অতিরিক্ত পর্যটনে অস্তিত্বসংকটে পাহাড়

শিমলা ও মানালিতে এই মরশুমের জনসংখ্যা প্রায় তিনগুণ হয়ে গিয়েছে। অথচ জল, নিকাশি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সেই পুরনো কাঠামোতেই আটকে রয়েছে।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক: ২০২৬-এ দাঁড়িয়ে ভারতের পাহাড়ি শহরগুলি—শিমলা, মানালি, দার্জিলিং, মুনার কিংবা লাদাখ—আর নিছক অবকাশযাপনের ঠিকানা নয়। সেখানেই আজ পরিবেশগত সংকটের সতর্কবার্তা ভেসে আসছে। ‘রিভেঞ্জ ট্যুরিজ়ম’-এর ঢেউ, সোশ্যাল মিডিয়ার মোহ ও সহজ যোগাযোগের ফলে যে পর্যটক-বিস্ফোরণ ঘটেছে, তাতেই ট্র্যাফিক জ্যাম, হোটেল-সংকটের সীমা ছাড়িয়ে এখন অস্তিত্বের প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

ভেঙে পড়া পরিকাঠামো

পাহাড়ের বহনক্ষমতা (carrying capacity) বহু আগেই ছাপিয়ে গিয়েছে পর্যটকের সংখ্যা। শিমলা ও মানালিতে এই মরশুমের জনসংখ্যা প্রায় তিনগুণ হয়ে গিয়েছে। অথচ জল, নিকাশি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সেই পুরনো কাঠামোতেই আটকে রয়েছে। লাদাখে এক জন পর্যটক দৈনিক গড়ে ৭৫ লিটার জল খরচ করেন, যেখানে স্থানীয়ের খরচ ২৫ লিটার। এই বৈষম্য দীর্ঘমেয়াদী বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।

নির্মাণের নামে বিপর্যয়

পর্যটকের চাহিদা মেটাতে অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণ পাহাড়ের পায়ের তলার মাটি আলগা করছে। ২০২৩-এ জোশীমঠে ধস নামার ঘটনা ছিল সতর্কবার্তা। অস্থিতিশীল ঢালে বহুতল হোটেল, প্রশস্ত রাস্তা, সুড়ঙ্গ—সবমিলিয়ে পাহাড়কে ভঙ্গুর করা হচ্ছে। ২০২৪-এ ওয়েনাড়ের ভয়াবহ ভূমিধসে ৪০০-রও বেশি প্রাণহানির ঘটনায় নিয়ন্ত্রণহীন পর্যটন-উন্নয়নকেও দায়ী করা হয়েছিল। জলবায়ু পরিবর্তনের বাড়তি বৃষ্টিপাতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানুষের চাপ। এর ফলে বিপর্যয়ের ঝুঁকি বেড়েছে বহুগুণ।

অর্থনীতির লাভ, সমাজের ক্ষতি?

হিমাচল প্রদেশের জিডিপিতে পর্যটনের অবদান প্রায় ৭ শতাংশ। কর্মসংস্থান তৈরি হলে স্থানীয় অর্থনীতি সচল থাকে। কিন্তু লাভের ভাগ কি সমান? পর্যটকদের ঢলে জমি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে। বহু স্থানীয় বাসিন্দাই নিজের শহরে প্রান্তিক হয়ে পড়ছেন। সংস্কৃতিও পণ্য হয়ে উঠছে—পূজো-পার্বণ ‘শো’-তে পরিণত, নীরব পাহাড়ি সন্ধ্যা হারিয়ে যাচ্ছে হর্ন ও ডিজে-সাউন্ডে। আগে যে শান্তির খোঁজে মানুষ পাহাড়ে যেত, সেই শান্তিই এখন বিপন্ন।

পরিবেশের ঋণ

হিমালয় অঞ্চলে বছরে ৫০ থেকে ৮০ লক্ষ মেট্রিক টন বর্জ্য তৈরি হয়, যার বড় অংশই হল সিঙ্গল ইউজ প্লাস্টিক। এই আবর্জনা নদীর উৎসভূমিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক ছড়িয়ে দেয়। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র বা সিন্ধুর মতো নদীগুলির জন্মভূমি যদি দূষিত হয়, তার প্রভাব গোটা উপমহাদেশে পড়বে। পাহাড় কেবল পর্যটনকেন্দ্র নয়; তারা দেশের ‘ওয়াটার টাওয়ার’ ও জলবায়ুর ঢাল।

সংখ্যা নয়, মানের পথে

নিষেধাজ্ঞা বা সুসংহত ব্যবস্থাপনায় সমাধান মিলবে না। নীতি আয়োগ ‘গ্রিন সেস’ ও বৈজ্ঞানিক বহনক্ষমতা নির্ধারণের ভিত্তিতে পর্যটক-সংখ্যায় সীমা টানার প্রস্তাব দিয়েছে। এবার প্রয়োজন কঠোর নির্মাণবিধি, বর্জ্য-ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি, হোমস্টে-ভিত্তিক বিকেন্দ্রীকৃত পর্যটন ও জল ব্যবহারে শৃঙ্খলা।

পাহাড় অসীম ক্ষমতাসম্পন্ন নয়। তাদের সহনশীলতারও সীমা আছে। এখনই সচেতন না হলে, অবকাশযাপনের ঠিকানা পাহাড় দাঁড়াবে ধ্বংসের মুখে। পাহাড়কে ভালোবাসতে হলে, তাকে বাঁচিয়ে রাখার দায়টাও নিতে হবে মানুষকেই।