বাজেটে বিপুল করছাড়ের ঘোষণা কি সত্যিই ডিজিটাল অর্থনীতির “মেরুদণ্ড” শক্ত করতে পারবে?

অনুসূয়া দাস, সাংবাদিক : ডিজিটাল অর্থনীতির মেরুদণ্ড গঠনে বিপুল করছাড়ের প্রস্তাব। লগ্নি টানতে কতটা কাজ করবে নির্মলার দাওয়াই? ভারতের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ যে ক্রমশ ডিজিটাল দুনিয়ার দিকেই এগোচ্ছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। স্টার্টআপ, ফিনটেক, এআই, ডেটা সেন্টার থেকে শুরু করে সেমিকন্ডাক্টর সব ক্ষেত্রেই সরকার চাইছে বিশ্বমানের লগ্নি টানতে। আর সেই লক্ষ্যেই এবারের বাজেটে অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের দাওয়াই বিপুল করছাড় ও নীতিগত সুবিধার প্রস্তাব। প্রশ্ন একটাই, এই করছাড় কি সত্যিই ডিজিটাল অর্থনীতির “মেরুদণ্ড” শক্ত করতে পারবে? নাকি এটি শুধুই আরেকটি কাগুজে প্রতিশ্রুতি? কী রয়েছে প্রস্তাবের কেন্দ্রে?

করছাড়ের মূল লক্ষ্য তিনটি স্তরে বিভক্ত
ডিজিটাল পরিকাঠামো
ডেটা সেন্টার, ক্লাউড পরিষেবা ও ৫ জি ভিত্তিক
নেটওয়ার্কে দীর্ঘমেয়াদি লগ্নির জন্য কর ছাড়
স্টার্ট আপ ও উদ্ভাবন
স্বীকৃত স্টার্ট আপগুলির জন্য করমুক্ত সময়সীমা বাড়ানো
এআই ও ডিপ-টেক গবেষণায় অতিরিক্ত ট্যাক্স ইনসেনটিভ
বৈদেশিক লগ্নি
বিদেশি সংস্থার জন্য কম কর হার ও সহজ কমপ্লায়েন্স
সরকারের দাবি, এই প্যাকেজ ভারতকে ডিজিটাল ইনভেস্টমেন্ট হাব হিসেবে তুলে ধরবে এবং আগামী পাঁচ বছরে লক্ষ লক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি হবে।
কেন করছাড় গুরুত্বপূর্ণ?
বর্তমানে ডিজিটাল অর্থনীতি ভারতের জিডিপির প্রায় ১১ শতাংশ। নীতি আয়োগের হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে এই অবদান ২০ শতাংশ ছুঁতে পারে। কিন্তু তার জন্য দরকার বিশাল লগ্নি।
বিশ্ব বাজারে ভারত প্রতিযোগিতায় রয়েছে ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, এমনকি পূর্ব ইউরোপের দেশগুলির সঙ্গে। এই দেশগুলিও করছাড় দিচ্ছে, জমি দিচ্ছে, বিদ্যুৎ দিচ্ছে সস্তায়। ফলে শুধুমাত্র মেক ইন ইন্ডিয়া স্লোগান যথেষ্ট নয় আর্থিক প্রণোদনাই মূল অস্ত্র।
লগ্নিকারীদের মন জয় হবে তো?
অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করছেন, করছাড় অবশ্যই প্রাথমিক আকর্ষণ তৈরি করবে। বিশেষ করে ডেটা সেন্টার ও এআই সংস্থাগুলি দীর্ঘমেয়াদি লাভের হিসেব করে। সেখানে প্রথম কয়েক বছরের কর-মুক্ত সুবিধা বড় ফ্যাক্টর। তবে বিনিয়োগকারীদের আরেকটি বড় উদ্বেগ নীতিগত স্থায়িত্ব। আজ যে করছাড়, কাল তা প্রত্যাহার হবে না তো? অতীতে বহু স্টার্টআপ করছাড় নিয়ে শুরু করেও পরে জটিল নিয়মে আটকে পড়েছে। সেই অভিজ্ঞতা বিদেশি লগ্নিকারীদের সাবধান করে তুলেছে।
পরিকাঠামো কি প্রস্তুত?
ডিজিটাল অর্থনীতির মেরুদণ্ড শুধু করছাড়ে দাঁড়ায় না। দরকার নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, দ্রুত ইন্টারনেট, দক্ষ মানবসম্পদ। ডেটা সেন্টারের জন্য বিদ্যুৎ খরচই সবচেয়ে বড় ব্যয়। এখনও অনেক রাজ্যে বিদ্যুৎ দামের অনিশ্চয়তা রয়েছে। এছাড়া স্কিলড ম্যানপাওয়ারের অভাবও বড় প্রশ্ন। করছাড় থাকলেও যদি দক্ষ কর্মী না মেলে, লগ্নি থমকে যেতে পারে।
রাজ্য বনাম কেন্দ্র সমন্বয় কতটা?
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কেন্দ্র-রাজ্য সমন্বয়। অনেক সময় কেন্দ্র করছাড় দিলেও রাজ্য স্তরে জমি, বিদ্যুৎ বা স্থানীয় কর নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়। ডিজিটাল হাব গড়তে হলে তামিলনাড়ু, কর্ণাটক, তেলেঙ্গানার মতো রাজ্যগুলির সঙ্গে সমন্বয় অপরিহার্য। নাহলে লগ্নি অন্য দেশে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।
স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমে প্রভাব
স্টার্টআপ মহলে বাজেট প্রস্তাব নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। করছাড়ে স্বস্তি মিললেও অনেকেই বলছেন, ফান্ডিং অ্যাক্সেস এখন বড় সমস্যা। ভেঞ্চার ক্যাপিটাল লগ্নি কমেছে, বৈদেশিক ফান্ড সতর্ক। শুধুমাত্র করছাড় দিয়ে সেই আস্থার ঘাটতি পূরণ হবে না। তাদের দাবি সহজ এক্সিট পলিসি, দ্রুত আইপিও অনুমোদন ও নিয়ন্ত্রক স্বচ্ছতা।
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ
ভোটের আবহে এই করছাড়কে রাজনৈতিক মাস্টারস্ট্রোক বলেও দেখছেন অনেকে। যুব সমাজ, টেক সেক্টর ও মধ্যবিত্তের কাছে ইতিবাচক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা স্পষ্ট। তবে বিরোধীদের প্রশ্ন এই করছাড়ের বোঝা শেষ পর্যন্ত কি সাধারণ করদাতার ঘাড়ে পড়বে?
নির্মলা সীতারামনের করছাড়ের দাওয়াই নিঃসন্দেহে ডিজিটাল অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার এক বড় পদক্ষেপ। তবে এটি কোনও ম্যাজিক বুলেট নয়। লগ্নি টানতে হলে করছাড়ের সঙ্গে চাই নীতিগত স্থায়িত্ব, শক্ত পরিকাঠামো ও দক্ষ মানবসম্পদ।নাহলে , এই প্রস্তাবও আগের অনেক বাজেট ঘোষণার মতোই কাগজে-কলমে থেকে যাবে। প্রশ্ন থেকে যায়, ডিজিটাল ভারতের মেরুদণ্ড কি সত্যিই শক্ত হবে, নাকি আবারও ভরসা থাকবে শুধুই প্রতিশ্রুতিতে?