ভারতের বিপুল জনসংখ্যাই তার বড় সম্পদ নাকি বিপর্যয় ?

ভারতের বিপুল জনসংখ্যাকে এককথায় ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ হিসেবে বর্ণনা করা হত। কিন্তু জনসংখ্যা ১৪৫ কোটি ছাড়াতেই সেই ধ্যানধারনা বদলাতে শুরু করেছে।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক: ভারতের বিপুল জনসংখ্যাই তার কাছে বড় সম্পদ বলে মনে করতেন অর্থনীতিবিদরা। তাঁদের মতে এই জনসংখ্যাই ভারতকে বিশ্বের কাছে বৃহত্তম কর্মশক্তি ও বিশাল ভোক্তা বাজার হিসেবে খুলে দেবে। যাকে এককথায় ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ হিসেবে বর্ণনা করছেন অনেকে। কিন্তু ভারতের জনসংখ্যা ১৪৫ কোটি ছাড়াতেই সেই ধ্যানধারনা বদলাতে শুরু করেছে। যে জনসংখ্যা এতজিন লভ্যাংশ জোগাত এখন তাই আর্থিক পরিকাঠামো, পরিবেশ ও সামাজিক স্থিতির উপর চাপ ফেলছে। যাকে ডেমোগ্রাফিক ঋণ বললেও ভুল হবে না।

প্রথম চ্যালেঞ্জ- কর্মসংস্থান

প্রতি বছর প্রায় এক থেকে দেড় কোটি তরুণ-তরুণী কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করছেন। তাঁদের জন্য বছরে অন্তত ১ থেকে ১.২ কোটি নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা প্রয়োজন। বাস্তবে অর্থনীতির গতি  থাকলেও চাকরি তৈরির গতি সে তুলনায় অনেকটা পিছিয়ে। অর্থনীতিতে গতি থাকলেও চাকরি নেই, এটাই বাস্তব সমস্যা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দক্ষতার অভাব। উচ্চশিক্ষায় স্নাতক ডিগ্রিধারীর সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি ও ডিজিটাল দক্ষতায় ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে। বিপুল জনসংখ্যা তখনই সম্পদ, যখন তার কর্মক্ষমতা থাকে, দক্ষতা থাকে।

দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ- পরিকাঠামোর উপর ক্রমবর্ধমান চাপ

মুম্বই থেকে বেঙ্গালুরুর মতো মহানগরগুলি জনসংখ্যার চাপে হাঁসফাঁস করছে। জল, নিকাশি, গণপরিবহণ, আবাসন—সব ক্ষেত্রেই চাহিদা সরবরাহকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। নীতি আয়োগের প্রতিবেদন বলছে, প্রায় ৬০ কোটি মানুষ উচ্চমাত্রার জল-সংকটে ভুগছেন। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে মাথাপিছু জলের জোগান কমছে, যা ভবিষ্যতে আভ্যন্তরীণ সংঘাতের কারণ হতে পারে। গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র জনগোষ্ঠী কাজের সন্ধানে শহরে ভিড় জমাচ্ছেন। এর ফলে জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নিরাপত্তা পড়ছে প্রশ্নচিহ্নের মুখে।

তৃতীয় চ্যালেঞ্জ- পরিমাণ বনাম গুণগত উন্নয়ন

মোট জিডিপির বিচারে ভারত বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতিগুলির একটি হলেও, মাথাপিছু আয় তুলনামূলকভাবে কম। ১৪৫ কোটির মধ্যে সম্পদ ভাগ হলে গড় ভারতীয়ের প্রাপ্য অংশ কমই থেকে যায়। স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় চিকিৎসক-রোগী অনুপাত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ডের নিচে। ঘনবসতির কারণে যে কোনও মহামারি বা স্বাস্থ্য সংকট বহু গুণ বেড়ে যায়। পরিবেশ দূষণও জনঘনত্বের সরাসরি প্রভাব। এর ফলে অসংযত শিল্পায়ন, যানবাহনের চাপ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতিতে ভারতের বহু শহর বিশ্বের দূষিততম শহরের তালিকায় জায়গা করে ফেলেছে।

চতুর্থ চ্যালেঞ্জ- বয়স গঠনের বৈপরীত্য

উত্তর ভারতে যুব জনসংখ্যা বেশি, দক্ষিণে জন্মের হার দ্রুত কমছে। ফলে একদিকে দক্ষতাহীন যুব উদ্বৃত্ত, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান প্রবীণ জনসংখ্যা—এই দুই ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে উঠছে। কেন্দ্র-রাজ্য আর্থিক সম্পর্কেও প্রভাব পড়তে পারে।

সবমিলিয়ে গুণগত শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, টেকসই নগরায়ণ ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিস্তারই হল মূল চাবিকাঠি। তা না হলে যে নতুন ভারত তৈরির স্বপ্ন দেখা হচ্ছে, তা ইতিহাসে এক অপূর্ণ সম্ভাবনা হিসেবেই থেকে যাবে।