মতো ব্যবহার করতে পারি না। ভুটান বা লাক্ষাদ্বীপে যেভাবে পারমিট ব্যবস্থা রয়েছে, তেমনই ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্রের জন্যও দর্শনার্থীর সংখ্যায় বৈজ্ঞানিক সীমা আরোপ করতে হবে সরকারকে।

‘বর্জ্যমুক্ত শৈলশহর’-এর জন্য একটি জাতীয় মিশন ব্যাপকভাবে প্রয়োজন।

মহাসড়ক এবং বিমানবন্দর তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু রাস্তাগুলি প্রায়শই ভাঙা থাকে। ব্যক্তিগত গাড়ির চাপ কমাতে রাজ্য সরকারগুলোকে স্থানীয় শাটল ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

অনেকসময় দেখা যায় হোটেল আছে। কিন্তু কর্মী নেই। আতিথেয়তা খাতের জন্য বিশেষভাবে একটি ব্যাপক ‘স্কিল ইন্ডিয়া’ উদ্যোগ প্রয়োজন। যেখানে গাইড, চালক এবং হোটেল কর্মীদের দক্ষ করার প্রশিক্ষণ দিতে হবে এবং বিদেশি ভাষায় প্রশিক্ষণ দিয়ে তা বৈশ্বিক মানের সমান করে তুলতে হবে।

আন্তর্জাতিক পর্যটনকে যদি সত্যিই থাইল্যান্ড বা দুবাইয়ের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয়, তবে ‘নারী নিরাপত্তা’ নিশ্চিত করতে হবে। তার জন্য কঠোর পুলিশি ব্যবস্থা এবং প্রতিটি প্রধান কেন্দ্রে পর্যটন পুলিশ  স্কোয়াড প্রয়োজন।

বর্তমানে বিশ্ব ভারতকে ঘুরে দেখতে চায়  এবং ভারতীয়রাও তাদের নিজেদের দেশকে ঘুরে দেখতে চায়। তেমন চাহিদাও আছে। আছে সৌন্দর্যও। যেটা অনুপস্থিত, সেটা হল এটি পরিচালনা করার জন্য একটি টেকসই পরিকাঠামো। আমরা যদি এটা তৈরি করি, তাহলে আগামী দশকে শুধুই অবিশ্বাস্য নয় অদম্য ভারতের দিকে এগিয়ে যাবে দেশ।