খামেনেই : দরিদ্র পরিবার থেকে ক্ষমতার শীর্ষে

১৯৩৯ সালে ১৯ এপ্রিল ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদে একটি সাধারণ ধর্মীয় পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আলি খামেনেই। আট ভাই-বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়।

রিয়া দাস, সাংবাদিক : ইতিহাস কখনও কখনও এমন কিছু চরিত্রের জন্ম দেয়, যাঁদের জীবন কেবল ব্যক্তিগত উত্থান-পতনের গল্প নয়। বরং গোটা একটি দেশের ভাগ্য বদলে দেওয়ার কাহিনি। দারিদ্রের অন্ধকার ঘর থেকে রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে ওঠার এই যাত্রাপথে সংগ্রাম, ত্যাগ, বিশ্বাস, ষড়যন্ত্র, রক্তক্ষয় এবং রাজনীতির কঠোর বাস্তবতা। সব মিলিয়ে এক বিস্ময়কর অধ্যায় রচনা করেছিলেন আয়াতোল্লা আলি খামেনেই। শৈশবের অভাব ও তাঁর ছোটো থেকেই বিপ্লবী আর্দশ। এই ওপর দাঁড়িয়েই গড়ে উঠেছিল তাঁর দীর্ঘ ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক জীবন। ১৯৩৯ সালে ১৯ এপ্রিল ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদে একটি সাধারণ ধর্মীয় পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আলি খামেনেই। আট ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। বাবা সৈয়দ জওয়াদ খামেনেই ছিলেন একজন স্থানীয়ভাবে পরিচিত শিয়া পণ্ডিত ও মা খাদিজে মির্দামাদী ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক ও সংবেদনশীল একজন নারী। শৈশবেই মায়ের কাছ থেকে কোরান শিক্ষা ও ধর্মীয় অনুশাসনের পাঠ নেন খামেনেই। নিজের স্মৃতিকথায় তিনি বহুবার উল্লেখ করেছেন, তাঁর চরিত্র গঠনে মায়ের অবদান ছিল অনস্বীকার্য। কিন্তু সেই শৈশব সুখের ছিল না। দারিদ্র্য ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। এমন অনেক রাত গেছে যেখানে না খেয়েই রাতের পর রাত থাকতে হয়েছে তাঁকে। মলিন ও পুরনো পোশাকের কারণে সহপাঠীদের কাছে কটাক্ষ, অবহেলা ও অপমানও সহ্য করতে হয়েছে। তবু দারিদ্র্যের সেই কষাঘাত তাঁর মানসিক দৃঢ়তাকে আরও শক্ত করে তোলে।

ছোটোবেলা থেকেই চোখের সমস্যায় ভুগলেও তা ধরা পড়েনি বহুদিন। ফলে বিদ্যালয়ে তাঁকে অলস ও অমনোযোগী ছাত্র বলে মনে করা হতো। পরে চশমা ব্যবহারের পর তাঁর মেধার প্রকৃত প্রকাশ ঘটে। তবে পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থার বিরোধী বাবা তাঁকে উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে দেননি। বরং ধর্মীয় শিক্ষার জন্য তাঁকে পাঠানো হয় কোম শহরে। শিয়া মুসলিমদের অন্যতম ধর্মীয় কেন্দ্র। এখানেই খামেনেইর জীবনের মোড় ঘুরে যায়। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ জন্মায় তাঁর। কৈশোরেই তিনি এক হাজারের বেশি উপন্যাস পড়েছিলেন বলে উল্লেখ করেন স্মৃতিকথায়। টলস্টয়, ভিক্টর হুগো, রোমা রোলাঁর মতো বিশ্বখ্যাত সাহিত্যিকদের রচনা তাঁর চিন্তাভাবনাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। আমিন ছদ্মনামে কবিতা লেখাও শুরু করেন তিনি। একইসঙ্গে ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়েন রাজনৈতিক সচেতনতার জগতে। ১৯৫৫ সালে কোমে একটি সভায় তাঁর পরিচয় হয় আয়াতোল্লা রুহুল্লাহ খামেনেইর সঙ্গে। যিনি পরবর্তীকালে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের প্রধান রূপকার হন। এই সাক্ষাৎ খামেনেইর জীবনে এক যুগান্তকারী মুহূর্ত। খামেনেই আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি শাহ মহম্মদ রেজা পাহলভির স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সক্রিয় আন্দোলনে নামেন। একাধিকবার গ্রেফতার হন, নির্যাতিত হন, আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য হন। তবুও আপোস করেননি। ১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের সাফল্যের পর তিনি বিপ্লবী পরিষদের সদস্য হন। উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যা পরবর্তীকালে ইরানের অন্যতম শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

১৯৮১ সালে তেহরানের একটি মসজিদে বোমা হামলায় গুরুতর আহত হন খামেনেই। এই হামলায় তাঁর ডান হাত কার্যত অচল হয়ে পড়ে। একই বছরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে টানা আট বছর দায়িত্ব পালন করেন। ইরান-ইরাক যুদ্ধের মতো ভয়াবহ সংকটময় সময়ে তিনি দেশ পরিচালনার গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। প্রধানমন্ত্রী মির হোসেইন মুসাভির সঙ্গে নীতিগত মতবিরোধ থাকলেও তিনি রাষ্ট্রের কাঠামো রক্ষায় কঠোর অবস্থান বজায় রাখেন। ১৯৮৯ সালে আয়াতোল্লা খোমেনির মৃত্যুর পর বিশেষজ্ঞ পরিষদের সিদ্ধান্তে খামেনেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হন। যদিও সে সময় তিনি গ্র্যান্ড আয়াতোল্লা পদমর্যাদার অধিকারী ছিলেন না। তবু সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে তাঁকে সেই পদে অধিষ্ঠিত করা হয়। এরপর দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় ধরে তিনি ইরানের সর্বোচ্চ ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করেন। খামেনেইর নেতৃত্বে ইরান একটি শক্তিশালী ইসলামি রাষ্ট্রে পরিণত হয়। সামরিক শক্তি বৃদ্ধি, পরমাণু কর্মসূচি, মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার। সব মিলিয়ে তাঁর শাসন কাল ছিল বিতর্কে ও উত্তেজনায় পরিপূর্ণ। তবে একই সঙ্গে মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিরোধী কণ্ঠ দমন, কড়া রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও বারবার উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। ইরানের বর্তমান সংশোধিত সংবিধান অনুসারে, সর্বোচ্চ নেতাই হলেন দেশের প্রকৃত শাসক। খামেনেই আললে মানবাধিকার, নারী স্বাধীনতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। ২০০৯ এর গ্রিন মুভমেন্ট আন্দোলন, ২০২২-এর মাহসা আমিনি বিক্ষোভ তারই ফল। তবে তাঁর স্ত্রী ও মেয়েদের ছবি প্রাকাশ্যে আসেনি। ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় তেহরানে নিজের কার্যালয়ে নিহত হন তিনি। নিজের অফিসেই বসে কাজ করছিলেন তিনি। সেই সময়ই হামলা হয় খামেনেইয়ের উপর। এই হামলায় তাঁর কন্যা, জামাই ও নাতনিও প্রাণ হারান বলে জানায় ইরানের সরকারি সংবাদ সংস্থা। তাঁর মৃত্যুর খবরে গোটা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে তৈরি হয় চরম অনিশ্চয়তা।

খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর সাহিত্য পাঠের উপর তাঁর পুরনো পোস্টগুলি ভাইরাল হয়েছে সমাজমাধ্যমে। তাঁর পড়ার বইয়ের তালিকায় জেন অস্টেনের প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিসও রয়েছে। ২০১৩ সালের ৬ অগাস্ট তৎকালীন টুইটারে খামেনেই লিখেছিলেন, শ্রী নেহরুর লেখা গ্লিম্পস অব ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি পড়ার আগে, আমি ঔপনিবেশিক শাসনের আগের ভারতকে জানতাম না।

খামেনেই প্রস্থান ইরানের ইতিহাসে এক গভীর শূণ্যতা তৈরি করল। তিন দশকের বেশি সময় ধরে যে ব্যক্তির নেতৃত্বে দেশ পরিচালিত হয়েছে, তাঁর অনুপস্থিতিতে ইরানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কোন পথে এগাবে তা নিয়ে শুরু হয়েছে জল্পনা। ক্ষমতার উত্তরাধিকার, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক টানাপোড়েন, পশ্চিমের সঙ্গে সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য। সবকিছুই এখন এক অনিশ্চিত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ইতিহাসের পাতা সাক্ষী থাকবে এক দরিদ্র ঘরের সন্তান কীভাবে সংগ্রাম, আর্দশ ও ক্ষমতার পথে হেঁটে পরিণত হয়েছিলেন পশ্চিম এশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী নেতায়। তাঁর মৃত্যুর পর সেই ইতিহাসই অপেক্ষা করেছে এক নতুন অধ্যায়ের। তবে খামেনেইয়ের আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও এই ঘটনা বড়সড় প্রভাব ফেলবে। খামেনেইয়ের মৃত্যু ইরানের জন্য শুধু এক নেতার অবসান নয়, বরং একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি।